ব্যাংকগুলোর অনিয়ম-দুর্নীতিতেই নিঃস্ব উদ্যোক্তারা, বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অভিযোগ
অনলাইন নিউজ ডেক্স
দেশের তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা অভিযোগ করছেন, ব্যাংকের ভেতরে অনিয়ম ও দুর্নীতির দায় প্রকৃত শিল্প উদ্যোক্তাদের ওপর চাপানো হয়েছে। এতে অনেক প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপির তকমা পাচ্ছে, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কারখানা, ঝুঁকিতে পড়ছে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়।
এমনই গুরুতর অভিযোগ উঠেছে প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি-এর নারায়ণগঞ্জ শাখাকে ঘিরে। ভুক্তভোগী গার্মেন্ট উদ্যোক্তাদের দাবি, ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ভুয়া সেলস কন্ট্রাক্ট ও জাল ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ব্যবহার করে হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম করেছেন। পরে সেই দায় উল্টো উদ্যোক্তাদের ওপর চাপানো হয়েছে।
এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের ২৬টি শতভাগ রপ্তানিমুখী গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের কাছে যৌথভাবে আবেদন করেছেন। তারা নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দাবি করেছেন। উদ্যোক্তারা জানান, ২০১৭ সাল থেকে তাদের নামে ভুয়া আইডি খুলে জাল এলসি খোলা হয়, অথচ এসব বিষয়ে তাদের অনুমতি নেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-এর তদন্তে দেখা গেছে, ভুয়া রপ্তানির আড়ালে ৪৩টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার ৮১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, শাখা ব্যবস্থাপনা ও প্রধান কার্যালয়ের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে এই অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, রপ্তানিমুখী শিল্পে সাধারণত কাঁচামাল আমদানির পরিমাণ রপ্তানির তুলনায় কম থাকার কথা থাকলেও, সংশ্লিষ্ট শাখায় উল্টো চিত্র দেখা গেছে। রপ্তানির তুলনায় কয়েকগুণ বেশি আমদানির তথ্য দেখানো হয়েছে। আবার প্রায় ৯০ শতাংশ কাঁচামাল স্থানীয় বাজার থেকে কেনা দেখিয়ে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সমন্বয় করা হয়েছে, যা ব্যাংকিং বিধিবিধানের পরিপন্থি।
এছাড়া প্রকৃত রপ্তানি আয় না থাকলেও ঋণের অর্থ ডলারে রূপান্তর করে এলসির দায় সমন্বয় করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা যায়, কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ভুয়া কমিটমেন্ট আইডি তৈরি করে এসব লেনদেন সম্পন্ন করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, জাল এলসির বিপরীতে প্রতিষ্ঠানের চলতি হিসাব থেকে টাকা কেটে ডলার কেনা হয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে পরিশোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের অজ্ঞাতে ‘ফোর্সড লোন’ ও ‘ডিমান্ড লোন’ সৃষ্টি করে বিপুল সুদ আরোপ করা হয়েছে।
ফ্যাশন ৪৭ বিডি লিমিটেডের মালিক এবং বিকেএমইএ’র সদস্য দিল মোহাম্মদ ইমরান বলেন, ব্যবসায়ীরা উৎপাদন ও রপ্তানির মাধ্যমে অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও নানা অনিয়মের দায় শেষ পর্যন্ত তাদেরই বহন করতে হয়।
তিনি বলেন, আমরা ব্যবসা করি আর ব্যাংক মুনাফা করে। কিন্তু সমস্যার সময় আমাদের পাশে দাঁড়ানোর বদলে উল্টো চাপ বাড়ানো হয়। প্রিমিয়ার ব্যাংকের অনিয়মের দায় আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, ফলে আমরা চরমভাবে নাজেহাল হচ্ছি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) একতরফাভাবে ডাকা নিলাম স্থগিতের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি নিলাম করা হলে তা অন্যায় হবে এবং এতে রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
উদ্যোক্তাদের দাবি, এই সংকটে ইতোমধ্যে তিনজন উদ্যোক্তার মৃত্যু হয়েছে এবং অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট ২৬টি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন, যারা এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
তারা ব্যাংকের আরোপিত ঋণের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, প্রকৃত দায় নির্ধারণ, এবং ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সহায়তা চান। উদ্যোক্তাদের মতে, কারখানা চালু থাকলে প্রকৃত দায় পরিশোধ করা সম্ভব, কিন্তু একতরফা চাপ ও নিলাম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
