বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের গর্বিত প্রাক্তন শিক্ষার্থী কাজী এমদাদুল হক খোকন। তিনি ২য় শ্রেণি থেকে মেট্রিক /এসএসসি ১৯৭২ ব্যাচ পর্যন্ত এই বিদ্যালয়েই অধ্যয়ন করেন। জন্ম ও বেড়ে ওঠা কেয়াটখালী রেলকলোনিতে। বিদ্যালয় জীবন শেষে তিনি আনন্দমোহন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন নিয়মিত, শান্ত স্বভাবের ও একজন সাধারণ ছাত্র। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন একজন অসাধারণ মানুষ হিসেবে। তিনি শুধু একজন বইপ্রেমী নন; নীরবে ও নিরলসভাবে সারা দেশে পাঠাভ্যাস ছড়িয়ে দিতে বহু বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাঠাগারে বই পাঠানো, নতুন পাঠাগার গড়ে তুলতে উৎসাহ দেওয়া এবং মানুষকে বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তোলা এসব কাজ তিনি দায়িত্ববোধ থেকেই করে আসছেন। নিঃশব্দে সমাজে আলোর কাজ করে যাওয়া এমন মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়, আর কাজী এমদাদুল হক খোকন তাঁদেরই একজন।
নীরব বিপ্লবের পথিক:
খোকন ভাইয়ের কাজের বিস্তার সত্যিই বিস্ময়কর। তিনি ইতোমধ্যে প্রায় ৬০০ পাঠাগারে একাধিক বার বই দিয়েছেন, যার মূল্য ৩০ লাখ টাকারও বেশি। শুরুটা ২০১৬ সালে। নিজের বাসায় অতিরিক্ত বই জমে গেলে তিনি ভাবলেন এই বইগুলো অন্যের উপকারে আসুক। সেই ভাবনা থেকেই তিনি প্রায় এক হাজার বই মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার একটি লাইব্রেরিতে নিজ খরচে পাঠান। সেই উদ্যোগই তাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। এরপর ত্রিশালসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তিনি নিজ হাতে বাছাই করা ভালো মানের বই পৌঁছে দিয়েছেন। কখনো রিকশায়, কখনো ট্রেনে, কখনো গাড়ি বা প্লেনে চড়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে বই ছড়িয়ে দিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি বই পৌঁছেছে জয়পুরহাটে। তার এই নীরব কাজ শুধু পাঠচর্চাকে এগিয়ে নিচ্ছে না, বরং তরুণ প্রজন্মের জন্যও এক অসাধারণ অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।
মানবিকতা ও সরলতার প্রতিচ্ছবি :
খোকন ভাই নিরহংকারী, সৎ এবং মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী একজন মানুষ। তিনি পরিচিত হন তার পদবি দিয়ে নয়, তার কাজ দিয়ে। সমাজ গঠনে বই যে কত বড় ভূমিকা রাখতে পারে তিনি তার জীবন্ত প্রমাণ।
স্কুলের আলোকবর্তিকা :
আমাদের স্কুলের বড় ভাই হিসেবে তিনি সত্যিই অনন্য। বইয়ের প্রতি তার ভালোবাসা, বড়–ছোট সবার সঙ্গে তার আন্তরিক যোগাযোগ এবং জ্ঞানচর্চাকে সামনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা এসবই তাকে স্কুলের শতবর্ষ উদযাপনে বিশেষভাবে স্মরণীয় করে তোলে।
একটি শৈশবের স্মৃতি :
তার সঙ্গে একাধিকবার ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে আমার। স্বভাবগতভাবে তিনি খুব গল্পপ্রিয় মানুষ। একবার তিনি ছোটবেলার একটি স্মৃতি শোনালেন। খুব অল্প বয়সে এক ঈদের সকালে নামাজ পড়তে গিয়ে ঈদের নামাজের কথা ভুলে বলাশপুর রেলওয়ে ঈদগাহ মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে মার্বেল খেলা দেখতে মগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। ঈদগাহ থেকে নামাজ পড়ে তার বাবা যখন বাড়িতে ফিরে দেখলেন তিনি বাসায় ফেরেননি, তখনই শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। শেষ পর্যন্ত তাকে পাওয়া যায় ওই খেলার পাশে। বাড়িতে ফেরার পথে বাবার কাছ থেকে বকা আর মার দুটোই তাকে সহ্য করতে হয়েছিল। গল্পটি বলার সময় তার চোখে সেই বয়সের সরলতা আর শিশুসুলভ অভিব্যক্তি স্পষ্ট ছিল।
শেষ কথা :
তিনি ১৯৭২ সালে এসএসসি পাস করেছেন, আর আমি ১৯৯৬ সালে। বয়সের ব্যবধান ২৪ বছর হলেও কখনোই তিনি সেটার অনুভব করতে দেননি। বরং সবসময় আপনজনের মতো কাছে টেনেছেন। এত বড় মাপের মানুষের এমন বিনয় সত্যিই বিরল। ২০১৯ সালের পুনর্মিলনী হোক বা এবারের শতবর্ষ উদযাপন দুই ক্ষেত্রেই খোকন ভাই যেভাবে দায়িত্ব নিয়েছেন, তা সত্যিই অনুকরণীয়। সপ্তাহের পর সপ্তাহ ঢাকা থেকে এসে তিনি বাড়ি বাড়ি ঘুরে রেজিস্ট্রেশন করেছেন। আমি নিজেও সঙ্গে গিয়ে তা দেখেছি। নিজের মূল্যবান সময় তিনি দিয়েছেন একটাই কারণে স্কুলের সম্মান যেন অটুট থাকে এবং কোনো শিক্ষার্থী যেন বাদ না পড়ে। কে কোন ব্যাচের, কার সামর্থ্য আছে কি নেই, ছবি আছে কি না এসব বিষয় তাঁর কাছে কখনোই মুখ্য ছিল না। তাঁর একমাত্র চিন্তা ছিল, যেন প্রত্যেক শিক্ষার্থী সহজে রেজিস্ট্রেশন করতে পারে এবং প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। একজন শিক্ষার্থীও যেন বঞ্চিত না হন এই দায়বদ্ধতা তিনি শেষ পর্যন্ত বহন করে গেছেন। এমন মানসিকতা ও দায়িত্ববোধ সত্যিই বিরল। এত বড় মন না থাকলে এভাবে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করা সম্ভব নয়। খোকন ভাইয়ের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিক ভালোবাসা।
আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সুস্থ রাখুন, নেক হায়াত দান করুন এবং তাঁর এই মহৎ কাজগুলোকে আরও বিস্তৃত করার তৌফিক দিন। আমিন।
মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন
এসএসসি ১৯৯৬ ব্যাচ
স্কুল ফেসবুক গ্রুপের অ্যাডমিন
স্কুলের ১০০ বছর পূর্তির “শতাব্দীর মশাল”-এ প্রকাশিত