কোটিপতি প্রার্থী ৮৯১


কোটিপতি প্রার্থী ৮৯১
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১ হাজার ৯৮১ প্রার্থীর মধ্যে ৮৯১ জন কোটিপতি। এরমধ্যে ২৭ জনের সম্পদ শতকোটি টাকার বেশি। আবার মোট প্রার্থীর সাড়ে ২৫ শতাংশই ঋণগ্রস্ত। এদের ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। দুজন প্রার্থী ব্রিটিশ নাগরিকত্বের তথ্য গোপন করেছেন। আর দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্য দিয়েছেন ২১ জন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) করা ‘নির্বাচনি হলফনামা’ বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সংস্থাটির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এ সময় জানানো হয়, ঋণখেলাপিদের সঙ্গে যোগসাজশে তাদের নির্বাচনের সুযোগ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এছাড়াও এবার প্রায় ৩০ শতাংশ প্রার্থীর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার তথ্য নেই। এসএসসি পাশ করেননি এ ধরনের প্রার্থী ৮ দশমিক ৭২ শতাংশ। ৪৮ শতাংশ প্রার্থী পেশা হিসাবে ব্যবসা উল্লেখ করেছেন। তথ্য তুলে ধরেন টিআইবির আউটরিট অ্যান্ড কমিশন পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। এ সময় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন ব্যবসাভিত্তিক রাজনীতির কাছে জিম্মি। আর নির্বাচনের প্রার্থী তিনটি শক্তি। এগুলো হলো-অর্থ, পেশিশক্তি ও ধর্ম। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। চূড়ান্ত প্রার্থী এক হাজার ৯৮১ জন। এর মধ্যে ১ হাজার ৭৩২ জন দলীয় এবং ২৪৯ জন স্বতন্ত্রভাবে লড়বেন। অর্থাৎ ১৩ শতাংশ প্রার্থী স্বতন্ত্র। তবে প্রথমবার নির্বাচন করছেন এমন প্রার্থী ১ হাজার ৬৯৬ জন। তথ্য গোপন : টিআইবি বলছে, কয়েকজন প্রার্থী হলফনামায় দ্বৈত নাগরিকত্ব ও সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। এর মধ্যে দুজন প্রার্থী দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্য হলফনামায় উল্লেখ করেননি। এই দুজনই ব্রিটিশ নাগরিক। দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্য গোপন করা দুই প্রার্থীর নাম উল্লেখ করেনি টিআইবি। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আমাদের নীতিমালা অনুযায়ী এই ধরনের তথ্য প্রকাশ করতে বাধ্য নই। তবে ওই সব তথ্য টিআইবির কাছে আছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা অবহিত করা হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়, একজন প্রার্থীর নির্ভরশীলদের নামে ২০১৩ সালে যুক্তরাজ্যে ১ দশমিক ৪ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের বাড়ি কেনা হয়েছে। স্থানীয় মুদ্রায় এর মূল্য ২১০ কোটি টাকা। কিন্তু তিনি তা হলফনামায় উল্লেখ করেননি। বাড়িটি কেনার ক্ষেত্রে ‘শেল কোম্পানি’র (অর্থ পাচারে সহায়তাকারী) আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল। যার মূল মালিকানা দেখানো হয়েছে দুবাই। আরেকজন প্রার্থী বিদেশে সম্পদের কোনো তথ্য দেননি। কিন্তু স্ত্রীর নামে দুবাইতে ফ্ল্যাট রয়েছে। অন্যদিকে একজন প্রার্থী হলফনামায় বলেছেন বিদেশে তার তিনটি ফ্ল্যাট রয়েছে। কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা কমপক্ষে এর তিনগুণ বেশি। এক্ষেত্রে তার সম্পদ প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। আরেকজন প্রার্থী বিদেশে নিজস্ব মালিকানায় কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থাকার কথা উল্লেখ করেননি। কিন্তু টিআইবির অনুসন্ধানে তার ১১টি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান মিলেছে। এর মধ্যে আটটিই বর্তমানে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যুক্ত। এছাড়া একজন প্রার্থীর ‘কর স্বর্গে’ (পানামা পেপার্সে) কোম্পানির নিবন্ধন থাকার তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু তিনি হলফনামায় তা উল্লেখ করেননি। দ্বৈত নাগরিক : হলফনামায় ২১ জন প্রার্থী বলেছেন তাদের দ্বৈত নাগরিকত্ব ছিল, কিন্তু ত্যাগ করেছেন। ৩১ জন প্রার্থী বিদেশি উৎস থেকে আয় করেন। বিদেশে বিনিয়োগ করেছেন এ ধরনের প্রার্থীর সংখ্যা ২৫। আবার দেশের বাইরে সম্পদ বা জমির মালিকানা রয়েছে এ ধরনের প্রার্থীর সংখ্যা ১৭। কোটিপতি : এবারের নির্বাচনে কোটিপতি প্রার্থী ৮৯১ জন। স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্যের ভিত্তিতে এই কোটিপতি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক ২৭ জন। এরা হলেন-মো. আমিনুল ইসলাম ৬১৯ কোটি টাকা, আবদুল আউয়াল মিন্টু ৬০৭ কোটি, মো. জাকির হোসেন সরকার ৫৮১ কোটি, এসএমকে একরামুল ইসলাম ৪৯৯ কোটি, মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী ৪৭২ কোটি, ফখর উদ্দিন আহমেদ ২৯৯ কোটি, জাকারিয়া তাহের ২৯২ কোটি, সালাউদ্দিন আলমগীর ২৮৩ কোটি, এমএএইচ সেলিম ২৬২ কোটি, গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ ২৫৬ কোটি, মো. জালাল উদ্দিন ২৩১ কোটি, মোহাম্মদ ফজলুল আজিম ১৮৮ কোটি, মো. সফিকুর রহমান (কিরন) ১৮৫ কোটি, মো. শাহ আলম ১৮৪ কোটি, মো. হারুন রশিদ ১৭৫ কোটি, হামিদুর রহমান ১৬১ কোটি, জামাল আহমেদ চৌধুরী ১৬০ কোটি, ফারহানা কাদির রহমান ১৫৯ কোটি, নাসের রহমান ১৪১ কোটি, মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ১২৯ কোটি, মো. আবদুল হান্নান ১২০ কোটি, মো. শহীদউদ্দিন চৌধুরী অ্যানি ১১৪ কোটি, সাইফ আহমেদ ১১১ কোটি, মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ ১০৯ কোটি, আফরোজা খানম ১০৬ কোটি, মাহমুদ হাসান খান ১০৩ কোটি এবং মোহাম্মদ এমদাদুল হক ভরসার ১০০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। ঋণগ্রস্ত : টিআইবির তথ্য অনুসারে এবার সাড়ে ২৫ শতাংশ প্রার্থীর কোনো না কোনো ঋণ রয়েছে। গত পাঁচটি নির্বাচনের মধ্যে ঋণগ্রস্ত প্রার্থী এবারই সবচেয়ে কম। তবে ঋণের অঙ্ক বিবেচনায় নিলে এবার সবচেয়ে বেশি। তাদের ঋণের স্থিতি ১৮ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক ঋণ ১৭ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। দলীয় বিবেচনায় বিএনপির ৫৯ দশমিক ৪১ শতাংশ প্রার্থী ঋণগ্রস্ত। এই তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তাদের ঋণের হার ৩২ দশমিক ৭৯ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে থাকা জাতীয় পার্টির ২৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ প্রার্থী ঋণগ্রস্ত বলে জানিয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ২৫ শতাংশ, জামায়াতে ইসলামীর ২২ দশমিক ২৬ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ঋণ রয়েছে-এসএকে একরামুজ্জামান ৩ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা, এসএম ফয়সল ২ হাজার ৪১ কোটি টাকা, মো. খালেদ হোসেন মাহবুব ১ হাজার ৪৭০ কোটি, আফরোজা খানম ১ হাজার ৩৬০ কোটি, মো. আব্দুল্লাহ ১ হাজার ১১৫ কোটি, খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর ৮৪৬ কোটি টাকা, মো. শাহ আলম ৮২৪ কোটি, কাজী রফিকুল ইসলাম ৭৪৮ কোটি, মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী ৬৯৯ কোটি টাকা ও গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর ঋণ ৬৯৮ কোটি টাকা। আয়কর : হলফনামার তথ্য অনুসারে প্রার্থীদের মধ্যে ৯৭ দশমিক ২৫ শতাংশ করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) দিয়েছেন। ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিয়েছেন এমন তথ্য দিয়েছেন ৭০ দশমিক ১৮ শতাংশ। রিটার্নে আয়ের বিবরণী দিয়েছেন ৬৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ। সম্পদের বিবরণ দিয়েছেন ১৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। এসব প্রার্থীদের করযোগ্য আয় ৬৯৩ কোটি টাকা। আর সর্বশেষ বছরে কর পরিশোধ হয়েছে ৫৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। ইসলামপন্থিদের সংখ্যা বেড়েছে : টিআইবি বলছে-এবারের নির্বাচনে ইসলামপন্থি দলগুলোর প্রার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। মোট প্রার্থীর ৩৬ ভাগের বেশি ইসলামপন্থি দলগুলোর। গত পাঁচটি নির্বাচনের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ। তবে প্রতিবারের মতো এবারও নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ ৫ শতাংশের নিচে। এতে জুলাই সনদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। নির্বাচনি ব্যয় : হলফনামায় একটি জায়গায় বলা আছে নির্বাচনে কত টাকা ব্যয় করবেন। এক্ষেত্রে সব দলের প্রার্থীদের ঘোষিত মোট নির্বাচনি ব্যয় দেখানো হয়েছে ৪৬৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এতে প্রতিজন প্রার্থীর গড় ব্যয় সাড়ে ২২ লাখ টাকা। ঘোষিত সবচেয়ে বেশি ব্যয় বিএনপির। তাদের ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ১১৯.৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে জামায়াতে ইসলামীর মোট ব্যয় ৮০.৬ কোটি টাকা। টিআইবি বলছে, ৫৩০ জন প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা আছে। যা মোট প্রার্থীর ২২.৬৬ শতাংশ। এর আগের নির্বাচনে মামলা ছিল ৭৪০ জন বা ৩১.৬৪ শতাংশ প্রার্থীর বিরুদ্ধে। পেশা : এবার ৪৮ শতাংশের বেশি প্রার্থী পেশা হিসাবে ব্যবসা উল্লেখ করেছেন। আইন ১২.৬১ এবং শিক্ষকতা ১১.৫৬ শতাংশ প্রার্থী। রাজনীতিকে পেশা হিসাবে দেখিয়েছেন ১.৫৬ শতাংশ প্রার্থী। এবার ২৫৯ প্রার্থীর তুলনায় তাদের স্বামী-স্ত্রী/নির্ভরশীলদের অস্থাবর সম্পদ বেশি। ১১৮ প্রার্থীর তুলনায় তাদের স্বামী-স্ত্রী/নির্ভরশীলদের দালান বা ফ্ল্যাট সংখ্যা বেশি। ১৬৪ প্রার্থী উল্লেখ করেছেন, তাদের তুলনায় স্বামী-স্ত্রী/নির্ভরশীলদের জমির পরিমাণ বেশি। শিক্ষাগত যোগ্যতা : এবার স্নাতকোত্তর প্রার্থী ৪৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ। স্নাতক পাশ করেছেন ২৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছেন ৮ দশমিক ৯৪ এবং মাধ্যমিক ৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ কিছুটা বেশি। নিম্ন মাধ্যমিক ৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ, শুধু স্বাক্ষর দিতে পারেন ২ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং স্বশিক্ষিত দশমিক ৭৭ শতাংশ। এ হিসাবে এসএসসি পাশ করেননি এ ধরনের প্রার্থীর হার ৮ দশমিক ৭২ শতাংশ।