জয়-পরাজয়ের নিয়ামক নীরব ভোটার


জয়-পরাজয়ের নিয়ামক নীরব ভোটার
বিগত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর এবারের ভোট দেশের গণতান্ত্রিক উত্তেরণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোটের প্রত্যাশা সবার। এছাড়া এবারই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হচ্ছে গণভোটও। ফলে স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চেয়ে এবারের নির্বাচন অনেকটাই আলাদা। বিশেষ করে চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পালটে গেছে ভোটের নানা হিসাব-নিকাশ। এ নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের সমীকরণ বদলে দিতে পারে তরুণ ভোটাররা। এছাড়া অতীতের মতো এবারও মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী ভোটার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। বিভিন্ন এলাকা বা আসনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটাররাও বড় ‘ফ্যাক্টর’। এছাড়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে নেই। তবে দলটির সাধারণ নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ভোটও নানা সমীকরণে গুরুত্ব পাচ্ছে। এসব তরুণ, নারী, সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে অনেকেই এবার ভোটের মাঠে নীরব ভ‚মিকায় রয়েছেন। অর্থাৎ তারা প্রকাশ্যে কোনো দল বা জোটের প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে মাঠে নামেননি। ভোটকক্ষের গোপন বুথে ব্যালটে সিলের মধ্য দিয়ে তারা তাদের চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন। ফলে প্রকাশ্যে অবস্থান না নেওয়া এসব নীরব ভোটাররাই এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আলোচনায়। কারণ শেষ মুহূর্তে তারাই জয়-পরাজয়ের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসাবে কাজ করবেন। অর্থাৎ তারা যে দল বা প্রার্থীদের ভোট দেবেন তাদের বিজয়ের পাল্লা ভারী হবে বলে হবে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারে পতন ঘটে। বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দলটি এবার নির্বাচনেও অংশ নিতে পারছে না। দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাসহ বেশির ভাগ কেন্দ্রীয় নেতা এবং সাবেক এমপি-মন্ত্রী হয় পলাতক নয়তো জেলে। মাঝে-মধ্যে দু-চারটি ঝটিকা মিছিল এবং অনলাইনে এক্টিভিজম ছাড়া মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় নেই দলটি। তাদের তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরাও হামলা-মামলায় জর্জরিত হয়ে অনেকটা নীরবেই দিনাতিপাত করছেন। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে ভোট বর্জনের আহ্বান জানানো হয়েছে। যদিও কিছু কিছু জায়গায় নানা কারণে স্থানীয় প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। বেশির ভাগ জায়গাতেই তারা নীবর রয়েছেন। তবে মাঠে সক্রিয় না থাকলেও দলটির ভোট যে গুরুত্বহীন হয়ে গেছে, এমনটি মনে করছেন না স্থানীয় রাজনীতিবিদরা। ফলে ভোটের মাঠে তাদের কদর বেড়েছে। কারণ আওয়ামী লীগের এসব নীরব ভোটই ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে সক্ষম বলে মনে করছেন তারা। দেশের একটি বিশাল অংশ তরুণ প্রজন্ম। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সি ভোটারের সংখ্যা এখন প্রায় পাঁচ কোটি। বিশাল এই জনশক্তিই আগামীর ক্ষমতার লড়াইয়ে প্রধান ‘কিংমেকার’ হিসাবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। এসব নতুন ভোটারের বড় একটি অংশ দলীয় রাজনীতির বাইরে অবস্থান করায় তাদের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবে তা আগে থেকে বলা কঠিন। কারণ তারা রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে এলাকার উন্নয়ন, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, ক্লিন ইমেজের প্রার্থী এবং প্রার্থীর মাঠপর্যায়ের উপস্থিতিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। ফলে দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা এই নতুন ভোটাররা শেষ মুহূর্তে যে প্রার্থীর দিকে ঝুঁকবেন, সেই প্রার্থীর বিজয় সহজ হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। এদিকে তরুণদের পাশাপাশি নারী ভোটারদের পক্ষে আনতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন ভোটারের মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা ছয় কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন। বাংলাদেশের সামাজিক পেক্ষাপটে তৃণমূলের নারীদের বড় একটি অংশ সরাসরি কোনো দলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত নয়। ফলে ভোটের হিসাবে যেকোনো আসনের নির্বাচনে নারী ভোটারদের বড় অংশকে পক্ষে আনতে পারলেই বিজয় সুনিশ্চিত। এমন চিন্তা থেকে দলগুলো পরিচালনা করছে তাদের প্রচার কার্যক্রম। দলীয় ইশতেহার ও নির্বাচনি প্রতিশ্র“তিতেও আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে নারীদের। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নির্বাচন কমিশন আলাদা করে হিসাব না করলেও বিভিন্ন সংগঠনের তথ্য মতে, দেশে এক কোটির উপরে সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছেন। এর মধ্যে কিছু কিছু আসনে উলে­খযোগ্য সংখ্যক ভোটার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। কোনো কোনো আসনে এই সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটাররা নির্দিষ্ট কোনো দলের নয়। প্রায় সব দলেই তাদের নেতাকর্মী ও সমর্থক রয়েছেন। এছাড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়েরর একটি বড় অংশ রাজনীতিতে সক্রিয় নয়। অর্থাৎ তারাও নীরবে শেষ মুহূর্তে বেছে নেবেন পছন্দের প্রার্থী। জানতে চাইলে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ড. আব্দুল আলীম বলেন, এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের অন্যতম নিয়ামক ভূমিকা পালন করবেন তরুণ ভোটাররা। ভোটের যে গতি-প্রকৃতি দেখা যাচ্ছে, এতে এক প্রার্থীর সঙ্গে আরেক প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান কম হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কোনো আসনে তরুণ ভোটাররা যে প্রার্থীর দিকেই ঝুঁকবেন, তারই সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।