জ্বালানির দামের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চালের দাম: পাইকারিতে বস্তাপ্রতি ১০০-২০০৳ বাড়তি
অনলাইন নিউজ ডেক্স
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে চালের পাইকারি বাজারে। রাজধানীর বিভিন্ন পাইকারি বাজারে ধরনভেদে ৫০ কেজির এক বস্তা চালে ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। তবে পাইকারিতে দাম বাড়লেও খুচরা বাজারে এখনো এর পুরো প্রভাব পড়েনি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পুরোনো দরের চালের মজুত শেষ হওয়ার পর খুচরা বাজারেও দাম বাড়তে পারে।
গত ২০ সেপ্টেম্বর সরকার ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ায়। নতুন দরে ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এর ১১ দিন পর রাজধানীর বাবুবাজার, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া ও মহাখালী বাজার ঘুরে চালের পাইকারি দরে বাড়তির প্রবণতা দেখা গেছে।
যাত্রাবাড়ীর চালের আড়তে ৫০ কেজির আটাশ চালের বস্তা ২ হাজার ৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। মিনিকেট চালের বস্তা বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৩০০ টাকায়। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়াই মূলত পাইকারি দরে এই বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
তবে খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদের হাতে আগে কেনা চালের মজুত থাকায় এখনই দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই। নতুন দরের চাল বাজারে আসার পর খুচরা পর্যায়েও দাম বাড়তে পারে।
যাত্রাবাড়ীর মেসার্স করিম রাইস এজেন্সির বিক্রয়কর্মী শাহ আলম বলেন, প্রায় ২০ দিন আগে আটাশ চালের বস্তা ২ হাজার ৫০ টাকা থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি করেছেন। এখন একই চাল বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ১৫০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা দরে।
অর্থাৎ পাইকারি পর্যায়ে কেজিতে মোটা চালের দাম বেড়েছে প্রায় ২ থেকে ৩ টাকা। তার হিসাবে আটাশ জাতের সবচেয়ে কম দামের আতপ চালের বস্তার দাম এখন ১ হাজার ৯৭৫ টাকা।
বিভিন্ন আড়তে মিনিকেট, আটাশ, পাইজাম ও নাজিরশাইলসহ বিভিন্ন জাতের চালের দামও বেড়েছে। যাত্রাবাড়ীর বাজারে মিনিকেটের ৫০ কেজির বস্তা ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
শনির আখাড়ার মেসার্স শফিক এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শফিকুল ইসলাম বলেন, আড়তে আটাশ চালের বস্তায় প্রায় ১৫০ টাকা এবং চিকন চালের ক্ষেত্রেও প্রায় ১৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।
তবে তিনি এখনো খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়াননি। তার ভাষায়, নতুন দরে চাল কিনলে কেজিপ্রতি প্রায় তিন টাকা বেশি খরচ পড়ছে। কিন্তু দোকানে আগের দরে কেনা চাল থাকায় সেগুলো শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন দাম নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে তার লাভও কমে গেছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন ব্যয় বাড়লেও খুচরা বাজারে চালের দামে এখনো বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে প্রতিযোগিতা বেশি থাকায় নতুন দরে কেনা চালও অনেকে আগের দরে বিক্রি করছেন।
শনির আখাড়ার এক খুচরা বিক্রেতা বলেন, আটাশ চাল ৫৫ টাকা, মিনিকেট ৭০ টাকা, পাইজাম ৬৬ টাকা এবং নাজিরশাইল ৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন। তবে আগের তুলনায় তার লাভ কমেছে।
তিনি বলেন, এলাকায় একসঙ্গে এক–দুই টাকা দাম বাড়ানো কঠিন। তাই আরও কিছুদিন আগের দামেই চাল বিক্রি করবেন। বাজার কোন দিকে যায়, তা দেখে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মহাখালী কাঁচাবাজারের এক ব্যবসায়ীও জানান, তার দোকানে থাকা চালের মজুত আরও ১০ থেকে ১৫ দিন চলবে। নতুন করে চাল কেনার পরই নতুন দরের প্রভাব পড়বে।
বাবুবাজারের চালের আড়তের ব্যবসায়ীরাও বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে চালের পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। তবে নতুন দাম এখনো পুরোপুরি স্থির হয়নি।
চাঁদপুর ট্রেডার্সের ব্যবসায়ী আলিফ হোসেন বলেন, একবারে চালের দাম বাড়ে না। ধীরে ধীরে বাড়ে। পরিবহন খরচের সঙ্গে মিলিয়ে কেউ বস্তায় ৫০ টাকা, কেউ ১০০ টাকা বা তার বেশি বাড়াচ্ছেন। এখনো বাজারের দর স্থির হয়নি।
বাবুবাজারের আরেক ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান সিকদার জানান, এক সপ্তাহের ব্যবধানে একটি কোম্পানির মিনিকেট চালের ৫০ কেজির বস্তায় ১৫০ টাকা দাম বেড়েছে। মাঝারি মানের মিনিকেটের বস্তা ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৬০০ টাকা হয়েছে। অন্য একটি কোম্পানির আটাশ চালের বস্তা ১৫০ টাকা বেড়ে ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তবে ব্যবসায়ীদের কেউই এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না, শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারে চালের দাম কতটা বাড়বে।
খোলা চালের পাশাপাশি বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের বাজারজাত করা দুই ও পাঁচ কেজির প্যাকেটজাত চালের দামও এখনো বাড়েনি। রাজধানীর বাজারে পাঁচ কেজির বিভিন্ন ব্র্যান্ডের চাল ৪৮০ থেকে ৫২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খুচরা বাজারে মোটা জাতের আটাশ চাল ৫২ থেকে ৫৫ টাকা, বিভিন্ন ধরনের চিকন চাল ৬৫ থেকে ৭২ টাকা এবং কাটারিভোগ প্রায় ৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। প্যাকেটজাত চিকন চালের ক্ষেত্রে কেজিপ্রতি দাম পড়ছে প্রায় ৯৫ থেকে ১০৫ টাকা।
ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ঢাকা মহানগরের দৈনিক বাজারদরের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার নাজিরশাইল ও মিনিকেট চাল ৭২ থেকে ৮৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। এক মাস আগে এসব চালের দাম ছিল ৭০ থেকে ৮৫ টাকা। আর গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর একই ধরনের চালের দাম ছিল ৭৫ থেকে ৮৫ টাকা কেজি।
অর্থাৎ সাম্প্রতিক সময়ে খুচরা বাজারে চালের দামে বড় ধরনের পরিবর্তন এখনো দেখা যায়নি। তবে পাইকারি বাজারে নতুন দরের চাল আসায় আগামী দিনগুলোতে খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে চালের চাহিদা প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৯০ লাখ টন। ফলে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব চালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে কতটা পড়ে, সেটি এখন নির্ভর করবে নতুন চালানগুলো কী দরে বাজারে আসে এবং পরিবহন খরচ কতটা বাড়ে তার ওপর।
