জ্বালানি তেলের সংকট প্রকট, বাড়ছে হট্টগোল-বিশৃঙ্খলা
অনলাইন নিউজ ডেক্স
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে দীর্ঘায়িত প্রভাবের কারণে দেশে জ্বালানি তেলের সংকট ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে তেলের জন্য লাইন দাঁড়ানো এবং তেল না পাওয়ার ঘটনায় মারামারিতে এরই মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন অনেকে। তেলের অভাবে প্রতিদিনই হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলা চলছে দেশের বিভিন্ন স্থানে।
জেল-জরিমানা আর প্রশাসনের অভিযানের মধ্যেও চলছে অবৈধ মজুত ও কালোবাজারি। সংকট শুধু দৈনন্দিন যাতায়াত নয়, মানুষের মানসিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানো, ভোগান্তি ও তেলের জন্য অস্থিরতার কারণে নাগরিকদের চাপ বেড়েছে। বিশেষ করে সড়কে যানজট এবং দীর্ঘ অপেক্ষা মানুষকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত করছে। যানবাহন চালক ও পরিবারগুলো জীবিকার জন্য অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়েছে।
বিশ্বজুড়ে এই সংকট দেখা যাচ্ছে। উন্নত রাষ্ট্রগুলো কিছুটা সক্ষমতার কারণে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলেও উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলো বড় বিপদে পড়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে তেলের লাইনের দৃশ্য ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ অনেক দেশে দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সব দেশের জন্যই সংকট তৈরি হবে। আর এ অবস্থায় সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ অপরিহার্য।
সরবরাহ ঘাটতি একদিকে যেমন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে অসাধু ব্যবসায়ীরা তেলের অবৈধ মজুত শুরু করেছে। মানুষ আতঙ্কে অতিরিক্ত তেল কিনছে, যা সংকটকে আরও গভীর করছে। সরকার বিকল্প উৎস থেকে তেল আমদানির চেষ্টা চালাচ্ছে।
বাংলাদেশে জ্বালানি তেল আমদানির একমাত্র প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সাধারণত সরকার থেকে সরকার চুক্তি ও আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে তেল আসে। বর্তমান অস্থিরতায় সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে তেল আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্তত ১১টি দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য চোখে পড়ছে। ঢাকার কল্যাণপুর, তেজগাঁও, মিরপুর, শাহবাগ, গাবতলী ও আসাদগেটে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নেওয়ার চেষ্টা করছে। পিকআপ, ট্রাক ও বাসচালকরা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় তেল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় ২০ লিটার নেওয়ার কথা থাকলেও ৫-১০ লিটার দেওয়া হচ্ছে। ফলে গাড়ি চালাতে ও যাত্রী পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে, আয় ও জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে।
শনিবার গভীর রাতে নড়াইলে এক পেট্রোল পাম্প ম্যানেজারকে ট্রাকে চাপা দিয়ে হত্যা করার ঘটনায় জেলার সব পাম্প এক দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর আগে ঝিনাইদহে তেল নিতে গিয়ে পাম্প কর্মীদের হামলায় এক যুবক নিহত হয়েছেন। এ ধরনের ঘটনা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আতঙ্ক ও অস্থিরতা তৈরি করছে।
অবৈধভাবে তেল মজুতের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছেন। গাইবান্ধা, গোবিন্দগঞ্জ, গাজীপুর, কালিয়াকৈরসহ বিভিন্ন এলাকায় ডিজেল ও পেট্রোল জব্দ এবং জরিমানা কার্যক্রম চালানো হয়েছে। রাজশাহীর সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
রংপুর বিভাগে পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপোতে শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালীন কর্মবিরতি ও তেলের উত্তোলন বন্ধ হওয়ায় আট জেলায় সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পার্বতীপুর উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন শ্রমিকদের আশ্বস্ত করলে কর্মবিরতি প্রত্যাহার হয় এবং রাত ৮টা থেকে পুনরায় তেলের সরবরাহ শুরু হয়।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ১১ নির্দেশনা
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিসে অবস্থান ও জ্বালানি সাশ্রয়ে ১১ দফা নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সকাল ৯টা থেকে ৯টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত নিজ নিজ অফিস কক্ষে বাধ্যতামূলক উপস্থিতি নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গতকাল রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করা হয়। নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, দিনের বেলায় পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো থাকলে বৈদ্যুতিক বাতি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে। সরকারি নির্দেশনা ছাড়া আলোকসজ্জা পরিহার করতে হবে। নির্দেশনা প্রতিপালনে ভিজিল্যান্স টিম গঠন করা কথা বলা হয়েছে।
লিগ্যাল নোটিশ
সারাদেশে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ‘সংকট’ নিরসনে জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানির একক নিয়ন্ত্রণ বাতিল চেয়ে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আইনি (লিগ্যাল) নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নোটিশে জ্বালানি তেল মজুতদারি ও কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও পেট্রো বাংলার আমদানির বিপরীতে বকেয়া ৩৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। গতকাল মানবাধিকার সংগঠন ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব ও ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওছার ই-মেইল ও ডাকযোগে এ নোটিশ পাঠান। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে নোটিশে জানানো হয়েছে।
নোটিশে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র সচিব, বিপিসি চেয়ারম্যান, যমুনা অয়েলের এমডি, পদ্মা অয়েলের এমডি, মেঘনা পেট্রোলিয়ামের এমডি, ইস্টার্ন রিফাইনারির এমডি, বাংলাদেশ খনিজ, তেল ও গ্যাস করপোরেশনের (পেট্রো বাংলা) চেয়ারম্যান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরকে বিবাদী করা হয়েছে।
