ট্রাম্পের শুল্ক এড়াতে যে কৌশল নিচ্ছে ইইউ


ট্রাম্পের শুল্ক এড়াতে যে কৌশল নিচ্ছে ইইউ
গ্রিনল্যান্ড দখলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনান্ড ট্রাম্পের হুমকি ও আট দেশের ওপর শুল্প আরোপের পর ইউরোপের নেতারা এখন দৌড়ঝাপ শুরু করেছেন। তারা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ এখনও না নিলেও শুল্ক নিয়ে পাল্টা প্রতিশোধের চিন্তা করছেন। এই অবস্থায় ৯৩ বিলিয়ন ইউরোর (১০৮ বিলিয়ন ডলার) প্রতিশোধমূলক শুল্ক সক্রিয় করার বিষয়টি তারা ভাবছেন। গতকাল রয়টার্সের প্রতিবেদনে এসব তথ্য বলা হয়। ইউরোপের নেতারা কোনোভাবেই ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে চান না। তবে হুমকি বা পাল্টা আঘাতের পথে যেতেও তারা অনিচ্ছুক। মূলত উত্তেজনা এড়িয়ে সমস্যার সমধান করতে চায় ইউরোপ। রোববার ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতদের জরুরি বৈঠকের পর নেতারা জানিয়েছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইউ) অগ্রাধিকার হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন করা। কোনো ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি করা নয়, বরং ট্রাম্পকে ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর শুল্ক আরোপ থেকে বিরত রাখার প্রচেষ্টা তীব্র করা। এজন্য তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংলাপে অংশ নিতে যাচ্ছেন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে অনড় রয়েছে। রোববার ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প বলেন, গ্রিনল্যান্ডের সুরক্ষা দেওয়ার সময় এসেছে এবং এখনই তা করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টও বলেছেন, ইউরোপ বুঝতে পারবে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের উদ্দেশ্য সর্বোত্তম। অন্যদিকে ইউরোপীয় কমিশনের মুখপাত্র ওলফ গিল গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা শুল্ক ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের ক্ষতি করবে। রোববারের ওই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতরা একটি বিস্তৃত চুক্তিতে পৌঁছেছেন। এই চুক্তির লক্ষ্য হলো ট্রাম্পকে ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর শুল্ক আরোপ থেকে বিরত রাখার প্রচেষ্টা তীব্র করা। এছাড়া শুল্ক কার্যকর শুরু হলে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে চুক্তিতে। গত শনিবার ট্রাম্প ডেনমার্ক, সুইডেন, নরওয়ে, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস এবং ফিনল্যান্ডের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এটা কার্যকর হবে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে। গ্রিনল্যান্ড বিক্রির চুক্তি না হলে এই শুল্ক জুন মাসে গিয়ে বেড়ে ২৫ শতাংশ আরোপ হবে। ট্রাম্প এই পদক্ষেপের যৌক্তিকতা হিসেবে আর্কটিক অঞ্চলে জাতীয় নিরাপত্তা এবং কৌশলগত স্বার্থের কথা উল্লেখ করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে ইইউ মুখপাত্র বলেন, ইইউ নেতারা নিবিড়ভাবে পরামর্শ করছেন। পাশাপাশি সব স্তরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নেতৃত্বের অন্যতম গুণ হলো সংযম। হুমকি-ধমকির বিষয়টি এড়িয়ে আমরা সব পক্ষের জন্য একটি ভালো সমাধান খুঁজে পেতে চাই। ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করার জন্য বৃহস্পতিবার ইইউ নেতারা আবারও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। এই বৈঠকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বাস্তব বিকল্প প্রস্তুত করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ৯৩ বিলিয়ন ইউরো (১০৮ বিলিয়ন ডলার) পর্যন্ত প্রতিশোধমূলক শুল্ক পুনরায় সক্রিয় করার বিষয়টি। ইইউ মুখপাত্র বলেন, ইইউর অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু করা হবে। তবে আপাতত সংলাপের মাধ্যমে সমাধান খুঁজে বের করার উপর মনোনিবেশ করছি। আমরা সর্বোচ্চ ইইউ ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখতে চাই। এ সময় তিনি জানান, সুইজারল্যান্ডের দাভোসে শুরু হওয়া বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে ট্রাম্পের সঙ্গে ইইউ কমিশন সভাপতি উরসুলা ভন ডের লেইনের বৈঠকের কোনো পরিকল্পনা নেই। ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি বিশ্ব বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। ডলারের বিপরীতে পড়ে যাচ্ছে ইউরো ও স্টার্লিং। এই অবস্থায় বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা ফিরে আসার শঙ্কা রয়েছে। পাল্টা শুল্ক আরোপের চিন্তা ইইউর সিএনএন জানায়, ইউরোপের নেতারা মার্কিন আমদানির ওপর ৯৩ বিলিয়ন ইউরো শুল্ক আরোপ করার যে চিন্তা করছেন তা আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুরু হতে পারে বলে জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরেকটি বিকল্প ব্যবস্থা হচ্ছে অ্যান্টি কোর্সিয়ন ইনস্ট্রুমেন্ট বা এসিআই, যা পাবলিক টেন্ডার, বিনিয়োগ বা ব্যাংকিং কার্যকলাপে যুক্তরাষ্ট্রকে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। ইইউর একটি সূত্রের মতে, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপের তুলনায় শুল্ক প্যাকেজটি প্রথম প্রতিক্রিয়া হিসেবে নেতারা সমর্থন দিয়েছেন। ডাভোসে ট্রাম্পের বক্তব্যে নজর ডাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে ট্রাম্প আগামীকাল বুধবার বক্তব্য দেবেন। একজন ইইউ কূটনীতিক রয়টার্সকে জানিয়েছেন, টেবিলে সমস্ত বিকল্প আছে। ডাভোসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা হবে এবং পরে নেতারা বৈঠকে বসবেন। ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি আন্তোনিও কস্তা সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে বলেছেন, ইইউ সদস্যরা ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ডকে দৃঢ় সমর্থন দিয়েছেন। যেকোনো ধরণের জবরদস্তির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রস্তুতিও তাদের রয়েছে। ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকে রাসমুসেন অসলোতে তার নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বলেছেন, ডেনমার্ক কূটনীতির ওপর মনোযোগ অব্যাহত রাখবে। গ্রিনল্যান্ড সুরক্ষায় ডেনমার্ক কিছুই করেনি: ট্রাম্প বিবিসি জানায়, ট্রাম্প প্রশাসন পিছু হটার কোনও লক্ষণ দেখায়নি। এনবিসির মিট দ্য প্রেসে এক সাক্ষাৎকারে ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ইউরোপীয় নেতারা অবশেষে বুঝতে পারবেন, গ্রিনল্যান্ডের ওপর ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ ভূখণ্ডটির জন্য, ইউরোপের জন্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সর্বোত্তম। তিনি মনে করেন, ইউরোপীয় নেতারা এগিয়ে আসবেন। রোববার রাতে ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে বলেন, ন্যাটো ২০ বছর ধরে ডেনমার্ককে বলে আসছে, দেশটিকে গ্রিনল্যান্ড থেকে রাশিয়ার হুমকি দূর করতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত ডেনমার্ক এ ব্যাপারে কিছুই করতে পারেনি। এখন সময় এসেছে, এবং এটি করা হবে। সূত্র: বিবিসি, সিএনএন ও রয়টার্স