ঢাকা-৮ আসনে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর শান্তিনগরে হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে এক অনুষ্ঠানে এ ঘটনা ঘটে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এই ঘটনার জন্য বিএনপিকে অভিযুক্ত করেছে।
এ ঘটনার পর ঢাকার ফকিরাপুল মোড়ে পারাবাত হোটেলের নিচতলায় সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা-১১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, \'মির্জা আব্বাসের নির্দেশ তারেক রহমানের সম্মতিতে নাসিরুদ্দীর পাটোয়ারীর ওপর হামলা হয়েছে।\'
তিনি বলেন, \'আপনারা যদি আওয়ামী লীগের কায়দায়, সন্ত্রাসী কায়দায় প্রতিদ্বন্দ্বীকে মাঠ থেকে সরাতে চান, তবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আপনাদের পার্থক্য কী? আপনারা আওয়ামী লীগের ভোট পাওয়ার জন্য মঞ্চে জয় বাংলা স্লোগান দিচ্ছেন, বক্তব্য দিচ্ছেন। কিন্তু মনে রাখবেন, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে জনগণ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড মেনে নেবে না।\'
নাহিদ ইসলাম বলেন, \'২০১৮ সালে আপনারা মাঠে নামতে পারেননি, ২৮ অক্টোবর তিন মিনিটও দাঁড়াতে পারেননি। তখন আমরা সহানুভূতি জানিয়েছি। কিন্তু এখন আপনারা সমালোচনা সইতে পারছেন না। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে আপনারা বেয়াদব বলছেন, কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারি জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে নির্ধারণ করবে—কে বেয়াদব আর কে গ্যাংস্টার।\'
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, \'যদি আঘাত হয়, তাহলে পাল্টা আঘাত আসবে। একদলের প্রার্থীদের দিকে ডিম নিক্ষেপ করা হলে অন্যদলের প্রার্থীদের ওপরও ডিম পড়বে। আমরা এই ধরনের পরিবেশ চাই না। তবে নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ প্রশাসন যদি নীরব ভূমিকা পালন করে, তবে আমাদের যা করণীয় আমরা তাই করব।\'
তিনি বলেন, \'আমরা দেখতে চাই নির্বাচন কমিশন কি ব্যবস্থা নেয়। কলেজ প্রশাসন এটার কি ব্যবস্থা নেয় এবং বিএনপি দলীয়ভাবে কি ব্যবস্থা নেয়।\'
সংবাদ সম্মেলনে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, \'হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে একটি অনুষ্ঠানে আমার বেলা ১২টার দিকে আমন্ত্রণ ছিল আর মির্জা আব্বাসের ছিল দুপুর ২টায়। এ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য কলেজ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলে একজন এসে নিজেকে হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে পরিচয় দেয়। পরবর্তীতে তারা আমাদের ছাত্রনেতা কর্মীদের ওপরে আঘাত শুরু করে। আমাদের দিকে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়। কিল-ঘুষি, লাঠি দিয়ে আমাদের উপর আঘাত শুরু করে এবং সবার উপর ডিম নিক্ষেপ শুরু করে।\'
তিনি বলেন, \'এটা শহীদ ওসমান হাদীর পবিত্র আসন, এই আসনে আপনি দুর্নীতি-চাঁদাবাজি কোনো জিনিসের সাথেই যুক্ত হতে পারবেন না। এখানে হাদী ভাই যেভাবে ক্যাম্পেইন করেছেন আমিও সেভাবে করছি। এজন্য আমি মসজিদে ফজর থেকে এশা পর্যন্ত মসজিদ ভিত্তিক কার্যক্রম শুরু করি এবং আজকে একটা কলেজে গিয়েছিলাম সেখানেও টিচারদের সাথে কথা হয়েছে। আমরা বলেছিলাম এই ভোট পবিত্র আমানত আপনাদের রক্ষা করতে হবে।\'
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, \'মির্জা আব্বাসের যে বাহিনী আমাদের হামলা করলো, এটা নিয়ে আমি পুরো বাংলাদেশের কাছে বিচার দিলাম। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের মাধ্যমে এই সন্ত্রাসী হামলা এবং সন্ত্রাসীরা যেভাবে বাংলাদেশের প্রত্যেক জায়গায় হামলা করে বেড়াচ্ছে এর বিচার করবেন।\'
তিনি বলেন, \'\'তারেক রহমানকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে উনার দলে কি উনি সন্ত্রাসীদের পালবেন নাকি তাদেরকে বহিষ্কার করবেন। তাকে অনুরোধ করব মির্জা আব্বাসকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করার জন্য। খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করলে উনি আমাদের দোয়া দিয়েছিলেন। উনি একটি কথা বলেছিলেন, \'তোমরা আছো, আমি তো বাংলাদেশটা হয়তো দেখে যেতে পারব না, আমি অসুস্থ, তোমরা বাংলাদেশটা ঠিক রাখিও।\' উনি আমাদেরকে এই কথাটা বলেছিলেন। আজকে যদি খালেদা জিয়া সুস্থ থাকতেন তাহলে উনিও লজ্জা পেতেন বিএনপি এবং ছাত্রদলের এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে।\'
এ সময় নাম উল্লেখ করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, \'আজকে সন্ত্রাসী হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন- আসাদুজ্জামান মাসুদ ভূঁইয়া সাবেক আহ্বায়ক হাবিবুল্লাহ বাহার ছাত্রদল, শাহিন উদ্দিন মল্লিক সাবেক আহ্বায়ক সদস্য ছাত্রদল, শরীফ সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ ইউনিট, শাহিন খান উনি প্রশ্ন ফাঁসের জন্য বহিষ্কার হয়েছেন উনিও আজকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, হায়াত দিয়াজ আশরাফী আহ্বায়ক সদস্য ছাত্রদল। এদের কারো ছাত্রত্ব নাই। আমাকে যারা রিসিভ করেছে ওদের সবার ছাত্রত্ব ছিল এবং এটার যে মাস্টার প্ল্যানে নেতৃত্ব দিয়েছে উনি মির্জা আব্বাসের ভাগিনা আদিত্য। আমরা আগেই পুলিশকে ফোন করেছিলাম মির্জা আব্বাসের ভাগিনা আদিত্য এখানে সন্ত্রাসীদের ভাড়া করে নিয়ে এসেছে।\'
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই ঘটনায় ঢাকা-৮ আসনে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ও পল্টন থানা জামায়াতে ইসলামীর আমীর শাহিন আহমেদ খান, দেওয়ান আব্দুল্লাহ, আয়মান ফয়েজ, মেজবাহ উদ্দিন, আদিব, আসিফ সাত্তারি, কামরুজ্জামান সোহেল, জিয়াউদ্দিন জুবেরসহ অনেকে আহত হয়েছেন।
এই বিষয়ে মির্জা আব্বাসের ভাগিনা মহানগর পূর্ব ছাত্রদলের সিনিয়র সহ–সভাপতি আব্দুল্লাহ জামাল চৌধুরী আদিত্য বলেন, ‘এই ঘটনায় আমি কিছু জানি না। আমি ওই কলেজের শিক্ষার্থীও না। মহানগর ছাত্রদলের একজন ছোট দায়িত্বশীল মাত্র। ডিম নিক্ষেপের ঘটনায় মির্জা আব্বাসের পরিবারের কাউকে জড়াতে হবে-আর আমি ছাত্রদলের রাজনীতিতে জড়িত তাই আমার নাম জড়ানো হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি সংবাদ সম্মেলনে দেখতে পেয়েছি, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে জোড় করে ঢুকতে চাইলে শিক্ষার্থীরা প্রতিহত করেছে। এরপরও পাটোয়ারি রাস্তায় বসেও মব তৈরি করেন।’
এদিকে এই ঘটনায় এনসিপির অভিযোগ সম্পর্কে ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেছেন, ‘তারা এ ধরনের সুযোগই তো খুঁজছে। এরা বহুদিন ধরে চেষ্টা করছে লাগার জন্য। কে লাগবে ওর সঙ্গে খামখা! কী দরকার! প্রয়োজন নেই তো। আমার ঝগড়া করার কোনো প্রয়োজন আছে? আমার ঝগড়ার রেকর্ড আছে? আমি বহু দিন এই এলাকায় নির্বাচন করি—১৯৭৭ সাল থেকে, আজকে থেকে না। আমার কোনো রেকর্ড নাই যে, কোনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে আমার কখনো সংঘর্ষ হয়েছে কিংবা ঝগড়া হয়েছে। ভিন্ন উদ্দেশে এসব অভিযোগ তোলা হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘ওদের কিছু ভিন্নতর উদ্দেশ্য আছে। সেই উদ্দেশ্যের জন্য করছে।’
রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাহাৎ খান জানান, ‘ঘটনার সময় পুলিশ সেখানে উপস্থিত ছিল এবং উত্তেজিত জনতাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে।’
এই ঘটনায় হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজের অধ্যক্ষ কর্নেল (অব) ইমরুল কায়েসের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী কলেজে প্রবেশের সময় সাদা শার্ট পরিহিত হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে ছাত্রদলের সাবেক সদস্য সচিব আসাদুজ্জামান মাসুদ ভূঁইয়া দলবল নিয়ে পাটোয়ারির পথ বন্ধ করে মির্জা আব্বাসকে কেন গ্যাংস্টার বলা হয়েছে এটি জানতে চান। এ সময় তিনি মির্জা আব্বাসকে তাদের নেতা উল্লেখ করে আন্দোলন সংগ্রামেসহ বিভিন্ন সময় আব্বাসের সহযোগিতা নেয়ার কথা বলেন। এক পর্যায়ে পাটোয়ারী কলেজে প্রবেশ করতে চাইলে ভূয়া ভূয়া স্লোগান দেয়া শুরু করেন তারা। এক পর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও কিলঘুষির ঘটনা ঘটে। পরে কলেজ ভবনের ভেতরের বারান্দায় অবস্থান নিলে তাঁর দিকে ডিম নিক্ষেপ করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং কিছু সময়ের জন্য কলেজ এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।
এদিকে আয়োজকরা একটি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমরা তাদেরকে আহ্বান জানিয়েছিলাম আপনারা আসেন। তবে তাদেরকে জানিয়েছি ক্যাম্পাস যেহুতু ছোট তাই বেশি লোকজন আসবেন না। কিন্তু তারা দলবল নিয়ে আসলে ক্যাম্পাসের গেটেই বিশৃঙ্খলা তৈরি করে, গেট ভেঙ্গে ফেলেছে। পিঠা উৎসবের আয়োজনে তৈরি করা পিঠা নিয়ে আসা হয়েছে। কেউ ডিম নিয়ে আসে নাই। তারা নিজেরাই ডিম নিয়ে এসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে।’
