বিদেশিদের সঙ্গে সক্ষমতা দেখাচ্ছেন দেশের প্রকৌশলীরাও


প্রকৌশল চর্চায় এগিয়েছেন দেশের প্রকৌশলীরাও। বিদেশিদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে চলেছেন। মেগা প্রকল্পে বিদেশিদের সঙ্গে তারাও সক্ষমতা দেখাচ্ছেন। বড় বড় প্রকল্পের কাজে স্বল্প সংখ্যক বিদেশির সঙ্গে নিয়ে দেশের প্রকৌশলীরা সেসব বাস্তবায়ন করছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, এখন দেশে সরকারি ও বেসরকারি সেক্টরে বড় বড় উন্নয়ন কাজ হচ্ছে। ভবন নির্মাণ থেকে শুরু করে সড়ক, সেতু, ফ্লাইওভার, টানেল, মেট্রোরেল, স্যাটেলাইটের মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। খরস্রোতা পদ্মার বুকে সেতু নির্মাণ করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রও নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। এসব কাজে বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসাবে দেশীয় প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এসব পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে অল্প সংখ্যক বিদেশি প্রকৌশলীর সঙ্গে দেশের প্রকৌশলীরাও সমানতালে কাজ করছেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এবং গণপরিবহণ বিশেষজ্ঞ ড. মিজানুর রহমান বলেন, দেশের প্রকৌশলীদের বিশ্বমানের সক্ষমতা রয়েছে। পাঠদানের সিলেবাসে কোনো দুর্বলতা নেই। যে কোনো নির্মাণ কাজের নকশা প্রণয়নের সক্ষমতা রয়েছে। তবে বড় বড় যন্ত্রপাতির ঘাটতি রয়েছে; এজন্য সেসব কাজের ক্ষেত্রে বিদেশিদের সহায়তা নিতে হয়। তিনি বলেন, কোনো বিদেশির সহায়তা ছাড়াই বুয়েটে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মাহফুজুল ইসলামের নেতৃত্বে দেশের কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়াররা বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) তৈরি করেছে। ২০১৬ সালে ইভিএম তৈরির কাজ শুরু হয়। আর এটা ২০১৯ সালে সফলতা পায়। তিনি বলেন, এখন বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ কাজ চলছে। এই টার্মিনালের নকশা করেছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান আবদুল মোমেন। এখানে কোনো বিদেশি প্রকৌশলীদের সহায়তা নেওয়া হয়নি। ‘উন্নত জগৎ গঠন করুন’- এই সুমহান আদর্শকে সামনে রেখে বাংলাদেশ অ লে ১৯৪৮ সালের ৭ মে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট গঠন করা হয়। স্বাধীনতার পর এই সংগঠনটির নাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ (আইইবি) করা হয়। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনটিকে তারা ইঞ্জিনিয়ার্স ডে বা প্রকৌশল দিবস হিসাবে পালন করে। সংগঠনটির আজ ৭৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এই সংগঠনের বর্তমান সদস্য সংখ্যা প্রায় হাজার। তবে এর বাইরেও অনেক প্রকৌশলী রয়েছেন। সে হিসাব করলে দেশে বর্তমান ডিগ্রি প্রকৌশলীর সংখ্যা লাখের বেশি। পাশাপাশি দেশে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী রয়েছে প্রায় ৫ লাখ। মাঠ পর্যায়ের উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়নে তারাও ডিগ্রি প্রকৌশলীদের কার্যকর সহযোগিতা দিয়ে চলেছে। পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল, মেট্রোরেল, পেট্রোবাংলা, বাপেক্সে’র মতো প্রকল্প ও প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশের প্রকৌশলীরা। প্রকৌশলগত কাজে বিদেশিদের ভূমিকা সর্বোচ্চ ১০ ভাগ আর ৯০ ভাগ দেশীয় প্রকৌশলীদের। বুয়েট সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হকের ব্যক্তিগত উদ্যোগে বদলে গেছে দেশের ট্রাকের আকার। দেড় দশকের প্রচেষ্টায় সফলতা পেয়েছে তার উদ্যোগ। নিময় ভেঙে ট্রাক মালিকরা আকার পরিবর্তন করে দুপাশে শোল্ডার ও অ্যাঙ্গেল তৈরি করায় দুর্ঘটনা বেড়ে গিয়েছিল। তার দুর্ঘটনা গবেষণায় কারণ পাওয়ার পর সরকারকে বুঝিয়ে সেটা বদলে দেওয়ায় ট্রাকের সঙ্গে অন্য পরিবহণের দুর্ঘটনা কমেছে। বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্স ইনস্টিটিউটের নেতৃত্বে দেশের বড় বড় দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে তা প্রকাশ করা হয়। এখান থেকে সরকার দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারছে। দেশের মোট প্রকৌশলীর ৬৫ ভাগ প্রকৌশলী বেসরকারি খাতে ও ৩৫ ভাগ সরকারি খাতে কাজ করছে। বিদেশেও কর্মরত রয়েছে বিপুলসংখ্যক প্রকৌশলী। দুবাইয়ের বিদ্যুৎ সরবরাহে জড়িত প্রকৌশলীদের ৫০ ভাগের বেশি বাংলাদেশি। হাতিরঝিল প্রকল্প, কুড়িল ফ্লাইওভার প্রকল্পের সব কাজ দেশীয় প্রকৌশলীরা বাস্তবায়ন করেছেন। এ দুটি প্রকল্পের পরামর্শকও ছিল বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা। জিপিএইচ ইস্পাত, সেভেন রিং সিমেন্ট, বসুন্ধরা সিমেন্ট, ক্রাউন সিমেন্ট এই প্রতিষ্ঠানগুলোও পরিচালনা করছেন দেশীয় প্রকৌশলীরা। স্বাধীনের পর দেশে তিনটি প্রকৌশল পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ছিল। ডিডিসি, বিসিএল ও শহীদুল্লা অ্যাসোসিয়েশন। এখন দেশে প্রায় ৬০টির মতো পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। দেশের দক্ষ প্রকৌশলীরা এসব পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সফলতার সঙ্গে পরিচালনা করছেন। আইইবির বক্তব্য : ইঞ্জিনিয়ার্স ডে উপলক্ষ্যে সোমবার রমনাস্থ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশে (আইইবি) এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে সংগঠনের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া তুলে ধরা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতির বক্তৃতায় ইঞ্জিনিয়ার মো. আব্দুস সবুর এমপি বলেন- প্রকৌশলীরা দেশের উন্নয়নের চালিকাশক্তি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রকৌশলীদের কোনো পদচারণা নেই। এজন্য দেশ গড়ার কারিগর প্রকৌশলীদের মনে এক প্রকার হতাশা বিরাজমান রয়েছে। তিনি আরও জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কয়েকটি উইং রয়েছে, যার মাধ্যমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে চলমান কর্মকাণ্ড মনিটরিং করা হয়ে থাকে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি প্রকৌশল উইং গঠন করে তাতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের নিয়োগ করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে চলমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড মনিটরিং ও সমন্বয় করার ব্যবস্থা করা হলে প্রকল্পগুলো সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী সহজে ও যথাযথভাবে অবগত হতে পারবেন। আইইবি প্রেসিডেন্ট বলেন, দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশল পদে অপ্রকৌশলীদের পদায়ন করা হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। এজন্য প্রকৌশল পদগুলো, প্রকল্প পরিচালক পদে কারিগরি পদে অকারিগরি পদায়ন বন্ধ করতে হবে।