মুক্তিপণের জন্য অপহরণের পর একে একে শিশুহত্যা, ফিরিয়ে এনেছে নব্বই দশকের আতঙ্ক
অনলাইন নিউজ ডেক্স
এক সময় বাংলাদেশের অপরাধ জগতের ভয়ংকর অধ্যায় ছিল শিশু অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি। নব্বইয়ের দশক ও তার পরবর্তী সময়ে এই অপরাধ নিয়ে আতঙ্ক ছিল পরিবারগুলোর মধ্যে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান, অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং কঠোর শাস্তির কারণে একপর্যায়ে এই ধরনের অপরাধ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। কিন্তু কয়েক দশক পর আবারও সেই পুরোনো আতঙ্ক নতুন রূপে ফিরে আসছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক শিশু অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি এবং টাকা না পেয়ে হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—এখন আর শুধু সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র নয়, অনেক ঘটনায় উঠে আসছে পরিচিত মানুষ, প্রতিবেশী কিংবা কাছের লোকের নাম। মাত্র কয়েক হাজার টাকা থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকার মুক্তিপণের জন্য কোমলমতি শিশুদের জীবন কেড়ে নেওয়ার মতো নির্মমতা সমাজের বিবেককে নাড়া দিচ্ছে। কোথাও ৩০ হাজার টাকা, কোথাও ১ লাখ, আবার কোথাও ৩ লাখ টাকার জন্য শিশুকে হত্যা করে লাশ গোপন করার ঘটনা সামনে এসেছে।
চট্টগ্রামের পটিয়ায় শিশু জায়হান হত্যাকাণ্ড সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। ৫ বছর বয়সী শিশু জায়হানকে বাড়ির সামনে থেকে অপহরণ করা হয়। পরে তার পরিবারের কাছে ৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে এবং বিষয়টি পুলিশকে জানালে শিশুটিকে হত্যা করার হুমকিও দেওয়া হয়।
কিন্তু পরিবার পুলিশের সহযোগিতা নেওয়ার পর অপহরণকারীরা ধরা পড়ার ভয়ে শিশুটিকে হত্যা করে। পরে বস্তাবন্দী অবস্থায় ময়লার ভাগাড় থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তদন্তে উঠে আসে, ঘটনার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় দুই বছরের শিশু তাকরিম অপহরণের ঘটনাও দেখিয়েছে, কতটা ভয়ংকরভাবে অপরাধীরা শিশুদের টার্গেট করছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিবেশী দম্পতি শিশুটিকে কৌশলে নিয়ে যায়।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাপ ব্যবহার করে পরিবারের কাছে ১ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে শিশুকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তবে এই ঘটনায় দ্রুত অভিযান চালিয়ে পুলিশ শিশুটিকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শিশু আলহাম হত্যার ঘটনায়। পরিবারের অভিযোগ, শিশুটিকে অপহরণ করে ১ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু টাকা না পাওয়ার পর তাকে হত্যা করা হয়। পরে ক্যাম্পের ভেতর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সামান্য অর্থের জন্য একটি শিশুর জীবন কেড়ে নেওয়ার এই ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় কিশোর রাফিজ হত্যার ঘটনাও একই ধরনের ভয়াবহতার উদাহরণ। প্রবাসী পরিবারের সন্তান রাফিজকে অপহরণ করে ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে না পেরে এবং পরিচয় ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় তাকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে পুলিশ অভিযানে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে।
লালমনিরহাটের আদিতমারীতে শিশু সামিউল ইসলাম অপহরণের ঘটনাতেও একই চিত্র দেখা যায়। বাড়ির উঠানে খেলার সময় সাড়ে তিন বছরের শিশুটিকে তুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। পরে পরিবারের কাছে ফোন করে ২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। ছোট শিশুকে ঘিরে এমন অপরাধ আবারও প্রশ্ন তুলেছে—শিশুর নিরাপত্তা কোথায়?
ফেনীতে শিশু নাশিত হত্যাকাণ্ডও নতুন করে আলোচনায় আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, পূর্বপরিচিত ব্যক্তিরা তাকে অপহরণ করে। পরে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা দিতে দেরি হওয়ায় তাকে হত্যা করে মরদেহ গোপনের চেষ্টা করা হয়। এই ঘটনায় আদালত কঠোর শাস্তির আদেশ দিয়েছেন।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শিশু অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির মতো অপরাধ ফিরে আসার পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে সহজে অর্থ উপার্জনের প্রবণতা, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় কমে যাওয়া এবং প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে অপরাধ পরিচালনার সুযোগ।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, অতীতে শিশু অপহরণ ছিল মূলত সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের কাজ। এখন অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, অপরাধীরা আশপাশের মানুষ, পরিচিতজন কিংবা সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি। ফলে পরিবারগুলোও বুঝে উঠতে পারছে না, কার কাছ থেকে শিশুকে নিরাপদ রাখতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অপহরণের ঘটনায় দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। তবে একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের চলাফেরা, অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ এবং পরিবারের বাইরে নিরাপত্তার বিষয়গুলোতে নজর বাড়ানোর কথা বলছেন তারা।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, শুধু গ্রেপ্তার করলেই এই অপরাধ বন্ধ হবে না। প্রয়োজন দ্রুত বিচার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সামাজিক সচেতনতা। কারণ একটি শিশুর জীবন হারানোর পর কোনো বিচারই তার পরিবারের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না।
একসময় যে অপরাধকে বাংলাদেশ প্রায় ভুলতে বসেছিল, সেটিই আবার নতুন আতঙ্ক হয়ে সামনে এসেছে। মুক্তিপণের জন্য লেখা চিরকুট এখন শুধু একটি কাগজ নয়—এটি অনেক পরিবারের জন্য ভয়, অনিশ্চয়তা আর সন্তান হারানোর আশঙ্কার প্রতীক হয়ে উঠছে।
