শ্রমিক আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থানে সরকারঃ পুলিশ ও দলীয়কর্মী ছাড়াও ২৫ প্লাটুন যৌথ বাহিনী মোতায়েন
অনলাইন নিউজ ডেক্স
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন দমনে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে ২৫ প্লাটুন বিজিবি, স্পেশাল রিজার্ভ ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) ও আনসার সদস্য মোতায়েন করেছে সরকার। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জ ব্যবহার করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, পুলিশের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও বহিরাগতদেরও শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মাঠে নামানো হচ্ছে। আন্দোলনের মধ্যে শ্রমিক তৌফিকের মৃত্যু এবং তাঁর মৃত্যুর প্রতিবাদে কর্মসূচিতে পুলিশের বাধা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত অসন্তোষ এখন দেশটির শিল্পাঞ্চলগুলোতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও পরিবহন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে বর্তমান মজুরিতে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
কিন্তু শ্রমিকদের দাবির সমাধানে কার্যকর আলোচনা ও দ্রুত সিদ্ধান্তের পরিবর্তে শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি এবং সংঘর্ষের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
২৫ প্লাটুন বাহিনী মোতায়েন, ১২ প্লাটুন বিজিবি
গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে বুধবার (৪ নভেম্বর) মোট ২৫ প্লাটুন যৌথ বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আট প্লাটুন স্পেশাল রিজার্ভ ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) এবং পাঁচ প্লাটুন আনসার সদস্য রয়েছেন।
গাজীপুর জেলা প্রশাসনের মিডিয়া ও গবেষণা সেলের সহকারী কমিশনার মো. আরিফ হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এসব সদস্য ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে দায়িত্ব পালন করছেন।
এর আগে সোমবার ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছিল। মঙ্গলবার তা বাড়িয়ে ১১ প্লাটুন করা হয়। বুধবার আরও এক প্লাটুন বিজিবি যুক্ত করার পাশাপাশি এসআরবি ও আনসার মোতায়েন করা হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে জননিরাপত্তা, সরকারি সম্পদ ও শিল্পকারখানা রক্ষার কথা বলা হলেও শ্রমিকদের প্রশ্ন, ন্যায্য মজুরির দাবিতে আন্দোলন মোকাবিলায় এত বিপুলসংখ্যক সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন কেন?
পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড
বুধবারও গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ হয়েছে।
গাজীপুরের গাছা এলাকায় শ্রমিকেরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নিলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। সাভারের হেমায়েতপুর ও ফুলবাড়িয়া এলাকায় শ্রমিকেরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করলে সেখানে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কাঠেরপুল এলাকায়ও শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকার মিরপুরে শ্রমিকদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের একপর্যায়ে পুলিশ ঘটনাস্থল ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার সকালেই বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনায় কারখানা বন্ধ, যানবাহন চলাচল ব্যাহত এবং একাধিক স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘাতের ঘটনা ঘটে।
শ্রমিকের ভিডিও ধারণ, হামলা ও তৌফিকের মৃত্যু
শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা গাজীপুরের পোশাকশ্রমিক তৌফিক হোসেনের মৃত্যু।
৩৫ বছর বয়সী তৌফিক লায়লা স্টাইলস লিমিটেডের কর্মী ছিলেন। গত ২ নভেম্বর গাজীপুরের জয়দেবপুরের বাহাদুরপুর এলাকায় নোমান টেরি টাওয়েল মিলসের সামনে শ্রমিক আন্দোলন চলাকালে তিনি মোবাইল ফোনে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ভিডিও ধারণ করছিলেন। এ সময় তাঁর ওপর হামলা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে ৩ নভেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
তৌফিকের মৃত্যুর বিষয়ে পুলিশ ও পরিবারের বক্তব্যে ঘটনার বিবরণে কিছু পার্থক্য রয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, কারখানায় ভাঙচুরের সময় ভিডিও ধারণ করায় বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ তাঁর ওপর হামলা করে। অন্যদিকে তাঁর স্বজনদের দাবি, শ্রমিকদের ওপর হামলার ভিডিও ধারণ করার কারণেই তাঁকে মারধর করা হয়েছিল।
তৌফিকের মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা ও হামলাকারীদের পরিচয় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা জরুরি।
মৃত শ্রমিকের জানাজায়ও পুলিশের বাধা
তৌফিকের মৃত্যুর প্রতিবাদ এবং হত্যার বিচার দাবিতে বুধবার গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তায় গায়েবানা জানাজার আয়োজন করা হয়। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও শ্রমিক শক্তির নেতাকর্মীরা ‘শ্রমিক-ছাত্র-জনতা’ ব্যানারে এ কর্মসূচির আয়োজন করেন।
কিন্তু জানাজা চলাকালে পুলিশ ও আয়োজকদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে উপস্থিত লোকজনকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ঘটনায় এনসিপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ধাক্কাধাক্কি ও সংঘর্ষ হয়। এনসিপির কেন্দ্রীয় সংগঠক আলী নাসের খান অভিযোগ করেন, পুলিশের লাঠিপেটা ও সাউন্ড গ্রেনেডের ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন।
আয়োজকদের দাবি, তৌফিকের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ ও বিচার চাওয়ার জন্য আয়োজিত একটি ধর্মীয় কর্মসূচিতেও বাধা দেওয়া হয়েছে।
শ্রমিকদের বিরুদ্ধে বহিরাগতদের ব্যবহারের অভিযোগ
শ্রমিক আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে পুলিশের পাশাপাশি বহিরাগতদের উপস্থিতি ও হামলার অভিযোগও সামনে এসেছে।
গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় তৌফিকের মৃত্যুর প্রতিবাদে শ্রমিকেরা মিছিল বের করলে তাঁদের সামনে একটি বিরোধী পক্ষের উপস্থিতি ও বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটে। শ্রমিকদের অভিযোগ, বহিরাগতরা তাঁদের মিছিল আটকে দেয়, কয়েকজনকে মারধর করে এবং আটক করে নিয়ে যায়।
ডেইলি স্টার ও ঢাকা স্ট্রিমের প্রতিবেদনে আন্দোলন দমনে পুলিশের পাশাপাশি লাঠিসোঁটা হাতে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের উপস্থিতির অভিযোগও উঠে এসেছে। তবে এসব ব্যক্তির পরিচয় ও তাঁদের সঙ্গে দলীয় নেতৃত্বের সংশ্লিষ্টতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা শ্রমিকদের সাংবিধানিক অধিকার, সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারের জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী বা সমর্থকের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার নেই।
মজুরি বোর্ড গঠন করেও কমছে না অসন্তোষ
শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে গত ১ নভেম্বর সরকার ছয় সদস্যের একটি নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে। ৪ নভেম্বর বোর্ডের বৈঠকে ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে মজুরি কত টাকা বাড়বে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকার ন্যূনতম মজুরি দিয়ে বর্তমান বাজারদরে জীবনযাপন অসম্ভব। তাঁদের দাবি ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হবে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শ্রমিক আন্দোলন ইতোমধ্যে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও মিরপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েক দিনের আন্দোলনে শত শত কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান এবং দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি অবদান রাখা পোশাকশিল্পও এর প্রভাবে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শ্রমিকের দাবি কি নিরাপত্তার সমস্যা, নাকি শ্রম অধিকার?
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই শিল্পের আন্তর্জাতিক সাফল্যের পেছনে শ্রমিকদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, শ্রম ও উৎপাদনশীলতার বড় ভূমিকা রয়েছে। অথচ জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে তাঁদের আন্দোলন এখন সংঘর্ষ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির আলোচনায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।
শ্রমিকদের আন্দোলনে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটলে সেগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ শ্রমিক আন্দোলনে পুলিশি বলপ্রয়োগ, বহিরাগতদের হামলা, শ্রমিকদের হয়রানি এবং প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগগুলোরও তদন্ত হওয়া জরুরি।
বিশেষ করে তৌফিকের মৃত্যুর ঘটনায় কারা হামলা করেছে, কেন তাঁকে আক্রমণ করা হয়েছিল এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল—তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।
শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি সমাধান না করে শিল্পাঞ্চলে একের পর এক বাহিনী মোতায়েন, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড দিয়ে আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা কতটা কার্যকর হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।
কারখানা সচল রাখা যেমন অর্থনীতির স্বার্থে জরুরি, তেমনি সেই কারখানায় কাজ করা শ্রমিকদের জীবন, নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি ও প্রতিবাদের অধিকার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শ্রমিকদের দাবি আলোচনার টেবিলে সমাধান না করে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করলে সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গাজীপুরে মজুরী বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনরত পোশাকশ্রমিকদের মোকাবেলা করতে নামানো হলো বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)
