সোয়া লাখ কোটি টাকার উন্নয়নেও তিমিরে রেল


সোয়া লাখ কোটি টাকার উন্নয়নেও তিমিরে রেল
আওয়ামী সরকারের ১৬ বছরে বাংলাদেশ রেলওয়েতে সোয়া লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর ৮০ শতাংশ খরচ করা হয়েছে অবকাঠামো উন্নয়নে (রেলপথ, স্টেশন ইত্যাদি)। যাত্রী ও পণ্য পরিবহণের মাধ্যমে আয় বাড়াতে রোলিং স্টক (ডেমু ট্রেন, ইঞ্জিন, কোচ, লাগেজ ভ্যান ইত্যাদি) কেনায় খরচ হয়েছে মাত্র ১৫ শতাংশ। কিন্তু সেবা বা আয়-দুটোর একটিও সেই অর্থে (ব্যয় বিচারে) বাড়েনি। বরং ১৬ বছরে প্রতিষ্ঠানটি লোকসান গুনেছে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা। সেটি অব্যাহত ছিল গেল অর্থবছরেও-প্রায় পৌনে ৩ হাজার কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে উন্নয়নে এত ব্যয়-সেখানে পদে পদে ছিল দুর্নীতি আর লুটপাট। এ কারণেই অর্থ ব্যয় হলেও সেবা কার্যত বাড়েনি। যেমন, ঢাকা-কক্সবাজার ও ঢাকা-যশোর (খুলনা পর্যন্ত) রুটে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। এ দুই রুটে ট্রেন চলছে মাত্র ১০টি। অথচ সমীক্ষা অনুযায়ী, এ দুই পথে দেড়শ ট্রেন চলার কথা। আবার, উচ্চমূল্যে কেনা ১৪০ কিলোমিটার গতিতে চলার উপযোগী ইঞ্জিন ও কোচ এবং প্রায় সমান গতিতে চালানোর উপযোগী রেলপথে ট্রেনের গড় গতি মাত্র ৫৬ কিলোমিটার। কোনো কোনো পথে ট্রেন চলে মাত্র ১৫-৩০ কিলোমিটার গতিতে। ফলে যেখানে যাত্রায় সময় লাগার কথা দুই ঘণ্টা, সেখানে লাগছে পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা; যেখানে তিন-সাড়ে তিন ঘণ্টা লাগার কথা সেখানে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লাগছে। এতে শুধু যাত্রীরাই ভোগান্তি পোহাচ্ছেন না, পরিচালন ব্যয়ও তিনশ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হচ্ছে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা, উচ্চ ব্যয়ের ৯৫ শতাংশই করা হয়েছে বৈদেশিক ঋণে। এসব ঋণ পরিশোধে ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে কঠিন চাপ। সূত্র জানায়, রোলিং স্টক কেনা থেকে রেলপথ নির্মাণ-সব প্রকল্পেই লুটপাটের প্রমাণ মেলায় সাবেক ৪ রেলপথমন্ত্রী এবং ডিজিসহ সংশ্লিষ্ট ৩৫ কর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের মামলা হয়েছে। কিন্তু কার্যত ‘কালোবিড়াল’ ও তার সহযোগীরা এখনো অধরা। দুদকের মামলা ও রেলের পরিকল্পনা দপ্তরের তথ্য অনুসারে, এক-একটি ইঞ্জিন ৩৩ থেকে ৩৯ কোটি টাকায় (অথচ আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য ৮-১৩ কোটি টাকা) কেনা হয়েছে। নতুন রেলপথ নির্মাণে ব্যয় বিশ্বের যে কোনো দেশের চেয়ে বেশি। ঢাকা-পায়রা বন্দর প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২৫০ কোটি টাকা, ঢাকা-যশোর ২০৩ কোটি টাকা এবং দোহাজারী-কক্সবাজার প্রকল্পে ১৩৯ কোটি টাকা। অথচ বিশ্বে প্রতি কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ ব্যয় ২৩ থেকে ৩১ কোটি টাকা। সূত্রমতে, যাত্রী ও মালামাল পরিবহণে ডেমু ট্রেন, ইঞ্জিন ও কোচ, লাগেজ ভ্যান কেনা হলেও কয়েক বছর না যেতেই এসব অকেজো হয়ে পড়ে। আবার বর্তমানে ৩৬৪টি ট্রেন চলাচল করছে, যার ১১১টি আন্তঃনগর। এসব ট্রেন থেকে বছরে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা আয় হয়। অথচ প্রতিটি ট্রেন ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কোচ-ঘাটতি নিয়ে চলাচল করছে। আন্তঃনগর ট্রেন ৮ থেকে ১৬টি কোচ এবং লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেন ৪ থেকে ১১টি কোচ নিয়ে যাত্রী বহণ করছে। অথচ একই ইঞ্জিন, চালক, গার্ড ও লোকবল নিয়ে আন্তঃনগর ট্রেন ২৪ থেকে ৩৪টি এবং লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেন ১৬ থেকে ২৮টি কোচ নিয়ে চলার সক্ষমতা রয়েছে। অর্থাৎ পর্যাপ্ত কোচ নিয়ে ট্রেনগুলো পরিচালনা করলে বছরে অন্তত ১২০০ কোটি টাকা বেশি আয় হতো। রেলওয়ে বাণিজ্যিক দপ্তরের নথি অনুযায়ী, বর্তমানে প্রকারভেদে ৭০-৮০ শতাংশ যাত্রী নিয়ে ট্রেন চলাচল করছে। অর্থাৎ প্রতি যাত্রায় বিভিন্ন ট্রেনে ২০-৩০ শতাংশ আসন খালি থাকছে। কিন্তু ট্রেনযাত্রী বা সাধারণ মানুষ মাত্রই জানেন, ট্রেনের টিকিট পাওয়া কী দুষ্কর, কতটা পথ দাঁড়িয়েই চলতে হয়। আসন খালি থাকার তো প্রশ্নই আসে না। বরং কোনো কোনো দিন দাঁড়ানোর জায়গাও মেলে না। বাণিজ্য বিভাগের তথ্য, মাসে প্রায় ১৭ থেকে ১৮টি অভিযান (বিনা টিকিটি চেকিং) পরিচালনা হয়। তাছাড়া প্রতিটি ট্রেনে টিটিই তো আছেনই। এক একটি অভিযানে বিনা টিকিটিদের কাছ থেকে ৬ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। টিটিইদের ভাষ্য, মোট বিনা টিকিটি যাত্রীর মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশকে জরিমানার আওতায় আনা সম্ভব হয়। বাকি ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ বিনা টিকিটি যুগের পর যুগ বিনা ভাড়ায় ট্রেনে চলাচল করছেন। বিনা টিকিটি রোধ করা গেলে সেখান থেকে বছরে আরও প্রায় হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব ছিল। আবার, উচ্চমূল্যে ১২০ থেকে ১৪০ কিলোমিটার গতিসম্পন্ন ইঞ্জিন-কোচ কেনা ও সেই গতিতে চলার উপযোগী রেলপথ নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল ট্রেনের সংখ্যা ও গতি বাড়িয়ে সেবা ও আয় বাড়ানো, সিডিউল বিপর্যয় রোধ ও অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহণ। কিন্তু রেলের ‘চিরাচরিত চেহারা’ বদলায়নি। দোহাজারী-কক্সবাজার, ঢাকা-যশোর নতুন রেলপথেও (এসব রুটে ঘণ্টায় ১২০-১৪০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলার কথা) ঘণ্টায় গড়ে ৫৬ কিলোমিটার গতি নিয়ে ট্রেন চলছে। এতে প্রতিটি রুটেই প্রায় দ্বিগুণ সময় লাগছে। ঢাকা-পঞ্চগড় রেলপথের দূরত্ব প্রায় ৫০২ কিলোমিটার। এ পথে ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চললে সময় লাগত সাড়ে ৪ ঘণ্টা। কিন্তু বর্তমানে লাগছে প্রায় ১২ ঘণ্টা। পদ্মা সেতু হয়ে দুই ঘণ্টায় খুলনা যাওয়ার কথা, লাগছে ৫ ঘণ্টা। অন্য রুটগুলোর চিত্রও একই। ফলে ট্রেনের চালক, গার্ডসহ পরিচালনায় সম্পৃক্ত লোকজন ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করে শুধু ওভার টাইম হিসাবে বেতনের প্রায় সমপরিমাণ অর্থ কামিয়ে নিচ্ছেন। রেলও বাধ্য হচ্ছে ওভার টাইমের মূল্য পরিশোধ করতে-কারণ বর্তমানে ট্রেনে চালক ও গার্ডের পদ শূন্য রয়েছে প্রায় ৪৭ শতাংশ। অন্যদিকে ডিজেলসহ অন্য ব্যয়ও দ্বিগুণ যাচ্ছে। অর্থাৎ অতিরিক্ত সময় ট্রেন চালাতে গিয়ে একদিকে পরিচালন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে ট্রেন কম চালাতে পারায় আয় কম হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব রুটে যথাযথভাবে ট্রেন চালানো গেলে এই অবকাঠামোতেই বর্তমানের দ্বিগুণ যাত্রী পরিবহণ করা যেত। এতে আরও অন্তত হাজার কোটি টাকা আয় হতো। সবমিলিয়ে, পর্যাপ্ত কোচ, বিনা টিকিটি রোধ এবং কাঙ্ক্ষিত গতিতে ট্রেন চালানো-এ তিনটি বিষয় নিশ্চিত করলে আরও অন্তত তিন হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত আয় করা সম্ভব। এর ওপর পণ্য পরিবহণে যথাযথ উদ্যোগ নিলে আয় আরও অনেক বাড়বে। বিশ্বে অধিকাংশ দেশই পণ্য পরিবহণে যাত্রী পরিবহণের চেয়ে বেশি আয় পণ্য পরিবহণে করে থাকে। এসব বিষয়ে নজর দিলে লোকসান তো দূরের কথা, প্রতিবছর কয়েক হাজার কোটি টাকা লাভ করা সম্ভব-বিশ্বের সব দেশই যা করছে। এদিকে গত ১৫ বছর রেলে আয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে লুটপাট যারা করেছে-তাদের বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। আওয়ামী সরকারের ৪ রেলপথমন্ত্রী এবং মহাপরিচালক, অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও বিভিন্ন প্রকল্পের পরিচালকসহ অন্তত ৩৫ কর্মকর্তা দুর্নীতি-লুটপাটের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত-এমন তথ্য মিলেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ও দুদকের অনুসন্ধানে। প্রায় ৬০০ কোটি টাকার ডেমু ট্রেন (২০ সেট) বছর না যেতেই একেক করে অকেজো হতে থাকে। বর্তমানে মাত্র ১ সেট চলছে, তাও প্রায়শ বিভিন্ন ত্রুটির কারণে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ২০১৯ সালে ৩৫৮ কোটি টাকায় কেনা ১২৫টি লাগেজ ভ্যান কেনায় লুটপাটের প্রমাণ পেয়েছে দুদক। এসব ভ্যান তেমন কাজে লাগছে না। ১০টি ইঞ্জিন কেনায় প্রায় ৩২৪ কোটি টাকার অপচয় ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় রেলের সাবেক ডিজিসহ ৪ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদক মামলা করেছে। সাবেক রেলপথমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত দায়িত্ব পাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই ৭০ লাখ টাকা কেলেঙ্কারির ঘটনায় ওই পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পরে ওবায়দুল কাদের, মো. মুজিবুল হক (তিনি দুবার মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন), মো. নূরুল ইসলাম সুজন ও মো. জিল্লুল হাকিম রেলপথমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত (মারা গেছেন) ছাড়া বাকি সবার বিরুদ্ধে দুদকসহ বিভিন্ন থানায় কয়েক হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির মামলা রয়েছে। নূরুল ইসলাম সুজন গ্রেফতার হলেও অন্য দুই মন্ত্রী ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। দুর্নীতি আর অর্থ পাচারের মামলায় রেলের সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) মঞ্জুর-উর-আলম চৌধুরী, মোহাম্মদ হাসান মুনসুরের বিরুদ্ধে দুদকে মামলা রয়েছে। লাগেজ ভ্যান ক্রয় দুর্নীতি মামলায় শামসুজ্জামান, অতিরিক্ত প্রধান মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার আহমেদ মাহবুব চৌধুরী, রেলওয়ে কর্মকর্তা মৃণাল কান্তি বণিক, আব্দুল মতিন চৌধুরী, হারুন-অর-রশিদসহ ৭ জনকে আসামি করা হয়। ডেমু ট্রেন ক্রয় দুর্নীতি মামলায় রেলের কর্মকর্তা ইফতিখার হোসেনসহ আরও ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। রেলে কাঙ্ক্ষিত যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি স্বীকার করে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, বিগত আওয়ামী সরকার রেলে যে পরিমাণ উন্নয়ন করেছে-অধিকাংশই লুটপাটের ছিল। বেশির ভাগ প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন না সাধারণ যাত্রীরা। দুর্নীতি আর লুটপাটের উদ্দেশ্যেই অপরিকল্পিত প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়। এ কারণে করে যাত্রীদের সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। আমরা কোচ কিনছি, আশা করছি এগুলো রেলবহরে যুক্ত হলে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে যাত্রী সেবাও বাড়বে। পরিবহণ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক বলেন, রেলের উন্নয়ন ঘিরে মূলত দুর্নীতি আর লুটপাট করা হয়েছে। যাত্রীসেবা বাড়িয়ে আয় বাড়ানোর কোনো আগ্রহই ছিল না-মন্ত্রী থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। আর ঋণের বোঝা টানতে হচ্ছে দেশের মানুষকে। রেলে বহু প্রকল্প যথাযথ সমীক্ষা ছাড়াই গ্রহণ ও বাস্তবায়ন হয়েছে। দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার কিছুটা ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরতে পেরেছে। কিন্তু রোলিং স্টক কিনতে পারেনি। কারণ, এসব কেনায় আড়াই থেকে ৩ বছর সময় লেগে যায়। রেল গত ১৬ বছরে অনেক টাকা ব্যয় করেছে, অথচ যাত্রীসাধারণ এর সুবিধা পাচ্ছে না, প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতাও বাড়ছে না। রেলে দুর্নীতিবাজদের শাস্তি নিশ্চিত না হলে আগামীতেও উন্নয়নের নামে চলবে দুর্নীতি আর লুটপাট।