ডিসকম্বোবিউলেটর: মাদুরোকে অপহরণে কি গোপন অস্ত্র ব্যবহার হয়েছিল
অনলাইন নিউজ ডেক্স
চলতি মাসের শুরুতে ভেনেজুয়েলায় একটি ‘গোপন অস্ত্রের’ পরীক্ষা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি এমন অভিযোগ তুলেছেন লাতিন আমেরিকার দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ। তিনি বলেছেন, নিকোলাস মাদুরো ও সিলিয়া ফ্লোরেসকে অপহরণের সময় যুক্তরাষ্ট্র ওই অস্ত্র ব্যবহার করে।
পাদ্রিনোর এই অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভেনেজুয়েলার গণমাধ্যম এল ইউনিভার্সাল। যেখানে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বরাত দিয়ে লেখা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ওই অস্ত্রটি ছিল উন্নত সামরিক প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর। যা আগে কখনো ব্যবহার হয়নি।
নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক সাক্ষাৎকারেও অভিযানের সময় একটি বিশেষ অস্ত্র ব্যবহারের ইঙ্গিত আছে। ট্রাম্প ওই অস্ত্রের নাম বলেছেন, ‘ডিসকম্বোবিউলেটর’। যেটি ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষা সরঞ্জামকে অকেজো করে দিয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। বিস্তারিত তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘এ নিয়ে আমার বেশি কিছু বলার অনুমতি নেই।’
মাদুরোকে অপহরণের গোপন সামরিক অভিযান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনও জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। তবে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত কিংবা তাদের অবকাঠামো ও সরঞ্জাম বিকল করে দিতে যুক্তরাষ্ট্র এর আগেও বিভিন্ন সময় বিশেষ অস্ত্র ব্যবহার করেছে।
গোপন অস্ত্র সম্পর্কে যা সামনে এসেছে
মাদুরো অপহৃত হওয়ার কয়েকদিন পর হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট ভেনেজুয়েলার একজন নিরাপত্তারক্ষীর এক্স (সাবেক টুইটার) পোস্ট শেয়ার করেন। সেই রক্ষী লিখেছিলেন, অভিযানের সময় যুক্তরাষ্ট্র এমন একটা কিছু ছুঁড়েছিল যা ছিল তীব্র শব্দ তরঙ্গের মতো।
ওই নিরাপত্তারক্ষী আরও লিখেন, ‘হঠাৎ আমার মাথায় যন্ত্রণা অনুভব করলাম। আমাদের সবার নাক দিয়ে রক্ত ঝরতে শুরু করল। কেউ কেউ রক্ত বমিও করছিল। আমরা নড়াচড়া করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ি।’
আলজাজিরা নিরাপত্তারক্ষীর এই বর্ণনার সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। তবে গত সপ্তাহে নিউজ নেশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, মাদুরোর কিউবান দেহরক্ষীদের বিরুদ্ধে ‘সনিক ওয়েপন’ বা শব্দ অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। এটি আর কারও কাছে নেই। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এমন সব অস্ত্র আছে যেগুলোর সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না। মাদুরোর বাড়িটি ছিল সামরিক ঘাঁটির মধ্যে। সেখানে অভাবনীয় অভিযান চালানো হয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে ওয়াশিংটনের কাছে কিছু অবিশ্বাস্য রকমের অস্ত্র আছে।
যুক্তরাষ্ট্র কি আগে ‘সনিক’ অস্ত্র ব্যবহার করেছে
ব্রাসেলসভিত্তিক সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এলিজা ম্যাগনিয়ার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত সবচেয়ে পরিচিত ‘সনিক’ বা শব্দ ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে আছে ‘লং রেঞ্জ অ্যাকোস্টিক ডিভাইস (এলআরএডি)’। এগুলো প্রচলিত কোনো অস্ত্র নয়। এগুলো জাহাজ থামানো, ঘাঁটি সুরক্ষিত রাখা, কনভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, চেকপয়েন্ট নিয়ন্ত্রণ এবং মাঝেমধ্যে জনসমাগম ছত্রভঙ্গ করার কাজে ব্যবহৃত হয়।
ম্যাগনিয়ার বলেন, এই যন্ত্রগুলোর মূল লক্ষ্য হলো উচ্চ শব্দের ভয়েস কমান্ড পাঠিয়ে মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা। এগুলো অস্বস্তি তৈরি, মানুষকে নির্দেশ মানতে অথবা সংশ্লিষ্ট এলাকা ছাড়তে বাধ্য করতে পারে। জাহাজ থেকে জলদস্যু তাড়াতে, বন্দরের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য এআরএডি ব্যবহার হয়। এর প্রভাবে শরীরে ব্যথা, মাথা ঘোরানো, বমির ভাব বা শ্রবণশক্তির ক্ষতি হতে পারে। তবে এটি ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম বা যোগাযোগের নেটওয়ার্ক অকেজো করতে পারে না।
মানুষকে বিভ্রান্ত করতে ব্যবহৃত আরেকটি অস্ত্র হলো ‘অ্যাক্টিভ ডিনায়াল সিস্টেম (এডিএস)’। এটিকে প্রায়ই ভুলবশত ‘সনিক’ অস্ত্র বলা হয়। তবে এটি শব্দের সাহায্যে কাজ করে না। ম্যাগনিয়ার বলেন, এটি মিলিমিটার-ওয়েভ এনার্জি বা অতি-ক্ষুদ্র তরঙ্গ শক্তি ব্যবহার করে ত্বকে তাপের অনুভূতি দেয়। যা মানুষকে কোনো স্থান থেকে সরে যেতে বাধ্য করে। ২০১০ সালে আফগানিস্তানে অস্ত্রটি পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু ব্যবহার করা হয়নি।
ম্যাগনিয়ার আরও বলেন, দুটি অস্ত্র মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে, যন্ত্রপাতির ওপর নয়। এগুলো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক বা সামরিক সরঞ্জাম অকেজো করতে পারে না। সরঞ্জাম অকেজো করতে হলে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক, সাইবার হামলা বা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয়।
সরঞ্জাম অকেজো করতে যুক্তরাষ্ট্র কী ব্যবহার করে
ম্যাগনিয়ার জানান, মার্কিন সামরিক বাহিনী বেশ কয়েক ধরনের ‘নন-কাইনেটিক’ (শরীরে আঘাত করে না) এবং ‘প্রি-কাইনেটিক’ সরঞ্জাম ব্যবহারের জন্য পরিচিত। এর মধ্যে আছে:
ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার (ইডব্লিউ): এটি রাডার সিস্টেম জ্যাম ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারে। জিপিএস ও সেন্সরকে বিভ্রান্ত করে। ইডব্লিউ ব্যবহার করলে প্রতিপক্ষের পক্ষে পরিস্থিতি বোঝা কিংবা হামলার আগে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সাইবার-ফিজিক্যাল অপারেশন: ম্যাগনিয়ার জানান, এই সরঞ্জাম ব্যবহারের পরিচিত উদাহরণ হলো ইরান। ২০০৯ সালে ইরানের পারমাণবিক সেন্ট্রিফিউজ কন্ট্রোলারগুলো লক্ষ্য করে ‘স্টাক্সনেট’ নামের অভিযান চালানো হয়েছিল। এর লক্ষ্য হলো- সফটওয়্যার পরিবর্তনের মাধ্যমে সেগুলোর ভৌত ক্ষতিসাধন করা।
কাউন্টার-ইলেকট্রনিক্স ডিরেক্টেড-এনার্জি ওয়েপন: এগুলো মূলত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মাইক্রোওয়েভ সিস্টেম। এটি সার্কিটগুলোতে মাইক্রোওয়েভ পালস পাঠিয়ে ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম অকেজো করা জন্য তৈরি হয়েছে। ম্যাগনিয়ারের মতে, এই সরঞ্জাম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রকল্পটি ‘কাউন্টার-ইলেকট্রনিক্স হাই পাওয়ার মাইক্রোওয়েভ অ্যাডভান্সড মিসাইল প্রজেক্ট’ বা চ্যাম্প নামে পরিচিত। এটি কোনো শারীরিক শক্তি প্রয়োগ ছাড়াই ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম বিকল করার জন্য তৈরি হয়েছে।
গ্রাফাইট বা কার্বন-ফাইবার অস্ত্র: এগুলো বিদ্যুৎ গ্রিডে শর্ট সার্কিট ঘটিয়ে সব সরঞ্জাম ধ্বংস না করেই ব্যাপক আকারে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটাতে পারে।
ম্যাগনিয়ার জানান, তথ্য সংক্রান্ত সুবিধা পাওয়া এবং যুদ্ধের বিভিন্ন ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এই সরঞ্জামগুলো মার্কিন সামরিক কৌশলের একটি প্রধান অংশ।
যুক্তরাষ্ট্র কি অন্য দেশে নতুন অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে
ম্যাগনিয়ার জানান, যুক্তরাষ্ট্র এ কাজ করেছে। তবে এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রই করে না। নতুন কোনো প্রযুক্তি ব্যবহারের উপযোগী হলে সেটি প্রায়ই আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে বাস্তবে পরীক্ষা করা হয়। যেমন, ১৯৯১ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধে প্রথমবারের মতো স্টেলথ এয়ারক্রাফট, প্রিসিশন-গাইডেড বোমা এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ব্যবহার হয়েছিল। কৌশলগত পর্যায়ে ২০০৯ সালে ইরানের ওপর চালানো সাইবার হামলাটি ছিল ‘সাইবার-ফিজিক্যাল’ অস্ত্রের প্রথম ব্যবহারের উদাহরণ।
২০১৭ সালে আফগানিস্তানে প্রথমবারের মতো জিবিইউ-৪৩/বি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র। যেটিকে বলা হয় ‘মাদার অব অল বোমস (এমওএবি)’। এটি একটি অ-পারমাণবিক বিস্ফোরক। যা সুড়ঙ্গের মতো সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনে বড় বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম।
ম্যাগনিয়ার বলেন, বাস্তব পরিস্থিতিতে পরীক্ষা বলতে সাধারণত শুধু গোপন অস্ত্রের ট্রায়ালকে বোঝায় না। বরং সেখান থেকে পাওয়া তথ্য ও প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে অস্ত্রগুলোকে আরও উন্নত করাকে বোঝায়। সব শক্তিধর দেশই গোপনে নতুন যন্ত্রের পরীক্ষা চালায়। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, সাইবার অভিযান, স্পেস টার্গেটিং, সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স কিংবা বিশেষ অভিযানের ক্ষেত্রে।
ম্যাগনিয়ার জানান, যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জাম পরীক্ষার জন্য ইসরায়েলকে কাজে লাগায়। সেগুলোর প্রয়োগ করা হয় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে কিংবা লেবানন ও ইরানে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, তাদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময় ‘সনিক ওয়েপন’ ব্যবহার করা হয়েছে। ২০১৭ সালে কিউবার রাজধানী হাভানায় বেশ কয়েকজন মার্কিন কূটনীতিক হঠাৎ অসুস্থ হন। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, সেটি ছিল ‘সনিক অ্যাটাক’। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন বলেছিলেন, কিউবার রাজধানীতে মার্কিন মিশন ‘স্বাস্থ্য হামলার’ শিকার হয়। যা কিছু কর্মীর শ্রবণশক্তি নষ্ট করে দেয়।
কানাডার সরকারও তখন তাদের এক কূটনীতিকের শ্রবণশক্তি হারানোর কথা বলেছিল।
