কিভাবে সরকার দায়িত্বশীল অবস্থান তৈরী করতে পারতো?
গণভোট শক্তিশালী গণতান্ত্রিক উপকরণ বটে। তবে তা গভীরভাবে মেরুকৃত ও বলপূর্বক রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে কখন, কি ধরণের কর্তৃত্ব, কোন প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির কারণে, কি করছে সে সব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো ছাড়া গণভোট বিদ্যমান সংকট সমাধানের বদলে নতুন সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার মূল সমস্যা গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার সংকট (নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, পুলিশ), কর্তৃত্বের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকাবস্থায় ভয়, ভ্রান্ত তথ্য ও ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন জনপরিসরের ওপর চেপে বসেছে ইসলামিক রাষ্ট্র কায়েমে যুদ্ধরত এক গোষ্ঠী। বাংলাদেশ রাষ্ট্র সর্বমানবতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের কাছে এ অবস্থান কখনোই স্বীকৃত ও আদৃত ছিল না। বরং ১৯৭১ এ যাদের পরাজিত করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উত্থান সেই শত্রু দেশের সাথে ধর্মের কারণে তারা দেশের ক্ষতি করে হলেও সম্পর্ক রিকনসিলিয়েশন চায়, এবং তাতে বৃহত্তর জনগণের মতামতের ধার ধারে না।
এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গণভোট গণতন্ত্র পুনর্গঠনের কোনো বিকল্প নয়, বরং এমন এক ঝুঁকি যা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকেই ঝুঁকিতে ফেলে দেবার সম্ভাবনা রয়েছে।
এগার.
মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে দেমের সব উন্নয়ন ধ্বংস করে দেয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এক প্যারাডক্সে বাস করছে। সংজ্ঞা অনুযায়ী একটি অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনির্বাচিত, অস্থায়ী এবং সে কারণেই এ সরকারের কর্মকাণ্ড হওয়ার কথা প্রক্রিয়াভিত্তিক, রূপান্তরমুখী নয়।
এ সরকারের বৈধতা আসতে পারতো তিন পথে: এক. রাজনৈতিক রূপান্তর পরিচালনার এমন এক বাতাবরণ তৈরীর পথে গিয়ে যেখানে সকলেই এগিয়ে আসতে পারছে। দুই. গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষা এবং সেগুলো কর্মক্ষম ও স্থিতিশীল রাখার মাধ্যমে। তিন. নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া এবং নিরপেক্ষভাবে সব দলকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়ার মাধ্যমে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হয়েও মুহাম্মদ ইউনুস তার নেতৃত্বকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রের মৌলিক রাজনৈতিক প্রশ্নে গণভোট আয়োজন করছে। এ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমেকরে তিনি তার ম্যান্ডেট অতিক্রম করেছেন। তিনি ভেবেছেন দেশের জনগণের মুখ বন্ধ আছে তারা কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। অতীতে একাধিকবার জনগণকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে বলেওছেন, জনগণের ভোট নাকি (মতামত) দশটাকায় কেনা যায়।
প্রশ্ন উঠতে পারে সাংঘর্ষিক অবস্থাটা কিভাবে সৃষ্টি হচ্ছে?
বিষয়টি বোঝা কঠিন নয়। মূল কথা হলো, একটি অনির্বাচিত সরকার জনগণের কাছ থেকে রাষ্ট্রের কাঠামোগত রাজনৈতিক পরিবর্তনের অনুমোদন চাইছেন যাতে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও সে প্রক্রিয়ার এতকাল ধরে গড়ো তোলা বৈধতা শক্তিশালী না হয়ে আরও দূর্বল হয়। এবং সে অনুমোদন তিনি চাইছেন কিভাবে? চারটি প্রশ্নের মাধ্যমে যে প্রশ্ন জনসাধারণের জন্য সহজ নয়, এবং তা আলোচনার সুযোগ নেই, তা নিয়ে ভাববার ও মতামতরে সুযোগ নেই, জনগণকে শুধু ‘হাঁ‘ বলতে বলছেন তিনি। ও তার সরকার। জনগণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে তার সরকারের গত আঠারো মাসের ধ্বংস, হত্যা, বিপন্নতা, জনগণকে অরক্ষণীয় করে ফেলার যাবতীয় অপকর্ম এবং আগত বিপজ্জনক কালে তিনি আরও যা যা করতে পারেন, সে সবকে হাঁ বলবে। একজন নোবেল পুরষ্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি এই দাবীটা করছেন। দেশ কিছু নয়, দেশের মানুষ কিচু নয়, মানুষের প্রাণ কিছু নয়, মানুষ শুধু তাকে দেখবে, তাকে ভোট দেবে। বাংলাদেশ এই অচিন্ত্যনীয় ফ্যাসিস্টকালে এখন বাস করছে।
ইউনুস-নেতৃত্বাধীন গণভোটের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বাস্তবতাাট সংক্ষেপে কি?
আন্তর্জাতিকভাবে ইউনুসের একধরণের উপযোগিতা এবং এনজিওভিত্তিক নাগরিক সমাজের একাংশের মধ্যে তার কর্তৃত্ব থাকলেও তা রাজনৈতিক সমর্থন নয়। যতোই জামায়াত ও এনসিপি ধরণের দল তাকে সমর্থন দিক না কেন তার রাজনীতির কোনো দলীয় কাঠামো নেই
তাকে উপলব্ধি করতে হবে তার পদের তিনটি কাঠামোগত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে:
ঝুঁকি ১: ক্ষমতাকাঠামোতে তার প্রবেশ বলপূর্বক, তার নেতৃত্বের আসনে আসীন হওয়ার পেছনে রয়েছে অমীমাংশিত জুলাই হত্যাগুলো। যার তদন্ত করতে তাকে আগ্রহী মনে হয় না। কিন্তু জনগণ সে সব মুত্যুর তদন্ত করবে। জুলাইয়ের সহিংসতার পথে এসে এখন তিনি গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট পেতে নিজের নোবেল পরিচয়ের কর্তৃত্ব আরোপ করছেন দেশের জনগণের ওপর এবং ক্ষমতার মুরুব্বীর পদ দখল করতে চাইছেন। দেশের সাধারণ জনগণ এটা জানে। তারা অজ্ঞ নয়।
এ গণভোট রাষ্ট্রের কোনো মূলনীতির ওপর নয় বরং মুহাম্মদ ইউনুস তার নিজের ওপর গণভোট সংঘটন করছেন। নীতিগত স্পষ্ট অবস্থানের বদলে তিনি নিজের নোবেলের ওপর আস্থাভিত্তিক ভোট চাইছেন। গত আঠারো মাসে কি এটা স্পষ্ট হয়নি যে জনগণ তার ওপর আস্থা রাখার কোনো কারণ নেই?
তার এই গণভোটের পদক্ষেপ অত্যন্ত বিপজ্জনক। কেননা নৈতিক বৈধতা আর সাংবিধানিক বৈধতা এক জিনিস নয়। তিনি সংবিধানের ঊর্ধ্বে নন। যদি জনগণ তাকে গণভোটে ‘হাঁ‘ ভোট দেয় দেয়, তাহলে তারা একটি বিপজ্জনক ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করবে। ধারণাটি কি? ভবিষ্যতে জনগণের কাছে না গিয়ে, তাদের মতামত না চেয়ে, শর্টকাটে যে কোনও এলিট, অর্থবান, খ্যতিমান এসেই রাষ্ট্র পরিচালনার পদে বসে যাবে এবং যা খুশী তাই করবে। এই নজির মুহাম্মদ ইউনুস তৈরি করার চেষ্টা করছেন। এই কারণে তিনি নিজে গণভোটের পক্ষে ‘হাঁ ভোট দিকে জনগণকে আহ্বান করছেন। খুব অদ্ভূতভাবে এই আহ্বান তিনি সেই জনগণের কাছে রাখছেন যারা কেমন আছে, তাদের কি সমস্যা হচ্ছে সে সব বিষয়ে তিনি কখনো জানার চেষ্টা করেন নি। জনগণের রিপাবলিককে দেয় ট্যাক্স ও তিনি দিতে অস্বীকার করছেন।
ঝুঁকি ২: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও মুহাম্মদ ইউনুস সংঘাত ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার হিসেবে গণভোটকে ব্যবহার করছেন। তিনি কয়েকটি লক্ষ্য হাসিল করতে চান:
১. রাজনৈতিক দলগুলোকে পাশ কাটাতে চান;
২.বিরোধী শক্তিকে নিষ্ক্রিয় করতে চান;
৩. ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে “জনগণের ইচ্ছা” হিসেবে উপস্থাপন করতে চান;
৪. তিনি গণভোটকে জনপ্রতিনিধিত্বের সাথে এলিট ব্যক্তির দ্বন্দ্বের হাতিয়ারে পরিণত করতে চান।
দেখা যাচ্ছে সংকট সমাধানের চেয়ে সংকটকে আরো জটিল করে তুলতে তিনি আগ্রহী। এবং সঙ্কটকে জিইয়ে রেখে ঘোলাজলে মাছ শিকারের সুযোগসন্ধানীদের ছেড়ে দিয়ে ব্যক্তিগত আখেরও গুছিয়ে নিচ্ছেন বেশ। তার ধারণা তিনি সব আনের বাইরে চলে যেতে পারবেন। পারবেন কি?
ঝুঁকি ৩: ফ্যাসিস্ট চিন্তাধারার ব্যক্তির ও গোষ্ঠীর হাতে গণভোট এক ধরণের অস্ত্র। এ অস্ত্র দিয়ে মুহাম্মদ ইউনুস ও তার সরকার গত আঠারো মাস কি করেছেন তা নানা মাধ্যমে প্রকাশিত। তিনি জনগণের রক্তের দামে অর্জিত স্বাধীনতা ও মানবিক মূল্যবোধের বয়ানকে উল্টে দিতে পুরণো ধর্মীয় রাষ্ট্রের বয়ান তৈরীর কারখানা খুলেছেন, সে বয়ান নিয়ন্ত্রণ করছেন, এবং নিয়ন্ত্রণ করছেন গণমাধ্যম ও প্রশাসন। নিয়ন্ত্রণ চলছে একদিকে ভয় দেখিয়ে অপরদিকে লোভ দেখিয়ে।
বাংলাদেশে বর্তমানে গণমাধ্যম ব্যবস্থা চূড়ান্ত অসম। গ্রামীণ এলাকা ক্ষমতা কাঠামোতে জামায়াত-ই ইসলাম ও ইসলামিক দলগুলোর বর্বর নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা চলছে। একদিকে ধর্মের ভয়, হত্যাকাণ্ড ও আগুন দিয়ে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়ার ভয়, অপরদিকে তাদের সমর্থন দিলে ইহকাল ও পরকালে আরামে থাকায় পৃষ্ঠপোষকতা করার মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গণভাবে জনযুদ্ধের ও জনঅংশগ্রহণে দেশ গঠনের গোটা বয়ানকে বদলে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এইসব দিনেদুপুরে সবার সামনেই ঘটছে। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক চাপ প্রয়োগে, বয়ান দখলের মাধ্যমে, জনগণের ইচ্ছাকে অস্বীকার করে গণভোট আয়োজনের পরও কথা আছে। জনগণকে হুমকী দেয়া হচ্ছে ভোটের ফলাফল দেখে সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট দিয়েছে কি না তা পরীক্ষা করা হবে। এবং এ হুমকী কে দিচ্ছে? জামায়াত ই ইসলাম। যেহেতু জামায়াত-শিবির মুহাম্মাদ ইউনুস ও তার সরকারের নিয়োজক ও সমর্থক, ধরে নেয়া যায় এই পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ায় তার অনুমোদন রয়েছে।
তের.
সাংবিধানিক ও আইনি সমস্যার কয়েকটি দিক দেখা যাক।
বাংলাদেশের সংবিধান অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের কথা বলে না বরং প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের ওপর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করে। নির্বাচিত সংসদ ছাড়া গণভোটের মাধ্যমে যদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যদি রাজনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক রূপ বদল ঘটে এবং ক্ষমতার পুনর্বণ্টন ঘটে, তবে তা ট্রানজিশনাল জাস্টিসের পথে সাংবিধানিক অস্পষ্টতা সৃষ্টি করবে অথবা সংবিধানকে মূল্যহীন করে দেবে।
রাষ্ট্রকে এ প্রক্রিয়া বড়োধরণের সঙ্কটে ফেলে দেবে। ইতিমিধ্যেই তা আইনি চ্যালেঞ্জ ডেকে আনছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ও দেশের অভ্যন্তরে গণবিভ্রান্তি তৈরী করছে, সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর চাপ বৃদ্ধি অব্যাহত রাখছে, এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে তার পক্ষে থাকতে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে ফেলেছে।
২০২৪ সালের জুলাইতে কোটার ছলছুতায় সহিংস পরিস্থিতি তৈরী করে ৫ অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটিয়ে যে সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন থেকে দেশে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অচলাবস্থা বিরাজমান। আন্তর্জাতিক মহলে ভুল বোঝা এবং দৃশ্যমান আস্থার সংকটের পাশাপাশি বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন চললে। একই সাথে নিজের পায়ে কুড়াল মেরে হলেও প্রবল ভারতবিরোধীতা তৈরী করা হয়েছে ও তা জিইয়ে রাখা হচ্ছে পাকিস্তানের সাথে গড়ে তোল নয়া বন্ধুত্বের স্বার্থে। যার সর্বশেষ ফলাফল দেখা গেলো ক্রিকেটদলকে কেরা থেকে সরিয়ে পথে বসিয়ে দেয়ার আয়োজনে।
চৌদ্দ.
মুহাম্মদ ইউনুসের সরকারের দীর্ঘমেয়াদকালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈধতার সীমা লঙ্ঘিত হয়েছে। নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি হয়েছে যেখানে আমরা পরবর্তি সরকারের একটি কাঠামো সহজেই অনুমান করতে পারি। অনির্বাচিত সরকার গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে উদ্যোগী হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় এ সরকার গণতন্ত্র নয়, বরং স্থায়ী অস্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্যোগী।
এই পরিস্থিতিতে আগামী বারো ফেব্রুয়ারীর গণভোট দেশের জন্য জনগণের জন্য একটি বিপুল সংকট, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিকল্পিতভাবে সৃষ্টি করেছে।
স্বদেশ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের কর্তব্য এই ফ্যাসিস্ট সরকারের পরিকল্পনাকে নস্যাত করা। গণভোটকে ‘না‘ বলা।
(পরবর্তী পর্ব- গণভোটঃ দক্ষিণ এশিয়ার উপর প্রভাব)
লেখক পরিচিতঃ
জাহানারা নুরী
সাংবাদিক, লেখক
সুইডেন