দেশে এভিয়েশন খাতে রয়েছে বড় সম্ভাবনা। তবে নীতি সহায়তার অভাব থেকে শুরু করে জ্বালানি মূল্য—নানা ক্ষেত্রে রয়েছে প্রতিবন্ধকতাও। বেসরকারি পর্যায়ে চেষ্টা থাকলেও প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবে দেশের এয়ারলাইন্সগুলো আন্তর্জাতিক আকাশপথের কাঙ্খিত উচ্চতায় পৌঁছতে পারছে না। দেশীয় এয়ারলাইন্সের কাছে রয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ মার্কেট শেয়ার। পক্ষান্তরে ৮০ শতাংশ বিদেশি এয়ারলাইন্সের দখলে। দেশের এভিয়েশন খাত নিয়ে বিশেষ আয়োজনে প্রতিবেদন তৈরি ও সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি আতাউর রহমান
যাত্রীসংখ্যা এবং ব্যবসার পরিধি বিবেচনায় দেশের এভিয়েশন খাত বর্তমানে এক বিশাল সম্ভাবনার মুখে দাঁড়িয়ে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—উভয় পথেই আকাশপথের ভ্রমণকারীদের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এ ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে পুঁজি করে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর যেখানে দেশীয় ও বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার কথা, সেখানে তারা উল্টো অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছে। বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেন দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যাশিত উচ্চতায় পৌঁছাতে পারছে না, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। এ খাতের বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত কার্যকর ও বাস্তবমুখী নীতি সহায়তার অভাবেই সম্ভাবনার বিশাল আকাশে ডানা মেলতে পারছে না দেশের এভিয়েশন শিল্প।
ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন বা আয়াটার তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন গড়ে সাড়ে ১২ মিলিয়ন যাত্রী যাতায়াত করে, যা আগামী ১০ বছরে বেড়ে দাঁড়াবে মিলিয়নে। তবে এভিয়েশন খাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া না হলে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোকে পেছনে ফেলে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোই এর সুফল ঘরে তুলবে বলে মনে করছেন এভিয়েশন ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে এভিয়েশন খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ থাকলেও টেকসই নীতিমালার অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারেনি। বর্তমানে আন্তর্জাতিক রুটে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করছে। বেসরকারি খাতের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একসময়ে বেশ কয়েকটি বেসরকারি এয়ারলাইন্স আন্তর্জাতিক রুটে দাপটের সঙ্গে যাত্রা শুরু করলেও, বর্তমানে একমাত্র ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স শক্ত অবস্থানে টিকে আছে। তবে আশার কথা হলো, দেশের আরও দুই বেসরকারি এয়ারলাইন্স নভোএয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রা আন্তর্জাতিক রুটে ডানা মেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু এ উদ্যোগ সফল করতে হলে সরকারকে শক্তিশালী নীতিগত সমর্থন দিতে হবে। অন্যথায় আন্তর্জাতিক রুটের যাত্রী ও বাজার পুরোপুরি বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সম্ভাবনা অনুপাতে দেশের এভিয়েশন খাত বিকশিত না হওয়ার পেছনে প্রধানত নীতিগত সহায়তার অভাবকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে নীতিগত সহায়তার অভাব। সরকারের পক্ষ থেকে এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিকে যে ধরনের নীতি সহায়তা দেওয়া দরকার ছিল, তা পায়নি এবং সরকারের পক্ষ থেকে সেরকম পদক্ষেপও নেওয়া হয়নি।’ তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, ‘স্বাধীনতার পরও সমশেরনগর, কুমিল্লা, লালমনিরহাট, ঈশ্বরদী বিমানবন্দর সচল ছিল। এসব বিমানবন্দরে শিডিউল ফ্লাইট অপারেশন করা হলেও এখন বন্ধ হয়ে গেছে। চাহিদা থাকলেও সরকার এগুলো চালু করতে পারেনি বা স্বাধীনতার পর নতুন বিমানবন্দরও তৈরি করতে পারেনি।’
ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, এ খাতে বিনিয়োগের পথে অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে বহুমুখী আর্থিক ও অবকাঠামোগত সমস্যা। যদিও সম্প্রতি সারচার্জ ৭২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৪ শতাংশ করার ঘোষণা এসেছে, তবুও পার্কিং চার্জ, উচ্চ জ্বালানি মূল্য এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দক্ষ জনবল এবং আধুনিক প্রশিক্ষণের অভাব। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। যেমন, ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিকমানে উন্নীত করা হলেও, বাস্তবে এ বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক করার উপযোগিতা কতটা ছিল, সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। একইভাবে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক তকমা পেলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না।
এ সংকট উত্তরণে কাজী ওয়াহিদুল আলম পরামর্শ দেন, ‘দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোকে সরকারিভাবে প্রণোদনা দিতে হবে, নানা সুযোগ দিতে হবে। ট্যাক্স, ফুয়েল, ভ্যাট, এক্সাইজ, ইনকাম ট্যাক্স—এসব ক্ষেত্রে ছাড় দিতে হবে। বিদেশি এয়ারলাইনসগুলো যেসব সুবিধা পাচ্ছে, তা যেন দেশীয়গুলোও পায় তা নিশ্চিত করতে হবে।’ তার মতে, সরকার যদি ট্যাক্স ছাড়, ফান্ডে সহজ প্রবেশাধিকার এবং প্রফেশনাল প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করে, তাহলে দেশীয় এয়ারলাইনসগুলো শক্ত অবস্থান নিতে পারবে। তাতে বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর একচেটিয়া প্রভাব কমবে, প্রতিযোগিতা বাড়বে, টিকিটের দাম কমবে এবং দেশের রাজস্বও বাড়বে।
বেসরকারি এয়ারলাইন্স নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। যাত্রীর সংখ্যা এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণের চাহিদা বৃদ্ধি পেলেও অন্যদিকে কাঠামোগত ও নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে সেই সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবমুখী নীতি সহায়তা পেলে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক এভিয়েশন মার্কেটে পরিণত হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘দেশের এভিয়েশন খাতের সমস্যাগুলো বহুমাত্রিক। সরকারের নীতি সহায়তা, আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় জ্বালানি তেলের অতিরিক্ত দাম, ভ্যাট, ট্যাক্স, এয়ারপোর্ট চার্জ ও পার্কিং ফি অত্যন্ত উচ্চ, বিমানবন্দরের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, দক্ষ জনবল ঘাটতি এবং নীতিনির্ধারণে দীর্ঘসূত্রতা এভিয়েশন শিল্পের বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
এ বিশেষজ্ঞের মতে, দেশের এভিয়েশন বাজারে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোকে টিকে থাকতে হলে এভিয়েশন খাতে সরকারের নীতি সহায়তা খুবই জরুরি। তিনি বলেন, কর ও ভ্যাট কাঠামো যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে হবে। জ্বালানি মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হবে। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য সহজ অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করাও প্রয়োজন।
একই সুর শোনা যায় এয়ার অ্যাস্ট্রার সিইও ইমরান আসিফের কণ্ঠে। তিনি বলেন, ‘গত ৫৪ বছরে আমাদের এয়ারলাইন ইন্ডাস্ট্রির গ্রোথটা প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু সেই অনুপাতে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে এ ইন্ডাস্ট্রি গ্রো করতে পারেনি। এ কারণে এই মার্কেটের একটা বড় অংশ এখনো আমাদের শেয়ারের মধ্যে নেই।’
প্রত্যাশা অনুযায়ী এভিয়েশন মার্কেটে শেয়ার দখল করতে না পারার পেছনে নানা সমস্যার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে পারার বিষয়টা হলো বড়। এয়ারলাইনস বিজনেসটা একটা ক্যাপিটাল ইনটেনসিভ বিজনেস। সেখানে ক্যাপিটালের জোগান থাকতে হবে। বাংলাদেশে এয়ারলাইন ফর্ম করতে গেলে যে ক্যাপিটালের প্রয়োজন হয়, সেই ক্যাপিটালের অ্যাকসেসটা খুব লিমিটেড।’
অ্যাভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের প্রায় এক কোটির বেশি জনসংখ্যা প্রবাসী হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করছে। এ ছাড়া বিশাল জনগোষ্ঠী সারা বছর কাজের প্রয়োজনে, চিকিৎসার প্রয়োজনে, শিক্ষার প্রয়োজনে, ব্যবসার প্রয়োজনে কিংবা পর্যটক হয়ে বিদেশ ভ্রমণ করছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রুটের মার্কেট শেয়ারের প্রায় ৮০ শতাংশ বিদেশি এয়ারলাইন্সের কাছে রয়েছে। দেশীয় এয়ারলাইন্সের কাছে মাত্র ২০ শতাংশ মার্কেট শেয়ার। দেশের এভিয়েশন খাত আরও বড় করতে মার্কেট শেয়ার বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠছে।
