অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার
অনলাইন নিউজ ডেক্স
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তার ১৮ মাস পূর্ণ হয়েছে। দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন, পদ্ধতিগত দুর্নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসলীলার পর প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল এক ভয়াবহ অস্থির সময়ে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ‘রিফর্মস বুক’ বা সংস্কার তালিকায় সরকারের গত দেড় বছরের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা এক কথায় রাষ্ট্রকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার একটি সাহসী ও কাঠামোগত প্রচেষ্টার দালিলিক প্রমাণ। রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, এই স্বল্প সময়ে ১৩০টি নতুন ও সংশোধিত আইন প্রণয়ন এবং ৬ শতাধিক নির্বাহী আদেশ জারি করা হয়েছে, যার ৮৪ শতাংশই ইতোমধ্যে কার্যকর। এটি কেবল সংখ্যার বিচার নয়, বরং রাষ্ট্রপরিচালনার মৌলিক স্তম্ভগুলো-প্রশাসন, বিচার বিভাগ, অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ‘ভাঙন’ সামাল দেওয়া ছিল এই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যাংক খাতকে পঙ্গুত্ব থেকে রক্ষা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে শ্বেতপত্র প্রকাশের উদ্যোগগুলো অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফেরাতে শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা ও বিচার বিভাগের সংস্কারে যে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে, তা উল্লেখ করার মতো।
র্যাবকে ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’ হিসাবে পুনর্গঠন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ১,২০০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া-জনগণকে দেওয়া জওয়াবদিহিতার প্রতিশ্রুতিরই বাস্তবায়ন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
জ্বালানি খাতে বিশেষ আইন বাতিল করে জনশুনানির মাধ্যমে ট্যারিফ নির্ধারণ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা একটি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব চিন্তার প্রতিফলন। এছাড়া কৃষি, স্বাস্থ্য ও শ্রম অধিকারের মতো স্পর্শকাতর খাতে যে আইনি পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা সরাসরি প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
তবে ১৮ মাসে অর্জিত এই অগ্রগতি যেন কোনোভাবেই থমকে না যায়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, জুলাই বিপ্লবের যে মূল চেতনা-বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন-তা বাস্তবায়নে এই কাঠামোগত সংস্কারগুলোই হবে মূল ভিত্তি। অন্তর্বর্তী সরকারের এই সংস্কার যাত্রা যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবা হিসাবে পৌঁছায়, সেটাই হবে এ সরকারের চূড়ান্ত সাফল্য।
