কেনাকাটা করতে গিয়ে ফিরলেন লাশ হয়ে


কেনাকাটা করতে গিয়ে ফিরলেন লাশ হয়ে
সামনে ঈদ। মেয়ের আবদার, বাবার সঙ্গে কেনাকাটা করবে। তাই সরকারি চাকুরে বাবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবারকে বেছে নেন তারা। ঘরে নতুন পোশাক আনার আনন্দে মতিঝিলের এজিবি কলোনির বাসা থেকে একমাত্র সন্তানকে মোটরসাইকেলের পেছনে বসিয়ে নিউমার্কেটের উদ্দেশে বের হন সাজু আহমেদ সুজন (৪৭)। কিন্তু সেটাই হয়ে গেল জীবনের শেষ যাত্রা। সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে একটি শোরুমে ঢুকে মেয়ের পোশাক পছন্দ না হওয়ায় যাচ্ছিলেন এলিফ্যান্ট রোডে জুতা কেনার উদ্দেশ্যে। সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় ঘুরতে একটি ট্রাক মোটরসাইকেলটির পেছনে ধাক্কা দেয়। পড়ে যান বাবা-কন্যা। বাবার মাথা ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সুমাইয়া আহমেদ তৃষার শরীরের ওপর দিয়ে চলে যায় ট্রাকের চাকা। এতে দুজনই প্রাণ হারান। ঘটনাটি ঘটেছে গত শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে। একই রাতে সড়ক দুর্ঘটনায় আরও দুজন নিহত হয়েছেন। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার সঙ্গে ট্রাকের ধাক্কা লাগে। এতে সিএনজি অটোরিকশাটি উল্টে পড়ে যায়। যাত্রী হারুনুর রহমান সানি (৩২) ও চালক আলিমের (৫০) মৃত্যু হয়। সানির স্ত্রী বৃষ্টি আক্তার ও বোন হ্যাপি আক্তার আহত হন। তারাও ওই অটোরকিশার যাত্রী ছিলেন। তিনজন বেইলি রোড থেকে ঈদের কেনাকাটা করে মহাখালীর বাসায় ফিরছিলেন। সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে ট্রাকচাপায় বাবা-মেয়ের মৃতদেহ পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত করা হয়নি। ভোরে লাশবাহী দুটি গাড়িতে বাবা-মেয়ের মরদেহ নেওয়া হয় সাজুর দক্ষিণ শাহজাহানপুরের বাড়ির সামনে। প্রধান সড়কের পাশে গাড়ি দুটি রাখা হয়। গতকাল শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় সেখানে দেখা যায়, স্বজনরা আর্তনাদ করছেন। লাশবাহী গাড়িতে আত্মীয়স্বজনসহ এলাকাবাসী সারিবদ্ধভাবে মৃতদেহ দেখছেন। প্রায় সবার চোখ ছলছল করছিল। সুমাইয়া বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। বাবার সঙ্গে তিনিও চলে গেলেন না ফেরার দেশে। সন্তান ও স্বামী হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন সুলতানা বেগম। আর্তনাদ করে বলছিলেন, ‘এ কেমন বিচার। স্বামী-সন্তান একসঙ্গে আমাকে ছেড়ে চলে গেল। আমি কেন বেঁচে আছি? কী নিয়ে বাঁচব?’ দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে সুলতানাকে প্রথমে মেয়ে এবং পরে স্বামীর মরদেহ দেখতে দেওয়া হয়। তখন বাকরুদ্ধ ছিলেন তিনি। স্বজনরা তাঁকে ধরে নিয়ে যান লাশবাহী গাড়ির কাছে। বাড়ির বিপরীত পাশে শাহজাহানপুর পারিবারিক কবরস্থানে দুজনের লাশ দাফন করা হয়। নিহতের ভাই মির্জা শাকিল জানান, সাজু সেগুনবাগিচায় গণপূর্ত অফিসে চাকরি করতেন। তাঁর মেয়ে সুমাইয়া ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। তাদের স্থানীয় বাড়ি দক্ষিণ শাহজাহানপুরে। তবে সাজু মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে মতিঝিল এজিবি কলোনির সরকারি কোয়ার্টারে থাকতেন। মির্জা শাকিল বলেন, শুক্রবার রাত ৯টার দিকে বাবা-মেয়ে একসঙ্গে শপিং করতে বের হন। উদ্দেশ্য ছিল মেয়ের পোশাক কেনা। সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে একটি শোরুমে ঢুকে পোশাক পছন্দ না হওয়ায় সুমাইয়া তাঁর মাকে ফোন করে জানান। তখন তাঁর মা তাঁকে বলেন, এলিফ্যান্ট রোড থেকে জুতা কিনে বাসায় ফিরতে। নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আইয়ুব বলেন, সাজু মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন, পেছনে বসেছিলেন তাঁর মেয়ে। রাত সাড় ১০টার দিকে সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় মসজিদের বিপরীত পাশের রাস্তায় পেছন থেকে একটি ট্রাক মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেয়। এতে বাবা-মেয়ে ছিটকে পড়েন। ঘটনাস্থলে সাজু মারা যান। তাঁর মেয়েকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ওসি জানান, গাড়িটি জব্দ ও চালক সিরাজুল ইসলামকে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। এদিকে শুক্রবার রাত পৌনে ১১টার দিকে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় বিজি প্রেসের সামনে একটি ট্রাক ইউটার্ন নেওয়ার সময় সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে পাশ থেকে ধাক্কা দেয়। চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়ক বিভাজকে ধাক্কা লেগে অটোরিকশাটি উল্টে যায়। এতে আহত তিন যাত্রীসহ চালককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে যাত্রী হারুনুর রহমান সানি ও চালক আলিমকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। সানির স্ত্রী বৃষ্টি আক্তার ও বোন হ্যাপি আক্তার প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। সানির মামা শ্বশুর নাহিদ ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন, সানি বনানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। এক বছর আগে বিয়ে হয় তাঁর। স্ত্রী নিয়ে মহাখালীতে বাস করতেন। শুক্রবার রাতে স্ত্রী ও বোনকে নিয়ে বেইলি রোডে ঈদের কেনাকাটা করতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন। তাদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জে। শিল্পাঞ্চল থানার ওসি মাহমুদুর রহমান বলেন, ট্রাকটি জব্দ ও এর চালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে।