জ্বালানি তেলের মজুত পর্যাপ্ত, কাল আসছে দুই জাহাজ
অনলাইন নিউজ ডেক্স
দেশে জ্বালানি তেলের মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে দুদিন ধরে একটি জাহাজের তেল খালাস হচ্ছে। আগামীকাল সোমবার আরও দুটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে। এপ্রিল পর্যন্ত চাহিদা অনুসারে আমদানি নিশ্চিত হয়েছে। চীনা জাহাজে ছাড় থাকায় হরমুজ প্রণালি ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনায় দেশের জ্বালানি আমদানিতে প্রভাব পড়বে না।
ব্যক্তিগত গাড়ি এবং মোটরসাইকেলে ব্যবহৃত পেট্রোলের প্রায় পুরোটা এবং অকটেনের সিংহভাগ দেশেই উৎপাদিত হয়। এরই মধ্যে এপ্রিল পর্যন্ত দুই লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আমদানি চূড়ান্ত করেছে জ্বালানি বিভাগ। ফলে জ্বালানি তেল নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই। জ্বালানি বিভাগ, বিপিসিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে দেশে তেলের সম্ভাব্য সংকট ও দাম বাড়ার শঙ্কায় কয়েক দিন ধরে তেল বিক্রি বেড়ে যায়। পেট্রোল পাম্পে ছিল যানবাহনের দীর্ঘ সারি। তবে গতকাল শনিবার পরিস্থিতি বেশি জটিল হয়। দেশের অনেক স্থানেই সকালের পর তেল বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়। রাজধানীর অনেক পাম্প ঘিরে ছিল এক-দেড় কিলোমিটারের লম্বা লাইন। দুই-তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর তেল কিনতে পারেন ক্রেতা।
সাধারণত সরকারি ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার ডিপো থেকে সরবরাহ বন্ধ থাকে। ফলে পাম্পগুলোতে এমনিতেই কম থাকে তেলের মজুত। এর সঙ্গে গুজবের কারণে অতিরিক্ত তেল কেনা যুক্ত হলে গতকাল ভোগান্তি চরমে পৌঁছে। সংকট সৃষ্টির পেছনে পেট্রোল পাম্প মালিকরা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, শুক্র বা শনিবার সীমিত আকারে ডিপো খোলা রাখলে ভোগান্তি কম হতো।
বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল কেনায় এবং বেশি মুনাফার লোভে কেউ কেউ তেল মজুত করায় কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে।
এদিকে, নাটোরের সিংড়ায় বাঁশঝাড়ে মাটির নিচে ১০ হাজার লিটার ডিজেল মজুত করায় এক ব্যবসায়ীর পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা
গতকাল সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। কোথাও কোথাও তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় পাম্প বন্ধ রাখতে হয়েছে। সরেজমিন দেখা গেছে, সংসদ ভবনের পাশের তালুকদার পাম্পের সামনে গাড়ির সারি জিয়া উদ্যানের লেকের মোড় পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে। আসাদগেট এলাকার একটি ফিলিং স্টেশন থেকে লাইন গেছে প্রিপারেটরি স্কুল পর্যন্ত। পরীবাগের মেঘনা পাম্পেও একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে গাড়ির সারি শাহবাগ ছড়িয়ে পড়ে।
রাজধানীর মালিবাগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মোটরসাইকেলচালক নজরুল ইসলাম বলেন, গতকাল কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল পাইনি। তাই আজ সকালে বের হয়েছি। বেলা ১১টা পর্যন্ত কয়েকটি পাম্প ঘুরেও তেল পাইনি। আলমগীর হোসেন কাজ করেন একটি বেসরকারি সংস্থায়। গতকাল অফিসে যাওয়ার জন্য গাড়ি নিয়ে বের হতে গিয়ে দেখেন ট্যাঙ্কে তেল কম। পরে তিনি ঝুঁকি না নিয়ে রিকশায় অফিসে যান। নেওয়াজ করিম নামে এক গাড়িচালক পরীবাগের পাম্পে তেল কেনেন গতকাল বিকেলে। তিনি বলেন, প্রায় আড়াই ঘণ্টা লাইন ধরে ১০ লিটার অকটেন কিনেছি।
পাম্পে ভিড়, সীমিত বিক্রি
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে দেশে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিতে পারে– এমন শঙ্কায় খুলনা, সিলেট, রাজশাহী, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে ভিড় করছেন যানবাহনের চালকরা। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকের উপস্থিতি বেশি দেখা গেছে। অনেক জায়গায় পাম্পগুলোতে সীমিত তেল বিক্রি করা হচ্ছে, কোথাও আবার ‘তেল নেই’ লিখে বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে।
গতকাল সকাল থেকে খুলনা নগরের বিভিন্ন পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, তেল নিতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন চালকরা। নতুন রাস্তা এলাকার একটি পাম্পে পেট্রোল সীমিত পরিমাণে দেওয়া হলেও ডিজেল ও অকটেন নেই। তেল নিতে আসা চালক ইকবাল হোসেন বলেন, শহরের বেশির ভাগ পাম্পে ২০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। কোথাও আবার অকটেনই নেই।
সিলেটেও একই চিত্র দেখা গেছে। নগরের কয়েকটি পাম্পে মোটরসাইকেলে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা এবং গাড়িতে ৫০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা জানান, গত দুই দিনে স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি তেল বিক্রি হয়েছে। আতঙ্কে অনেকেই ট্যাঙ্ক পূর্ণ করে নিচ্ছেন। রাজশাহী ও নোয়াখালীতেও অনেক পাম্পে তেল শেষ হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও পুলিশ মোতায়েন করতে হয়েছে।
আতঙ্ক আর বিপিসির অব্যবস্থাপনায় সংকট
বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির একাংশের সভাপতি নাজমুল হক বলেন, অনেকেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল নিচ্ছেন। ফলে বেশ কয়েকটি পাম্পে তেল ফুরিয়ে গেছে। তিনি বলেন, শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় সাধারণত তেলবাহী গাড়ি চলাচল করে না এবং পাম্পে সরবরাহ বন্ধ থাকে। সাধারণত সেচ মৌসুমে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত এ নিয়ম শিথিল করা হয়। তবে এবার তা করা হয়নি। নাজমুল হক বলেন, গ্রাহকরা মনে করছেন, আমরা ইচ্ছা করে তেল দিচ্ছি না। অথচ দুপুর আড়াইটার মধ্যেই পাম্পের তেল শেষ হয়ে যায়। তিনি বলেন, রোববার ডিপো থেকে সরবরাহ শুরু হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
মজুত পর্যাপ্ত
গতকাল তেজগাঁও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে জ্বালানির সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এরপর তারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে জানিয়ে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, অনেকে আতঙ্কিত হয়ে বাড়তি তেল সংগ্রহ করছেন। যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা রয়েছে বিধায় রেশনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু মানুষ এই রেশনিংটাকে ভয় পেয়ে মজুত করা শুরু করেছে। তিনি বলেন, আগামীকাল সোমবার আরও দুটী তেলের জাহাজ আসছে, সুতরাং তেলের কোনো সমস্যা নেই।
এপ্রিল পর্যন্ত সরবরাহ নিশ্চিত
জ্বালানি তেলের মজুত নিয়ে আপাতত কোনো সংকট নেই বলে জানিয়েছেন বিপিসির কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, যে ১৪টি কার্গো আসার কথা, এর বেশির ভাগই চলে এসেছে। কয়েকটা পথে রয়েছে। এপ্রিলে ১৫টি কার্গোর মধ্যে ১৩টির আসা নিশ্চিত হয়েছে। দুটি কার্গো মে মাসে পাঠাবে বলে সরবরাহকারীরা জানিয়েছেন। এর পরও সংকট এড়াতে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে তেল আনার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে বলে জানান কর্মকর্তারা। হরমুজ প্রণালির সংকটের বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, চীনা জাহাজ নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকায় সেখানেও কোনো সমস্যা হবে না।
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, এপ্রিল পর্যন্ত দুই লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। যা ইতোমধ্যে দেশে আসতে শুরু করেছে। এর বাইরে ব্রুনাই থেকে আরও এক লাখ টন ডিজেল আমদানি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ৫০ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো ফার্নেস অয়েলের মজুত রয়েছে।
পেট্রোল ও অকটেন দেশেই হয়
বাংলাদেশের পেট্রোলের চাহিদার প্রায় পুরোটা, অকটেনের সিংহভাগ দেশেই উৎপাদিত হয়। এ জন্য এ দুই জ্বালানি তেল নিয়ে ব্যবহারকারীদের আতঙ্কিত না হতে অনুরোধ জানিয়েছে বিপিসি।
বাংলাদেশের পেট্রোল আসে মূলত দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া উপজাত কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে। কনডেনসেট থেকে পাওয়া পেট্রোলের পরিমাণ দেশের চাহিদার চেয়েও বেশি। তাই বিপিসি কয়েকবার পেট্রোল রপ্তানির চেষ্টা করলেও মানসম্মত না হওয়া সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এই পেট্রোলের সঙ্গে আমদানি করা অকটেন বুস্টার মিশিয়ে অকটেন তৈরি করা হয়।
দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি (ইআরএল) ও কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারি কনডেনসেট থেকে পেট্রোল, অকটেনসহ প্রায় ৪০টি পেট্রোলিয়াম পণ্য– তারপিন, রঙের কাঁচামাল ইত্যাদি তৈরি করে। এদের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা বছরে প্রায় ১৬ লাখ টন। আর বাংলাদেশে পেট্রোল ও অকটেনের বার্ষিক চাহিদা আট থেকে সাড়ে আট লাখ টন।
