কয়লার ইস্ত্রিতে জীবন ও জীবিকা চলছে প্রাভাতের
নাসির উদ্দিন, উপজেলা সংবাদদাতা, আত্রাই, নওগাঁ
বাবলু সাহা\"প্রভাত\" সবে বেড়ে ওঠা তরুণ। নওগাঁর আত্রাই উপজেলার বান্দাইখাড়া এলাকার বাসিন্দা তিনি। গ্রামে বিদ্যুতের প্রশ্নই ওঠে না। সে সময়ে বেড়াতে গিয়ে ২ শ’ টাকা দিয়ে ইন্ডিয়া থেকে একটি কয়লার ইস্ত্রি কিনে আনেন তিনি। নির্দিষ্ট করে সালটা মনে নেই। দেশ স্বাধীনের ৯-১০ বছর পরের কথা। এরপর তিনি সেই ইস্ত্রি দিয়ে লন্ড্রি এবং সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন।বর্তমানে সেলাইয়ের কাজ বাদ হলেও লন্ড্রির কাজ এখনো করে চলেছেন।
বাবা হরিপদ সাহা ও মা সুকুমারী রাণী কেউই বেঁচে নেই। বান্দাইখাড়া বাজারের মধ্যে ছোট একটি দোকান। তার মধ্যে টেবিল আর দেওয়াল ঘেঁষে জমিয়ে রাখা হয়েছে কয়লা। এই কয়লার আগুন ইস্ত্রির ভেতর ঢুকিয়ে কাপড় ইস্ত্রি করেন বাবলু সাহা\"প্রভাত \"। ৪৫ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি এ কাজ করে চলেছেন। এ আয় দিয়েই কিনেছেন ধানিজমি,চালিয়েছেন সংসার।
বাবুল সাহা প্রভাত (৬৩) জানান, দেশ স্বাধীনের ৯-১০ বছর পর ছোট শখের বশে ইন্ডিয়া বেড়াতে গিয়ে পিতলের তৈরি কয়লার ইস্ত্রি নিয়ে আসেন। ২শ’ টাকা দামে। সেই থেকে বান্দাইখাড়া বাজারে কাপড় ইস্ত্রির কাজ শুরু, এখনো চলছে। বান্দাইখাড়া বাজারে ছোট একটি দোকান ভাড়া নিয়ে তিনি এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন । এর আগে তিনি বাজারের বিভিন্ন দোকানের সামনে লোকজনকে বলে একটু জায়গা নিয়ে এ কাজ করতেন।
তিনি জানান, ইস্ত্রির কাজ শুরুর বছর তিন বছর পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। সংসার জীবনে তার এক মেয়ে এবং এক ছেলে।
তিনি আরও জানান, প্রথম দিকে কাপড় প্রতি আটআনা পরে একটাকা করে নিতেন। এখন পাঁচ টাকা। আর শাড়ি প্রতি দশ টাকা। তখন প্রতিদিন ২০-৫০ টাকা আয় হতো।বর্তমানে কাপড় প্রতি ১০ টাকা থেকে ৩০ টাকা হয়েছে। জিনিসপত্রের দাম সেই সাথে লন্ড্রির সংখ্যা ও বাজারে বেড়ে গেছে। আগের সময় অল্প ইনকাম হলেও ভালো ছিলাম সংসার চলে যেতো। বিয়ের পর বাড়িতে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পালতেন স্ত্রী। সংসারের খরচ থেকে টুকটাক জমিয়ে প্রথমে কেনেন জমি। এরপর আবার কিছু সঞ্চয়, তারপর আস্তে আস্তে এখন কিছু ধানিজমির মালিক তিনি। সেই জমিতে নিজেরাই উৎপাদন করেন ধান। এতে তাদের বছরের খোরাকিটা হয়ে যায়।
সবসময় প্রাণোচ্ছল মানুষটির জীবনে একটিই চাওয়া ছিল,অন্তত ছেলেকে তিনি লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করতে।বাবুল সাহা প্রভাত একজন সহজ-সরল মানুষ। খুবই সৎ আর কর্মঠ। কখনো তিনি কোনো বিষয়কে জটিল করে দেখতে চান না।
জানা যায়, ইস্ত্রি কেনার পর একবার হাত থেকে পড়ে কাঠের হাতলটি ভেঙে যায়। ওই একবারই সেটি মেরামত করতে হয়েছে। এছাড়া আর কোনো সমস্যা হয়নি।
বিএনপি নেতা আনোয়ার তরফদার বলেন, ‘মানুষটা খুব নিরীহ। কারো সঙ্গে কোনোদিন উচ্চস্বরে কথা বলেননি। সবাই তাকে শ্রদ্ধা করে বিশেষ করে তার সততার জন্য।অনেক গুলো ইস্ত্রির দোকান থাকলেও বাজারে একমাত্র তারই ইস্ত্রির দোকানে সবাই কাপড় ইস্ত্রি করে। বান্দাইখাড়া ছাড়াও আশপাশের গ্রামের লোকজন তার কাছে কাপড় ইস্ত্রি করাতে আসেন।
