দেশপ্রেমের অনন্য নজির হয়ে উঠছে বিজিবি


দেশপ্রেমের অনন্য নজির হয়ে উঠছে বিজিবি
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) প্রায় দেড় যুগ পর দেশপ্রেমের অনন্য নজির হয়ে উঠছে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) ধারাবাহিক পুশইন, কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের অপচেষ্টা, সীমান্ত হত্যাসহ সীমান্ত কেন্দ্রিক নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কঠোর হাতে দমন করছেন বিজিবির সদস্যরা। সীমান্ত সুরক্ষায় নতজানু নীতি থেকে বেরিয়ে তারা বিএসএফের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ড রুখতে তারা সর্বদা তৎপর রয়েছেন। বিজিবি সদস্যদের সাহসী পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষও তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। সীমান্তে পুশইন ইস্যুতে বিজিবির কঠোর অবস্থানকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। তাদের দাবি-সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ভূমিকা নির্ভর করে দেশের সরকারের ওপর। সরকারের ইচ্ছা, অনিচ্ছা ও দৃষ্টিভঙ্গী সীমান্তে সব অপরাধ দমনে ভূমিকা রাখে। ভারতের পুশইন প্রতিরোধে বিজিবির ভূমিকা-নতজানু নীতি থেকে বেরিয়ে আসারই ইঙ্গিত। অথচ গত ১৬ বছরের বেশি সময় সীমান্ত এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেছে বিএসএফ। মূলত আওয়ামী লীগের শাসনামলে সীমান্তে বিজিবিকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছিল। বিএসএফ সদস্যদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাদের কোনো প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ করতে দেখা যায়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সীমান্তের দৃশ্যপট পালটে গেছে। নতুন সরকার আসার পর সীমান্তে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিজিবি। বিএসএফের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিজিবি সদস্যরা সব অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন। পুশইন প্রতিরোধ, চোরাচালান ও মাদকপাচার রোধসহ সীমান্ত কেন্দ্রিক নানা অপরাধ দমনে তারা ভূমিকা রাখছেন। জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, সীমান্তে আমাদের অবস্থান, সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও যে কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদের প্রশ্নে বিজিবি সদস্যরা যেভাবে দায়িত্ব পালন করছেন-এটাকে ইতিবাচকভাবে দেখি। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল বলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্র শক্তিশালী মানে এমন নয়-তারা যা খুশি তাই করবে। সীমান্তে হত্যা, পুশইন ও মাদক পাচার মেনে নেওয়া যায় না। এসব অপরাধ বিজিবি কখনো মেনে নেবে না। কারণ বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সীমান্তের সুরক্ষার দায়িত্ব আমাদেরই। অতীতের মতো নতজানু নীতি আমরা আর দেখতে চাই না। বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে শুরু হয়েছে অস্থিরতা। রাষ্ট্রীয় আইন ও আন্তর্জাতিক নিয়মনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিএসএফ জোর করে মানুষকে সীমান্তে ঠেলে পাঠানোর (পুশইন) চেষ্টা করছে। তবে বিএসএফের এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন বিজিবির সদস্যরা। পুশইনের অপচেষ্টা তারা ঠেকিয়ে দিচ্ছেন এবং প্রতিরোধ করতে তারা টহলকার্যক্রম বাড়িয়েছেন। বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম বলেন, সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে। বিদ্যমান আইন এবং দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার পরিপন্থি যে কোনো পুশইন প্রচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। বিজিবি সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন সীমান্তে বিএসএফের আটটি পুশইন অপচেষ্টা প্রতিহত করেছে বিজিবি। এর মধ্যে-ঝিনাইদহের মহেশপুরের যাদবপুর সীমান্তে তিনজনের অনুপ্রবেশের চেষ্টা বিজিবির (৫৮ বিজিবি) টহল দল ঠেকিয়ে দিয়েছে। একই সময়ে নওগাঁর করমুডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে ১৭ জনকে পুশইন করার চেষ্টা প্রতিহত করেছে নওগাঁ ব্যাটালিয়নের (১৬ বিজিবি)। এছাড়া বড়খাতা ও পঁয়ষট্টিবাড়ী সীমান্তে ২১ জনকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়। বিজিবির তাৎক্ষণিক প্রতিরোধে তারা অনুপ্রবেশে ব্যর্থ হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা ও আদিতমারী সীমান্ত ৩৩ জনকে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে স্থানীয়দের সহায়তায় বিজিবি এ অপচেষ্টা রুখে দেয়। যশোরের গোগা ও রুদ্রপুর সীমান্ত এলাকায় কয়েকজন নারী-পুরুষকে হাজির করে বিএসএফ। তবে বিজিবির তৎপরতায় তাদের সরিয়ে নিতে বিএসএফ বাধ্য হয়। এছাড়া গত কয়েকদিনে ঝিনাইদহের মহেশপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর, পঞ্চগড়ের রওশনপুর, সিলেটের উৎমাছড়া ও নেত্রকোনার কচুগড়া সীমান্ত দিয়ে কয়েকশ নারী-পুরুষ-শিশুকে বাংলাদেশে পুশইন করার চেষ্টা করে বিএসএফ। কিন্তু বিজিবির কড়া পাহারা ও প্রতিরোধের মুখে সব ব্যর্থ হয়। ২২ মে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম সীমান্তের শূন্যরেখায় বিজিবির বাধা উপেক্ষা করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের চেষ্টা করে বিএসএফ। কোনো তথ্য না দিয়ে হঠাৎ নির্মাণকাজ শুরু করলে বিজিবি বাধা দেয়। পানবাড়ী কোম্পানির বিজিবির কমান্ডার সুবেদার সোলেমান আলী তাৎক্ষণিক টহল দল সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে যান এবং কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। এ নিয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে তুমুল উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। তবে বিজিবির অনড় অবস্থানে বিএসএফ কাজ বন্ধ করে পিছু হটতে বাধ্য হয়।