জলাবদ্ধতার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা আয়োজনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে সমালোচনার মুখে পড়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেই ঘটনার প্রায় ১০ দিন পর কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের একযোগে সাতজন শিক্ষককে বদলি করা হয়েছে। কলেজটির ইতিহাসে একসঙ্গে এতসংখ্যক শিক্ষকের বদলির ঘটনা এবারই প্রথম।
তবে এই বদলিকে নিয়মিত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি রক্ষায় শিক্ষকদের ‘বলির পাঁঠা’ বানানোর চেষ্টা হিসেবে দেখছেন কলেজের অনেক শিক্ষক।
২৩শে জুলাই, বৃহস্পতিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সরকারি কলেজ-২ শাখার উপসচিব মো. আ. কুদ্দুস স্বাক্ষরিত পৃথক প্রজ্ঞাপনে সাত শিক্ষককে দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজে বদলি করা হয়।
প্রজ্ঞাপনে আগামী ২৯শে জুলাইয়ের মধ্যে তাদের বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যাদের যেখানে বদলি করা হয়েছে
উপাধ্যক্ষ এ কে এম জহিরুল আলমকে চৌদ্দগ্রামের চিওড়া সরকারি কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে
গণিত বিভাগের অধ্যাপক মো. আবদুল মালেককে কক্সবাজার সরকারি কলেজ
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কনক বড়ুয়াকে নোয়াখালীর হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজে
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উল্লাহ মজুমদারকে লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজে
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নূর মোহাম্মদ নূর উল্লাহকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর সরকারি কলেজে
হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. আল-আমিনকে সিলেটের বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজে
ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মহসীনকে বরগুনা সরকারি কলেজে
কলেজ সূত্র বলছে, বদলি হওয়া শিক্ষকদের সবাই সরাসরি পরীক্ষা পরিচালনার মূল দায়িত্বে ছিলেন না। উপাধ্যক্ষ এ কে এম জহিরুল আলম পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন না। গণিত বিভাগের অধ্যাপক মো. আবদুল মালেক জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের অনীহার কারণে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালন করছিলেন। কনক বড়ুয়া পরীক্ষা কমিটির আহ্বায়ক এবং মোহাম্মদ মহসীন শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক ছিলেন।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৩ই জুলাই। টানা ভারী বর্ষণে কুমিল্লা শহরের পাশাপাশি কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজও পানিতে তলিয়ে যায়। জলাবদ্ধতার মধ্যেই এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষার্থীদের অনেকেই কোমরসমান পানি পেরিয়ে কেন্দ্রে পৌঁছান। পরে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু ডিঙি নৌকার ব্যবস্থা করে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে পৌঁছে দেন।
নৌকায় চড়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনও সমালোচনার মুখে পড়েন।
এরপর ১৮ই জুলাই কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী কলেজ পরিদর্শনে গিয়ে জলাবদ্ধতা এবং পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। কলেজ শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এই ঘটনার কারণে সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন।
এর কয়েক দিনের মধ্যেই সাত শিক্ষককে একযোগে বদলির আদেশ জারি হওয়ায় কলেজজুড়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলেজের একাধিক শিক্ষক বলেন, এই বদলি মূলত প্রশাসনিক নয়, বরং মন্ত্রণালয়ের সমালোচনা প্রশমনের জন্য শিক্ষকদের দায়ী করার চেষ্টা। তাদের ভাষ্য, পরীক্ষা স্থগিত বা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত কলেজের একার ছিল না।
শিক্ষামন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি রক্ষায় বলির পাঁঠা হলেন বদলি হওয়া শিক্ষকেরা- ক্ষোভ জানিয়েছেন কলেজের কয়েকজন শিক্ষক।
এক শিক্ষক বলেন, “জলাবদ্ধতার বিষয়টি জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন থেকে শুরু করে সরকারের দায়িত্বশীল সব মহল জানতেন। যদি শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরীক্ষা স্থগিতের নির্দেশ দিত, আমরা তাৎক্ষণিকভাবে তা বাস্তবায়ন করতাম। কিন্তু কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এখন সেই ব্যর্থতার দায় আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে তাদের ভাবমূর্তি রক্ষায়।”
আরেক শিক্ষক বলেন, “৫ই আগস্টের পর সারাদেশে শিক্ষকদের ওপর নেমে এসেছে নির্যাতন-নিপীড়নের খড়গ। শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করা, অপমান-অপদস্থ এবং ভুয়া মামলার ঘটনার শিক্ষক হাজার হাজার শিক্ষক। ভেবেছিলাম এসব থেমে যাবে এই সরকারের সময়। কিন্তু এখনো শিক্ষক নির্যাতন চলছে। এভাবে শিক্ষাদান সম্ভব নয়।”
এদিকে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রয়োজন মনে করলে যে কাউকে যে কোনো সময় বদলি করতে পারে। এটি প্রশাসনিক ক্ষমতার মধ্যেই পড়ে।
তবে একসঙ্গে সাতজন শিক্ষককে বদলি করা কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়। এর বেশি মন্তব্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”
এ ঘটনায় শিক্ষা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকের প্রশ্ন, জলাবদ্ধতার মতো পরিস্থিতিতে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত যদি কেন্দ্রীয়ভাবে নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে শুধু কলেজের শিক্ষকদের বদলি করে দায় নির্ধারণ কতটা যৌক্তিক—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।