প্রকাশিতঃ অক্টোবর ২১, ২০২৬

হঠাৎ কেন পিএসসির চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন মোবাশ্বের


হঠাৎ কেন পিএসসির চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন মোবাশ্বের
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম। তার এই আকস্মিক পদত্যাগ ঘিরে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ পাওয়ার প্রায় দুই বছর না যেতেই মঙ্গলবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র পাঠান তিনি। তাতে শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করা হলেও তিনি বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ বিভাগে (লোকপ্রশাসন) যোগ দিয়েছেন। এর পেছনে প্রশাসনিক, নীতিগত কিংবা রাজনৈতিক কোনো চাপ ছিল-এ নিয়ে পিএসসির ভেতরে ও সংশ্লিষ্ট মহলে চলছে নানা আলোচনা। এ প্রসঙ্গে মোবাশ্বের মোনেম বলেন, দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত কাজের চাপ, বয়সজনিত সমস্যা ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার কারণে তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যেতে চাইছিলেন তিনি। কোনো রাজনৈতিক চাপ ছিল না বলে তিনি জানিয়েছেন। তবে প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়। দায়িত্ব নেওয়ার পর পিএসসির দীর্ঘদিনের জট নিরসন, বিসিএস পরীক্ষার সময় কমানো এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়াতে বেশ কিছু বড় সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ‘ওয়ান বিসিএস, ওয়ান ইয়ার’ পরিকল্পনা। একটি বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি থেকে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া ১২ মাসের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এই পরিকল্পনার আওতায় ৪৪তম, ৪৫তম, ৪৬তম, ৪৮তম ও ৪৯তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এসব পরীক্ষায় ৭ হাজার ৬৫১ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৪৭তম ও ৫০তম বিসিএস দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৫০তম বিসিএসের ক্ষেত্রে এক বছরের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। মোবাশ্বের মোনেমের নেতৃত্বাধীন কমিশন বিসিএস পরীক্ষার প্রচলিত কাঠামোতেও পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়। লিখিত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে নতুন পদ্ধতি, মৌখিক পরীক্ষা ‘কম্পিটেন্সি বেজড’ করা, প্রশ্ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন এবং কোচিংনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এছাড়া প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে নিজস্ব ডিজিটাল প্রেস স্থাপন, পরীক্ষাসংক্রান্ত কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ফল প্রকাশের লক্ষ্যও নেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিসিএসের আবেদন ফি ৭০০ টাকা থেকে কমিয়ে ২০০ টাকা করা হয়। এসব পরিবর্তনের পাশাপাশি পিএসসির পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টিও সামনে আনেন চেয়ারম্যান। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠিও দেওয়া হয়েছিল। এ নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে কমিশনের টানাপোড়েন সৃষ্টি হওয়ার গুঞ্জন ওঠে। পিএসসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মোবাশ্বের মোনেমকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে। রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তনের পর নতুন সরকারের সঙ্গে তার কাজের সম্পর্ক কতটা স্বাভাবিক ছিল, সেটিও আলোচনায় এসেছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, পিএসসির নানা সংস্কারের কারণে দীর্ঘদিনের প্রচলিত সুবিধা থেকে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল বঞ্চিত হতে পারে। বিশেষ করে প্রশ্নফাঁস, নিয়োগবাণিজ্য কিংবা তদবিরনির্ভরতার সুযোগ বন্ধ করার উদ্যোগ কারও কারও জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে থাকতে পারে। এছাড়া সরকার তাকে আর চেয়ারম্যান পদে রাখতে আগ্রহী নয়-এমন কোনো বার্তা তিনি পেয়ে থাকতে পারেন। শিক্ষাবিদ ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের কথা বলেছে। কিন্তু বাস্তবে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি না। পিএসসি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে সরকারি পদে যোগ্য ও দক্ষ জনবল নিয়োগে পিএসসির বড় ভূমিকা রয়েছে। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই হঠাৎ পদত্যাগের বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। তাছাড়া সরকার হয়তো পছন্দের বা দলীয় ঘরানার কাউকে এই পদে নিয়োগ দিতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পিএসসির এক সদস্য বলেন, ‘চেয়ারম্যান স্যার পদত্যাগের আগের দিন আমাদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলেছেন ও সভা করেছেন। হঠাৎ মঙ্গলবার আমাদের ডেকে জানান, তিনি পদত্যাগ করবেন। কেন বা কি কারণে তা আমরা জানি না।’