থুবড়ে আছে ধ্বংসস্তূপ দুঃখ ভুলতে চায় তুরস্ক


ভূমিকম্পে লন্ডভন্ড তুরস্কের ১০টি প্রদেশে আর্তনাদ থামছেই না। নিখোঁজ-স্বজনহারানো পরিবারগুলোর আর্তি-‘মৃত কিংবা জীবিত মানুষগুলোকে পেতে চাই।’ কিন্তু গত ২০ ফেব্রুয়ারির পর ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত ব্যক্তি কিংবা মৃতদেহ উদ্ধার তৎপরতা বন্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অধিকাংশ উদ্ধারকারী দল ইতোমধ্যেই স্ব স্ব দেশে চলেও গেছে। অন্যদিকে মাইলের পর মাইল ধ্বংসস্তূপ থুবড়ে পড়ে আছে। এ পর্যন্ত (২৬ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তুরস্কে ৪৪ হাজার ২১৮ ও সিরিয়ায় ৫ হাজার ৯১৪ জন। আর নিখোঁজ রয়েছে অসংখ্য মানুষ। পাশাপাশি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের অনেকেই প্রতিদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। আবার কেউ কেউ সুস্থ হয়ে ফিরছেন, তবে তাদের অনেককেই সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে পঙ্গুত্বের বোঝা। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও দুঃখ ভুলে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে তুরস্ক। ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত ১০ প্রদেশে আপাতত কর্মী ছাঁটাই নিষিদ্ধ করেছে তুরস্ক সরকার। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সদস্যদের আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা তৈরির কাজ মাঠ পর্যায়ে শুরু হয়েছে। মার্চ থেকে ১ লাখ ৯৯ হাজার ৭৩৯টি অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের কাজ শুরু হবে। এছাড়া ‘কনটেইনার হাউজ’ দিতে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছ থেকে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে। বৃহস্পতি ও শুক্রবার তুরস্কের হাতায়, আদিয়ামানসহ ছয়টি প্রদেশে ধ্বংসস্তূপ এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, স্বজনহারাদের আর্তনাদ চলছেই। হাসপাতাল ঘিরে শঙ্কায় থাকছে স্বজনরা। চিকিৎসাধীন অবস্থায় অনেকেই প্রাণ হারাচ্ছেন। বহু পরিবার ছিল, যাদের কেউ বেঁচে নেই। নিকটতম আত্মীয়-স্বজনরা মৃতদেহ গ্রহণ করেছেন। অপরদিকে ধ্বংসস্তূপের কাছে নিখোঁজদের খুঁজে পেতে দিনের পর দিন অপেক্ষা করছেন স্বজনরা। একের পর এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপে ঠিক কত সংখ্যক মানুষ চাপা পড়ে রয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই। সবখানেই থেমে গেছে উদ্ধার তৎপরতা। এর আগে বাংলাদেশসহ মোট ৮১টি দেশের উদ্ধারকারী দল ১০টি প্রদেশে বিভিন্ন পর্যায়ে উদ্ধার কাজ পরিচালনা করেছে। দেশগুলোর ৬ হাজার ৬৩৬ জন উদ্ধারকারী সদস্য দিন-রাত উদ্ধার তৎপরতা চালিয়েছে। এদের প্রায় ৯০ শতাংশ ইতোমধ্যেই স্ব স্ব দেশে চলে গেছেন। হাতায় প্রদেশে সবচেয়ে বেশি উদ্ধারকর্মী ছিলেন। মোট বিদেশি উদ্ধার কর্মীদের মধ্যে ২ হাজার ৩৯৮ জন হাতায় ছিলেন। সেখানে প্রায় ১৪ হাজার মানুষ প্রাণ হারান। আদিয়ামান ও হাতায় প্রদেশে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ দুটি প্রদেশের প্রায় ৮০ শতাংশ ঘরবাড়ি-বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। ছোট-বড় ফাটল ছিল বাকি ২০ শতাংশ স্থাপনায়। দ্বিতীয়বার ভূমিকম্পে শুধু এ দুটি প্রদেশ নয়, বাকি ৮টি প্রদেশে ফাটল অবস্থায় থাকা অধিকাংশ ভবনই ভেঙে পড়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের অনুরোধে ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ মাসের জন্য ১০টি প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারি করে প্রদেশগুলোর পার্লামেন্ট। ফাটল ঘরবাড়ি, বিভিন্ন স্থাপনায় লোকজন না থাকায় দ্বিতীয়বারের ভূমিকম্পে তেমন হতাহত হয়নি। তবে দ্বিতীয়বার ভূমিকম্পে এ পর্যন্ত অন্তত ৪ জন নিহত হয়েছে। আহত অবস্থায় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে ২৭০ জনের মতো। রোববার তুরস্কের দুর্যোগ ও জরুরি ব্যবস্থাপনা বিভাগ ‘আফাদ’ সূত্রে জানা যায়, ১০টি প্রদেশের মধ্যে ৮টি প্রদেশ রেড জোনে রয়েছে। যে কোনো সময় এ প্রদেশগুলোয় ফের ভূমিকম্প হতে পারে। সূত্রটি জানায়, ভূমিকম্পে যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, শুধু ঘরবাড়িসহ অন্যান্য স্থাপনা গড়ে তুলতে প্রায় ১৫ হাজার কোটি ডলারের প্রয়োজন। এছাড়া এমন বিপর্যয়ের কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ১-২ শতাংশ নিম্নমুখী হতে পারে। এমন অবস্থায় তুরস্ক সরকার ক্ষতিগ্রস্ত প্রদেশগুলোয় আপাতত কর্মী ছাঁটাই নিষিদ্ধ করেছে। ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারে ১০ হাজার লিরা (স্থানীয় মুদ্রা) করে প্রদান করা হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে বাড়ির মালিক, ভাড়াটিয়াদের তালিকা করা হয়েছে। আফাদ সূত্রে জানা যায়, শনিবার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে-ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য প্রায় ২ লাখ অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করা হবে। ধ্বংসস্তূপ স্থানে নতুন করে কোনো স্থাপনা তৈরি করা হবে না। সরকারি স্থপতি দিয়ে ইতোমধ্যে উন্মুক্ত স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে পরিকল্পনা অনুযায়ী ভূমিকম্প রোধ স্থাপনা তৈরি করা হবে। মার্চ মাস থেকে মাঠ পর্যায়ে স্থাপনা তৈরি শুরু হবে। ধ্বংসস্তূপের জঞ্জাল ধীরগতি সরানো হবে। নতুন স্থাপনা তৈরিতে জোর দিয়েছে তুরস্ক সরকার। এছাড়া কনটেইনার হাউজ তৈরি করা হচ্ছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে দ্রুত সময়ের মধ্যে এ হাউজ তৈরি হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনলাইনে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছ থেকে আবেদন গ্রহণ শুরু হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে কনটেইনার হাউজ প্রদান করা হবে বলেও জানিয়েছে আফাদ। সরেজমিন দেখা গেছে, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ধ্বংসস্তূপ এলাকায় নতুন করে কোনো স্থাপনা তৈরি হচ্ছে না, উনন্মুক্ত স্থানে ঘরবাড়ি তৈরির কাজ পুরোদমে চলছে। প্রায় শতাধিক অভিজ্ঞ স্থপতি মাঠে কাজ করছেন। শোকাহত মানুষ, নিখোঁজ থাকা স্বজনদের আত্মীয়স্বজনরাও দুঃখ ভুলে দাঁড়াতে চাচ্ছে। সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সরকারের সব ধরনের উদ্যোগকে স্বাগত জানাচ্ছেন। তুরস্ক সরকারি হিসাবে, ১০টি প্রদেশে প্রায় ৩ লাখ স্থাপনা ভেঙে গেছে। বিদ্যুৎ, খাবার, পানীয় ও ওষুধ সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংগঠনগুলোও।