ভাঙনের শেষ বিন্দুতে পাকিস্তান —
অনলাইন নিউজ ডেক্স
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে একদিকে মানুষের রক্ত ঝরছে, অন্যদিকে আলোড়ন চলেছে বিশ্বজুড়ে। সেই জটিল ও কঠিন সময়ের আঁচ দিতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করছে মুক্তিযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটিশ সরকারের গোয়েন্দা নথি এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে প্রকাশিত বই নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন। আজ প্রকাশিত হচ্ছে ব্রিটিশ গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বাছাই অংশ। অনুবাদ ও গ্রন্থনা ফারুক ওয়াসিফ
প্রদেশের অন্যান্য জায়গায় কী হচ্ছে তার খবর কমই আসছে, কিন্তু ঢাকার পরিস্থিতি কুৎসিত। ৬ মার্চ পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের শান্তিপূর্ণ হরতাল ডেকেছে আওয়ামী লীগ। এর সঙ্গে চলছে অসহযোগ আন্দোলন। বেশ কিছু সহিংস ঘটনায় সেনাবাহিনী গুলিবর্ষণ করলে শেখ মুজিব তাঁর অনুসারীদের সহিংসতা এড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন এবং আজ (৪ মার্চ) এ পর্যন্ত শান্তি বজায় থাকলেও সেনাবাহিনী ও জনতা উভয়ের মধ্যে সংঘাতের আশঙ্কা ক্রমশ জোরদার হচ্ছে।
দৃশ্যত সামরিক শাসন প্রলম্বিত করার বিরুদ্ধে জনগণের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে মুজিব তাঁর অবস্থান তৈরি করেছেন।
ব্যাপক প্রত্যাশা রয়েছে যে, ৭ মার্চ গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণার মধ্য দিয়ে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন। কিন্তু তাঁর ৩ মার্চের বক্তৃতা সরকারের দিক থেকে ইতিবাচক সাড়ার জন্য ‘দরজা খোলা’রেখেছে। ঢাকায় ১০ মার্চ প্রেসিডেন্টের ডাকে রাজনৈতিক নেতাদের সম্মেলন প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে সেই দরজা বন্ধ হয়ে যায়। প্রেসিডেন্টের প্রস্তাব হয়তো পশ্চিম পাকিস্তানি জনমতের কাছে যুক্তিযুক্ত হতে পারে, কিন্তু তার জন্য মুজিবের আগাম সম্মতি নিশ্চিত না করায় ব্যাপারটা নিরর্থক (হয়) এবং তিনি যে প্রত্যাখ্যান পেয়েছেন, সম্ভবত তিনি নিজেই সেটাই ডেকে এনেছেন। মুজিবের পক্ষে সমর্থন যদি এখন যে রকম আছে বলে মনে হচ্ছে, সে রকমই দৃঢ় থাকে, তাহলে তিনি হয়তো স্বাধীনতার ডাক দিতে বেশি দেরি করবেন না। অন্য কোনো রাজনৈতিকভাবে কার্যকর বিকল্প তাঁর সামনে খোলা আছে বলে দেখতে পাওয়া কঠিন।
গণঅসহযোগিতার ডাক দিয়েও মুজিব তাঁকে আইনসংগত গ্রেপ্তারের জন্য খোলা রেখেছেন। যদি তা ঘটে তাহলে পরিস্থিতি যেদিকে গড়াবে, তা হবে সবচেয়ে বিপজ্জনক।
যেহেতু স্বাধীনতার জন্য কোনো পদক্ষেপ সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনীর বিরোধিতার মুখে পড়বে, সেই পরিস্থিতি বাঙালিদের জন্য ক্রোধ ও হতাশায় ভরা থাকবে। এবং তা বিদেশিদের জন্য আরও বেশি বিপদের হবে, তারা হয়তো উভয়পক্ষের ক্রসফায়ার এবং দাঙ্গা–হাঙ্গামার মধ্যে পড়ে যাবে। আমরা যতদূর জানি, এখন পর্যন্ত তাঁদের কোনো ক্ষয়ক্ষতি থেকে বেঁচে গেছেন। আমাদের জরুরি পরিকল্পনার প্রথম পর্যায়ের আওতায় (ব্রিটিশ) নাগরিকদের ঘরের ভেতর থাকার জন্য হুঁশিয়ারি জানানো হয়েছে এবং সাধারণভাবে বিপদের মাত্রায় ভালোভাবেই উপলব্ধি করা হয়েছে। সামরিক আইন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো সমন্বিত বিরোধিতা নেই এবং এখানেই আরও বড় বিপদ লুকিয়ে আছে। যদি শারীরিক সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়, বাঙালিদের হতাশা যে কারও ওপর আছড়ে পড়তে পারে। যেহেতু মনে হয় না মুজিবের সংগঠন সুনির্দিষ্ট কিন্তু কার্যকর প্রতিরোধ সংগ্রাম পরিচালনা করতে সক্ষম। পাশাপাশি গণসহিংসতায় নেমে পড়ার প্ররোচনাও বহাল রয়েছে। জনগণের মেজাজ এমন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ প্রদর্শন অথবা পরোক্ষ প্রতিরোধ ও গণঅসহযোগিতা অনিয়ন্ত্রিত সহিংসতার দিকে চলে যেতে পারে। এখানে হিন্দু ও পশ্চিম পাকিস্তানিদের স্বার্থের ওপর আরও বিস্তৃত লুটপাট শুরু হয়ে যেতে পারে।
এটা মর্মান্তিক যে কী হবে তা আগাম অনুমান করা সম্ভব নয়। প্রেসিডেন্ট কর্তৃক জাতীয় পরিষদের বৈঠক স্থগিত ঘোষণার প্রতিক্রিয়া এখানে তিক্ত অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে এবং পরিস্থিতি ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের ভাঙনের বিন্দুতে এসে পৌঁছেছে। সেনাবাহিনীকে এখন দখলদার বাহিনীর মতো করে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক সমাধানে না আসা পর্যন্ত স্বাভাবিক জীবন চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অতি সামান্য।
বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত তিন দিন ধরে ঢাকা থেকে বের হওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাকিস্তান এয়ারলাইন্সের সেবাগুলো চালু করার সামান্য চেষ্টাও দেখা যায়নি এবং বিমান চলাচল চালু হওয়ার বিষয়ে কোনো তথ্যও মিলছে না। বার্মা ও থাই এয়ারওয়েজ চালু হওয়ারও আশা করা হচ্ছে না। তবে কেবল একটি থাই বিমানে করে আটকে পড়া যাত্রীদের আগামীকাল ব্যাংককে নেওয়ার কথা।
৩৬ ঘণ্টার মধ্যে সুনির্দিষ্ট উন্নতি না ঘটলে, আমি কেবল এই সুপারিশ করতে পারি, যারা চলে যেতে চায় তাদের ৭ মার্চের আগেই নিয়ে যাওয়ার অন্যান্য ব্যবস্থার প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। ৭ মার্চ মুজিবের বক্তৃতা নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে পারে, নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবাগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং চলতে পারে ব্যাপক রক্তপাত। বিদেশিদের মধ্যে তুমুল উদ্বেগ বিরাজ করছে, কার্যত তাঁরা যাঁর যাঁর বাড়িতে অবরুদ্ধ অবস্থায় আছেন। পরিস্থিতির সামান্য উন্নতির সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। স্ত্রী ও শিশুদের এই পরিস্থিতির বাইরে নিয়ে যাওয়া উচিত। এই অবস্থায় আমি কর্তৃপক্ষের কাছে জরুরিভাবে নির্গমনের অধিকতর ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ করছি। (অসম্পূর্ণ)
সূত্র: ইউকে ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিস ডিক্ল্যাসিফাইড ডকুমেন্টস ১৯৬২-১৯৭১, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অ্যান্ড স্ট্রাগল ফর ইনডিপেন্ডেন্স, হাক্কানি পাবলিশার্স, ঢাকা, মার্চ ২০১৩ সংস্করণ।
