অর্থ সংকট: ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দে খরচ বন্ধের নির্দেশ


অর্থ সংকট: ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দে খরচ বন্ধের নির্দেশ
সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কড়াকড়ি আরও বাড়ানো হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের পরিচালন বাজেটে থোক বরাদ্দের কোনো অর্থ ব্যয় না করার নির্দেশ দিয়েছে অর্থ বিভাগ। এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৫১১ কোটি টাকা। পাশাপাশি নতুন মোটরযান, জলযান ও আকাশযান কেনা বন্ধ রাখা, সরকারি অর্থে বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণে কড়াকড়ি এবং নতুন ভবন নির্মাণ ও ভূমি অধিগ্রহণে ব্যয় সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগের ৮ই জুলাই জারি করা পরিপত্রে বলা হয়েছে, সীমিত সম্পদের যথাযথ ব্যবহার, মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান, পাবলিক সেক্টর করপোরেশন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও এ নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে। পরিপত্র অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের পরিচালন বাজেটে থোক বরাদ্দের কোনো অর্থ ব্যয় করা যাবে না। একই সঙ্গে মোটরযান, জলযান ও আকাশযান কেনার জন্য রাখা ৭ হাজার ৪৪ কোটি টাকার বরাদ্দও স্থগিত করা হয়েছে। তবে ১০ বছরের বেশি পুরোনো যানবাহন প্রতিস্থাপন এবং নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় যানবাহন কেনার ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের অনুমোদন নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। নতুন বা প্রতিস্থাপিত জিপ ও কার কেনার ক্ষেত্রেও শর্ত দেওয়া হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স ও নিরাপত্তাকাজে ব্যবহৃত যানবাহন ছাড়া এসব যান পূর্ণ বৈদ্যুতিক হতে হবে। সরকারি অর্থে বিদেশে প্রশিক্ষণ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণও বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে বিদেশি সরকার, প্রতিষ্ঠান বা উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে আয়োজিত প্রশিক্ষণ এবং স্কলারশিপ ও ফেলোশিপের আওতায় বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে এ নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না। পরিচালন বাজেটের অর্থে নতুন আবাসিক, অনাবাসিক ও অন্যান্য ভবন নির্মাণও স্থগিত করা হয়েছে। চলমান কোনো নির্মাণকাজ ৭০ শতাংশের বেশি শেষ হয়ে থাকলে অর্থ বিভাগের অনুমোদন নিয়ে তা শেষ করা যাবে। ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রেও ব্যয় সীমিত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারের এমন ব্যয়সংকোচনের সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এল, যখন নতুন অর্থবছরের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অর্থমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যেও সরকারের আর্থিক চাপের বিষয়টি উঠে এসেছে। গত ১৬ আগস্ট বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতি কঠিন অবস্থার মধ্যে ছিল। তাঁর ভাষায়, ‘টাকা নাই তো নাই, এখন তো স্টার্ট করতে হচ্ছে মাইনাস থেকে।’ অর্থমন্ত্রী ওই সময় ব্যাংকিং খাত, শেয়ারবাজার ও সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংকটের কথাও উল্লেখ করেন। এর কয়েক দিনের ব্যবধানে সরকারি ব্যয়ের ওপর নতুন করে কড়াকড়ি আরোপের পরিপত্র জারি হওয়ায় বিষয়টি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। একদিকে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট, অন্যদিকে বরাদ্দ থাকা অর্থের একটি বড় অংশ ব্যয় না করার নির্দেশ—সরকারের রাজস্ব ও ব্যয় ব্যবস্থাপনার বাস্তব চাপ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কাও খুব স্বস্তিদায়ক নয়। গতকাল ২২শে আগস্ট ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিষয়ক এক সেমিনারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ‘ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে’। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নতুন কৌশল গ্রহণের পাশাপাশি বাজেট ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন তিনি। রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা নিয়েও সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নতুন অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থনীতিতে মন্থরতা, ব্যবসা-বাণিজ্যে চাপ এবং কর আদায়ের কাঠামোগত দুর্বলতার মধ্যে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কতটা সম্ভব হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, শুধু ব্যয় কমিয়ে সরকারের আর্থিক চাপ দীর্ঘমেয়াদে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর সঙ্গে উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগও প্রয়োজন। কারণ সরকারের অতিরিক্ত ঋণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। সরকারের কৃচ্ছ্রসাধনের সিদ্ধান্তকে তাই সরাসরি ‘অর্থকষ্টের প্রমাণ’ বলা হয়তো ঠিক হবে না। তবে ১ লাখ ২১ হাজার ৫১১ কোটি টাকার থোক বরাদ্দে ব্যয় বন্ধ, নতুন যানবাহন কেনা স্থগিত, বিদেশ সফর ও প্রশিক্ষণে কড়াকড়ি এবং নতুন ভবন নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা—সব মিলিয়ে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় যে সতর্কতা ও চাপ তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট। প্রশ্ন উঠছে, বাজেটের আকার বড় হলেও সরকারের হাতে বাস্তবে ব্যয় করার মতো অর্থের জোগান কতটা রয়েছে। অর্থমন্ত্রীর ভাষায় অর্থনীতি যখন ‘মাইনাস’ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর পর্যায়ে, তখন বড় বাজেটের পাশাপাশি ব্যয় সংকোচনের এসব সিদ্ধান্ত সেই বাস্তবতাকেই সামনে আনছে।

সর্বশেষ :

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি পিয়াল আটক   ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি পিয়াল আটক এবার অস্ট্রেলিয়ার কাছে ইনিংস ব্যবধানে বিধ্বস্ত বাংলাদেশ   এবার অস্ট্রেলিয়ার কাছে ইনিংস ব্যবধানে বিধ্বস্ত বাংলাদেশ রংপুরে শিক্ষক পরিবারের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিবৃতি প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের   রংপুরে শিক্ষক পরিবারের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিবৃতি প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের ঐতিহাসিক জয় থেকে শোচনীয় হার: অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে মুদ্রার দুই পিঠ দেখলো বাংলাদেশ   ঐতিহাসিক জয় থেকে শোচনীয় হার: অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে মুদ্রার দুই পিঠ দেখলো বাংলাদেশ তীব্র সংকটে কুড়িগ্রামে কৃষকবিদ্রোহ: গোডাউন ভেঙে নিল ১০ হাজার কেজি সার   তীব্র সংকটে কুড়িগ্রামে কৃষকবিদ্রোহ: গোডাউন ভেঙে নিল ১০ হাজার কেজি সার অর্থ সংকট: ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দে খরচ বন্ধের নির্দেশ   অর্থ সংকট: ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দে খরচ বন্ধের নির্দেশ গ্যাস সংকটে ক্রেতাদের উদ্বেগ, বাংলাদেশ থেকে কমতে পারে পোশাকের ক্রয়াদেশ   গ্যাস সংকটে ক্রেতাদের উদ্বেগ, বাংলাদেশ থেকে কমতে পারে পোশাকের ক্রয়াদেশ কোটচাঁদপুরে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে চাচাতো ভাইয়ের রামদার কোপে ভাই নিহত   কোটচাঁদপুরে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে চাচাতো ভাইয়ের রামদার কোপে ভাই নিহত