কী দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা ভারতকে, যা ভারত চিরকাল মনে রাখবে?


কী দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা ভারতকে, যা ভারত চিরকাল মনে রাখবে?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় এ প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত ও বিতর্কিত হয়ে উঠেছে। শেখ হাসিনার একটি বক্তব্যকে ঘিরে নানা রকম গুজব, অপব্যাখ্যা ও মিথ্যা ন্যারেটিভ তৈরি হয়েছে। অনেকেই দাবি করেন তিনি ভারতকে দেশের কোনো সম্পদ, ভূমি বা কৌশলগত সুবিধা দিয়ে দিয়েছেন। কোথাও কোথাও অত্যুক্তি হয়ে ভারতের হাতে বাংলাদেশকে তুলে দেয়া জাতীয় বয়ানের পর্যায়ে চলে গেছে। আর মানুষ সেটা দেদারসে গিলছেও…

ভারতীয় আগ্রাসনের বয়ান
শেখ হাসিনার “ভারতকে যা দিয়েছি, ভারত সেটা চিরকাল মনে রাখবে” উক্তিটি প্রচারিত হওয়ার পর থেকেই নানা অভিযোগ উঠেছে। কেউ বলেন তিনি ভারতকে বাংলাদেশের গ্যাস দিয়েছেন, কেউ বলেন সীমান্তের জমি বা করিডোর ছেড়ে দিয়েছেন, কেউ আবার দাবি করেন তিনি দেশের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়েছেন।

সোশ্যাল মিডিয়া ও কিছু রাজনৈতিক মহলে এসব গুজব এতটাই ছড়িয়েছে যে অনেকে মনে করেন হাসিনা ভারতকে কোনো বড় ধরনের বস্তুগত সম্পদ উপহার দিয়েছেন। এসব দাবির কোনোটিই তথ্য দ্বারা সমর্থিত নয়। উক্তিটির প্রকৃত অর্থ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ভারতের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ ছিল উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহী গ্রুপগুলো
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত কঠিন ছিল, কারণ এই অঞ্চল দিল্লি থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং মাত্র ২০-২২ কিলোমিটার প্রশস্ত সিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’-এর মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত; ফলে সৈন্য ও সরঞ্জাম পাঠানো, দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় রাখা লজিস্টিক্যালি অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়ত।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বাংলাদেশের সঙ্গে প্রায় ১৬০০-১৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ (মোট ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত প্রায় ৪০৯৬ কিমি) যা ছিল অরক্ষিত ও নদী-পাহাড়-জঙ্গলময় সীমান্ত, যার বড় অংশ দীর্ঘদিন অফেন্সড বা আংশিকভাবে সুরক্ষিত ছিল এবং নদীপথের পরিবর্তনশীলতা ও দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে পুরোপুরি নজরাদারি বা সুরক্ষিত করা সম্ভব হয়নি।

এই উন্মুক্ত সীমান্তকে কাজে লাগিয়ে ইউএলএফএ, এনএসসিএন, পিএলএ, এনডিএফবি, এটিটিএফসহ বিভিন্ন বিদ্রোহী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশক থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল, সিলেট, শেরপুর ও অন্যান্য সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রশিক্ষণ শিবির, অস্ত্র সংগ্রহ ও নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তোলে—ইউএলএফএ-র একাধিক ক্যাম্প ও নেতৃত্ব সেখানে বছরের পর বছর নির্বিঘ্নে অবস্থান করত।

দূরত্ব ও ভূপ্রকৃতির কারণে ভারতীয় সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান ধীরগতির ও ব্যয়বহুল হত, বিদ্রোহীরা সহজেই সীমান্ত পার হয়ে আত্মগোপন করত, অস্ত্র-অর্থের যোগান চলত নির্বিঘ্নে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জাতিগত সংযোগও এতে সহায়ক ভূমিকা রাখত; ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত কঠিন ও জটিল প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ হয়ে ওঠে বিচ্ছিন্নতাবাদিদের সেইফ রুট ও লজিস্টিক হাব
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিমি দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এ সীমান্তের বড় অংশ, প্রায় ১৬০০-১৮০০ কিমি সীমান্ত সেভেন সিস্টার্স নামে পরিচিত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সাথে যুক্ত। দীর্ঘদিন ধরে এ সীমান্ত ও বঙ্গোপসাগরের রুট ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো (ULFA, NLFT, ATTF, NDFBসহ আরও অনেক) বাংলাদেশকে নিরাপদ আশ্রয়, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও অস্ত্র চোরাচালানের পথ হিসেবে ব্যবহার করত।

বিশেষ করে বিএনপি আমলে (বিশেষত ২০০১-২০০৬) এ পরিস্থিতি আরও প্রকট হয়ে ওঠে। ভারতীয় বিদ্রোহীরা বাংলাদেশের মাটিতে ক্যাম্প স্থাপন করে, নেতারা ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে অবস্থান নেন এবং সীমান্ত পার হয়ে অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাচার করেন।

২০০৪ সালের চট্টগ্রাম অস্ত্র উদ্ধার এর জ্বলন্ত উদাহরণ, কতোগুলো ছোট ছোট চালান নির্বিঘ্নে পার হবার পরে হয়তো সৌভাগ্যক্রমে সবচেয়ে বড় চালানটা ধরা পড়ে। সেখানে ১০ ট্রাক অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার হয়, যা ULFAসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য যাচ্ছিলো বাংলাদেশের সীমান্ত আর সমুদ্রবন্দর ব্যাবহার করে।

অনুপ চেটিয়াসহ অনেক শীর্ষ নেতার বাংলাদেশে আসা-যাওয়া ও অবস্থান ছিল সুপরিচিত। এভাবে বাংলাদেশ একসময় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেইফ রুট ও লজিস্টিক হাব-এ পরিণত হয়েছিল।

সেইফ রুট ভেঙে দেয়ায় কোণঠাসা বিচ্ছিন্নতাবাদিরা
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। সরকার জিরো-টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে এবং ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেটওয়ার্ককে ধ্বংস করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেয়।

একে একে ধরা পড়েন বাংলাদেশে অবস্থানরত শীর্ষ নেতারা। ULFA-এর চেয়ারম্যান অরবিন্দ রাজখোয়া, সচিব শশাধর চৌধুরী, চিত্রবান হাজারিকাসহ একাধিক নেতাকে গ্রেপ্তার করে ভারতে হস্তান্তর করা হয়।

২০১৫ সালে অনুপ চেটিয়াকেও ভারতে পাঠানো হয়। বাংলাদেশের মাটিতে থাকা ক্যাম্পগুলো উচ্ছেদ করা হয়, নেটওয়ার্কগুলো ভেঙে ফেলা হয় এবং অস্ত্র চোরাচালানের রুট বন্ধ করা হয়।

এই কঠোর অবস্থানের প্রত্যক্ষ প্রভাব স্বীকার করেছেন ULFA নেতারা নিজেরাই। ২০২৩ সালে ভারত সরকারের সাথে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর ULFA-এর পররাষ্ট্র সচিব শশাধর চৌধুরী বলেছিলেন,

“শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর বাংলাদেশে পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে যায়। আওয়ামী লীগ সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে ভারতকে সাহায্য করতে হবে—১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ভারত তাদের সাহায্য করেছিল বলে। তারা ভারতীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সব ক্যাম্প সরিয়ে দেয়। আমাদের বিরুদ্ধে রেড কর্নার নোটিশ জারি হয় এবং বিমানবন্দরে আমাদের বড় আকারের ছবি টানিয়ে দেওয়া হয়।”

নিউজ সোর্সঃ ULFA-এর পররাষ্ট্র সচিব শশাধর চৌধুরী স্বীকারোক্তি
ULFA-এর সাধারণ সম্পাদক অনুপ চেটিয়া আরও স্পষ্ট করে বলেন,

“আমরা বুঝতে পারি যে বাংলাদেশ আর আমাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় নেই। কিন্তু আমাদের যাওয়ার জায়গাও ছিল না—২০০৩ সালেই ভুটান থেকে আমাদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমাদের নেতারা একের পর এক ধরা পড়ে জেলে যেতে থাকেন। আমরা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ি। আমাদের সামরিক প্রধান পারেশ বরুয়া অন্য দেশে ছিলেন। সেই পরিস্থিতিতে আমাদের আর কোনো উপায় ছিল না, আসামের নাগরিক সমাজের উদ্যোগে শুরু হওয়া শান্তি আলোচনায় সাড়া দিতে হয়েছিল।”

শেখ হাসিনার সরকারের এই কঠোর পদক্ষেপের ফলেই ULFAসহ অনেক বিদ্রোহী গোষ্ঠী দিশাহীন ও কোণঠাসা হয়ে পড়ে এবং ২০১১ সাল থেকে ভারত সরকারের সাথে শান্তি আলোচনার পথে যেতে বাধ্য হয়।

দীর্ঘ আলোচনার পর ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ULFA-এর প্রো-টকস গোষ্ঠী ভারত সরকার ও আসাম সরকারের সাথে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে, যা ৪৪ বছরের সশস্ত্র সংগ্রামের অবসান ঘটায়। এভাবে হাসিনার নিরাপত্তা নীতি শুধু বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আর বিদ্রোহী গোষ্ঠিগুলোর নেটওয়ার্ক ধ্বংসই করেনি, বরং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথও প্রশস্ত করেছে।

আসলে কী দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা ভারতকে?
শেখ হাসিনা ভারতকে দিয়েছিলেন সীমান্ত সুরক্ষা ও শান্তি। তিনি বাংলাদেশের মাটিকে ভারতবিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পূর্বের সেইফ রুট ও নেটওয়ার্ক ভেঙে দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছিলেন এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে শান্তি আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করেছিলেন।

এটি কোনো ভূমি, গ্যাস বা বস্তুগত সম্পদ হস্তান্তর ছিল না; বরং নিরাপত্তাগত সহযোগিতা, যা ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

সর্বশেষ :

সক্ষমতা, সাহস, সম্মান এবং শৈলী   সক্ষমতা, সাহস, সম্মান এবং শৈলী আবারও বাংলাদেশ ভ্রমণে উচ্চমাত্রার সতর্কতা জারি করল কানাডা   আবারও বাংলাদেশ ভ্রমণে উচ্চমাত্রার সতর্কতা জারি করল কানাডা আওয়ামী লীগ আমলের চুক্তি: ভারত থেকে আসছে নতুন প্রজন্মের রেলকোচের প্রথম চালান   আওয়ামী লীগ আমলের চুক্তি: ভারত থেকে আসছে নতুন প্রজন্মের রেলকোচের প্রথম চালান জিও-পলিটিক্যাল জটিল সমীকরণ এর কেন্দ্রবিন্দুতে বাংলাদেশের রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ   জিও-পলিটিক্যাল জটিল সমীকরণ এর কেন্দ্রবিন্দুতে বাংলাদেশের রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ চরম পর্যায়ে লোডশেডিং: ভোগান্তিতে বাড়ছে জনরোষ, নিরাপত্তা শঙ্কায় বিদ্যুৎকর্মীরা   চরম পর্যায়ে লোডশেডিং: ভোগান্তিতে বাড়ছে জনরোষ, নিরাপত্তা শঙ্কায় বিদ্যুৎকর্মীরা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তির অভিঘাত: বাংলাদেশ সরকারের কেনাকাটার সকল তথ্য দাখিলের চাপ   যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তির অভিঘাত: বাংলাদেশ সরকারের কেনাকাটার সকল তথ্য দাখিলের চাপ ৫০% চাঁদা না পেয়ে পুলিশের সামনেই ঠিকাদার ও সাংবাদিকের উপর কর্ণফুলী যুবদল নেতার হামলা   ৫০% চাঁদা না পেয়ে পুলিশের সামনেই ঠিকাদার ও সাংবাদিকের উপর কর্ণফুলী যুবদল নেতার হামলা একইসাথে বাসাবাড়ি ও শপিংমলে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না: রাত ৮টার পর বন্ধ মল-মার্কেট   একইসাথে বাসাবাড়ি ও শপিংমলে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না: রাত ৮টার পর বন্ধ মল-মার্কেট