‘টাকা খরচ হলেও যদি ছেলেদের ফিরে পেতাম’: ১২ দিনের ব্যবধানে হাম কেড়ে নিল মিরসরাইয়ের সেই যমজ ছেলেকে
অনলাইন নিউজ ডেক্স
‘সব হারিয়ে আমি এখন পথের ভিখারি। স্বজন, এনজিও—সবার কাছে হাত পেতেছি শুধু সন্তানদের বাঁচাতে। ৬ লাখ টাকা খরচ করলাম, নিজের নাওয়া-খাওয়া ভুললাম, তবু আমার বুক খালি হয়ে গেল।’ কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের পূর্ব খৈয়াছড়া এলাকার হারুনুর রশিদ।
হামের ভয়াল থাবায় মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে তাঁর এক বছর বয়সী ফুটফুটে দুই যমজ সন্তান—আবদুল্লাহ আল ফাহিম ও আবদুল্লাহ আল নোমান না ফেরার দেশে চলে গেছে। এক বুক শোক আর পাহাড়সম ঋণের বোঝা নিয়ে এখন দিশাহারা এই হতভাগ্য পিতা।
হারুনুর রশিদ পেশায় একজন ক্ষুদ্র মুদি দোকানদার। গত বছরের ১৬ই এপ্রিল তাঁর ঘর আলো করে এসেছিল যমজ দুই সন্তান। গত ৮ মার্চ বড় ছেলে ফাহিমের শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ১৮ই মার্চ তার শরীরে হাম শনাক্ত হয়। ফাহিম কিছুটা সুস্থ হতে না হতেই এপ্রিলের মাঝামাঝি ছোট ছেলে নোমানও হামে আক্রান্ত হয়।
শুরু হয় দুই সন্তানকে বাঁচানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা। কিন্তু গত ২২শে মে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় নোমান। বড় ভাই ফাহিমের অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হলে তাকে নেওয়া হয় ঢাকায়।
আইসিইউ সংকটে ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জের বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় তাকে। সেখানে লড়াই চালিয়ে অবশেষে গত মঙ্গলবার না ফেরার দেশে পাড়ি জমায় ফাহিমও। গতকাল বুধবার রাতে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
আজ ৪ঠা মে, বৃহস্পতিবার সকালে হারুনুর রশিদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক শোকাতুর পরিবেশ। মা ইসরাত জাহান নির্বাক পাথরের মতো বসে আছেন। হারুনুর রশিদ জানান, সন্তানদের বাঁচাতে গিয়ে গত তিন মাস তাঁর ছোট দোকানটি বন্ধ ছিল। চিকিৎসার খরচ মেটাতে এনজিও এবং পরিচিতদের কাছ থেকে প্রায় ৬ লাখ টাকা ঋণ করেছেন।
হারুনুর রশিদ আক্ষেপ করে বলেন, “টাকা খরচ হয়েছে হোক, যদি আমার ছেলেদের ফিরে পেতাম তবে কোনো আফসোস থাকত না। এখন আমি দেনার দায়ে জর্জরিত, আর আমার দুই বুকের ধন কবরে।”
প্রতিবেশী আলমগীর হোসেন বলেন, “বাচ্চা দুটি এত সুন্দর আর হাসিখুশি ছিল যে এলাকার সবাই তাদের কোল নিত। ১২ দিনের ব্যবধানে একই পরিবারের দুই শিশুর এমন চলে যাওয়া আমরা মেনে নিতে পারছি না।”
স্বাস্থ্যকর্মীরা ইতিমধ্যে হারুনুর রশিদের বাড়ি পরিদর্শন করে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তবে ৬ বছর বয়সী কন্যাসন্তানকে নিয়ে এই দম্পতি এখন কীভাবে এই বিশাল ঋণের বোঝা বইবেন আর সন্তানের শোক সামলাবেন, সেই প্রশ্নই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে পুরো মিরসরাইয়ে।
