নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার সুরক্ষিত করার তাগিদ
অনলাইন নিউজ ডেক্স
আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ। বিশ্বজুড়ে নারী অধিকার, সমতা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নতুন করে উচ্চারিত হয় এই দিনে। দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস ধারণ করা এই দিবস প্রতিবছর স্মরণ করিয়ে দেয়, নারীর অধিকার কেবল মানবিক দায় নয়; উন্নত ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের অপরিহার্য শর্ত।
এই দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সরকার শিক্ষা, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, রাজনীতিসহ সকল স্তরে নারীর সক্রিয় ও কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। তিনি বলেন, ‘নারীর আর্থসামাজিক ক্ষমতায়নে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা চালু করেছিলেন।
বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে এটি ছিল একটি বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত। একই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছে। আমাদের লক্ষ্য হলো, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা চালু করা, উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, মেয়েদের জন্য ফ্রি স্কুল ইউনিফর্ম, ডিজিটাল লার্নিং সুবিধা এবং আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা। সরকার নারীর নিরাপত্তা বিধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সাইবার বুলিং এবং অনলাইনে নারীর বিরুদ্ধে হয়রানি বন্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে।’
নারী দিবসের সূচনা উনিশ শতকের শ্রমজীবী নারীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ১৮৫৭ সালে নিউইয়র্কের সুতা কারখানার নারী শ্রমিকরা মজুরি বৈষম্য, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা এবং উন্নত কর্মপরিবেশের দাবিতে রাজপথে নেমেছিলেন। ১৯০৮ সালে প্রায় ১৫ হাজার নারীর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম নারী সম্মেলন। ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব ওঠে। ১৯১৪ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে দিবসটি পালিত হতে থাকে। পরে জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয় ‘অতীতের উদযাপন, ভবিষ্যৎ ঘিরে পরিকল্পনা’। এর পর থেকে প্রতিবছর ভিন্ন প্রতিপাদ্য নিয়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
এবারের প্রতিপাদ্য ‘আজকের পদক্ষেপ আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’। এই প্রতিপাদ্য স্মরণ করিয়ে দেয়, নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা, সমতা ও অধিকার নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সমান সুযোগ, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ও হয়রানি রোধ, বাল্যবিয়ে ও যৌতুকের মতো সামাজিক কুসংস্কার দূর করা–এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হতে পারে। একই সঙ্গে পরিবার ও সমাজে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। কারণ নিরাপত্তা, মর্যাদা, সমতা ও স্বাধীনতা– এই মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন টেকসই হয় না।
উচ্চ আদালতের আইনজীবী হাসনাত কাইয়ুম মনে করেন, সমাজে এক ধরনের সামগ্রিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। শুধু শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে অপরাধ কমানো যাবে– এমন ধারণা বিপজ্জনক। আইনের পাশাপাশি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন জরুরি। দীর্ঘদিনের শাসন-সংস্কৃতি নৃশংসতাকে স্বাভাবিক করে তুলছে। তাই পরিবর্তন আনতে হবে মানুষের মানসিক গঠনেও।
কন্যাশিশু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখনও অনেক পরিবার কন্যাকে বোঝা মনে করে। অথচ কন্যাশিশুকে আশীর্বাদ হিসেবে বড় করে তুললে বঞ্চনার বদলে মমতা ও দায়িত্ববোধ তৈরি হবে। সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক ক্ষেত্রে কন্যাশিশুকে ইতিবাচক বৈষম্যের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষা ও চিকিৎসায় বিশেষ সুযোগ নিশ্চিত করলে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে পারে। সংবিধানে সমতা বলা হলেও পারিবারিক আইন ও সম্পত্তির মালিকানায় এখনও বৈষম্য রয়ে গেছে।
নারী অধিকারকর্মী ও আইনজীবী কামরুন নাহার মনে করেন, এবারের প্রতিপাদ্য সময়োপযোগী। তাঁর ভাষায়, শুধু রাষ্ট্র নয়; পরিবার ও সমাজ– সবাইকে নারী ও কন্যাশিশুর সুরক্ষায় দায়িত্ব নিতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জান্নাতুল ফেরদৌস জান্নাত ‘আগামীর ন্যায়বিচার’ ধারণাটিকে একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে দেখেন। এটি শুধু আইনি ন্যায়বিচার নয়; সামাজিক মর্যাদা, বৈষম্যহীনতা, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং সম্পত্তির অধিকারের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
