নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করুন


নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করুন
অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিকল্পনাহীনতা ও দায়িত্বহীনতার অনিবার্য পরিণতি কী হইতে পারে; যশোরের অভয়নগর উপজেলার চেঙ্গুটিয়া গ্রামের দুই শতাধিক পরিবার জলাবদ্ধতায় মানবেতর জীবনযাপনের মধ্য দিয়া উহার প্রমাণ দিয়া যাইতেছে। সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনমতে, ঐ উপজেলার প্রেমবাগ ইউনিয়নে পাঁচ শতাধিক একর জমিতে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা, ইপিজেড নির্মাণ করিতে গিয়া স্থানীয় বিল ও সংলগ্ন নালা ভরাট করা হইয়াছে। ইহাতেই ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হইয়াছে। আমরা জানিতে পারিয়াছি, অত্র এলাকায় আরও যেই সকল ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান রহিয়াছে, সেইগুলিতে সুষ্ঠু পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা অনুপস্থিত। ঐ অঞ্চলের ভবদহে জলাবদ্ধতার কথা আমরা জানি; গত পাঁচ দশকের অধিক সময়েও সেই সংকট নিরসন হয় নাই। উপরন্তু বর্ষাকালে বৃদ্ধি পায়। তবে অভয়নগরের চেঙ্গুটিয়ায় পূর্বে জলাবদ্ধতা ছিল না বলিয়া দাবি করিয়াছেন গ্রামটির বাসিন্দারা। তাহাদের বক্তব্য, বৃহৎ একখানি নালা দিয়া চেঙ্গুটিয়াসহ পার্শ্ববর্তী কয়েকটি গ্রামের পানি নামিয়া যাইত। কিন্তু ইপিজেড নির্মাণের জন্য বালি ভরাট করা হইয়াছে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না রাখিয়াই। ইহাতে সূচিত সংকট এমন রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে, চেঙ্গুটিয়া গ্রামের দুই শতাধিক বাড়িতে হাঁটু অবধি, এমনকি কোমরপানি জমিয়াছে। গৃহে পানি, সড়কে পানি, বিশুদ্ধ পানির সংকট, ভাঙিয়া পড়িয়াছে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও। বৃদ্ধি পাইতেছে পানিবাহিত রোগ। সাকল্যে চেঙ্গুটিয়া গ্রামের স্বাভাবিক জীবন কার্যত স্থবির। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার আলোচনা নূতন নহে। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে যদি পানি ব্যবস্থাপনা ও নগর পরিকল্পনায় সেই বাস্তবতা প্রতিফলিত না হয়, তাহা হইলে দুর্যোগ বারংবার ফিরিয়া আসিবে, সন্দেহ কি? জলাবদ্ধতাকে অবশ্য নিছক জলবায়ু পরিবর্তনের দোহাই দিয়া পার পাওয়া যাইবে না; উহা দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনারই বহিঃপ্রকাশ। পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ দখল ও ভরাট, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ, নিয়মিত খাল-নালা সংস্কারের অভাব এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির সমন্বয়হীনতাই বৎসরের পর বৎসর সমস্যাকে জিয়াইয়া রাখিয়াছে। নিছক নালা ভরাট নহে; ঐ অঞ্চলের নদী ব্যবস্থাপনার অবনতিও জলাবদ্ধতার কারণ। অভয়নগরেরই নওয়াপাড়া শহরের পার্শ্ব দিয়া প্রবাহিত হইতেছে ভৈরব নদ। উহার সহিত রেলপথ ও মহাসড়কের যোগাযোগ সুবিধার কারণে অত্র অঞ্চল গড়িয়া উঠিয়াছে ব্যবসাকেন্দ্র হিসাবে। যেই নদ ঘিরিয়া এত আয়োজন সেই ভৈরব ধুঁকিতেছে দখল ও ভরাটে সরু হইয়া। তৎসহিত ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের দাবির পরও দখলমুক্ত হইতেছে না। যখন বারংবার অপসারণের কথা বলা হইতেছে, সেইখানে আরও অপরিকল্পিতভাবে সিদ্ধান্ত হইয়াছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের। বর্ষাকাল আসিলেই এইখানে শুরু হয় জলাবদ্ধতা। কিন্তু মৌসুম আসিলেই অস্থায়ী উদ্যোগ; পানি নামিলেই নীরবতা– এই যেন দুষ্টচক্রে পরিণত। কিন্তু নাগরিক দুর্ভোগ কখনোই মৌসুমি বিষয় হইতে পারে না। এতদঞ্চলের জলাবদ্ধতা দূর করিতে হইলে সকল নদী ও নালা দখলমুক্ত করিতেই হইবে। এমনভাবে নদী খনন করিতে হইবে, যাহাতে পানি দ্রুত নামিয়া যায়। চেঙ্গুটিয়া গ্রামের জলাবদ্ধতা দূর করিতে হইলেও ঐ এলাকায় প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করিতে হইবে। স্মরণ রাখিতে হইবে, দেশের উন্নয়নের প্রকৃত পরিচয় বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণে নহে; সাধারণ মানুষের জীবন কতখানি নিরাপদ ও বাসযোগ্য, তাহার মধ্যেই নিহিত। দুই শতাধিক পরিবারের পানিবন্দি জীবন আমাদের স্মরণ করাইয়া দেয়, পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত উন্নয়ন নহে। ইহাই এখন সুশাসন, জবাবদিহি, টেকসই উন্নয়নের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইবার গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।