বাংলাদেশের রপ্তানি-কনটেইনার বুকিং কমিয়ে ফ্রেইট রেট বাড়াল শিপিং কোম্পানি: লিড টাইম ও ব্যয় বাড়ল দ্বিগুণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স
বাংলাদেশ থেকে রপ্তানিমুখী কনটেইনারের বুকিং উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো। এর ফলে রপ্তানিকারক, বায়িং হাউস এবং ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারদের মধ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে কনটেইনার সংকটের কারণে পণ্য পাঠানোর সময় বেড়েছে এবং সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যয়ও কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে কনটেইনার বুকিং পাওয়া গেলেও ক্রয়াদেশ থেকে পণ্য গন্তব্যে পৌঁছানোর সময় (লিড টাইম) দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত বেড়েছে।
পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রগামী একটি কনটেইনারের ফ্রেইট রেট এক মাস আগের প্রায় ৪ হাজার ৫০০ ডলার থেকে বেড়ে ১১ হাজার ডলারেরও বেশি হয়েছে।
রপ্তানিকারক ও ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারদের অভিযোগ, মেইনলাইন অপারেটর (এমএলও) হিসেবে পরিচিত আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো কৃত্রিমভাবে কনটেইনারের জায়গার সংকট তৈরি করে ফ্রেইট রেট বাড়াচ্ছে।
তবে শিপিং কোম্পানিগুলোর দাবি, মধ্যপ্রাচ্য ও লোহিত সাগর অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা, কিছু নৌপথে জটিলতা এবং চীন থেকে অতিরিক্ত বুকিংয়ের কারণে সাময়িকভাবে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলেছেন, সংকট দীর্ঘায়িত হলে অনেক রপ্তানিকারক বাধ্য হয়ে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে পারেন। এতে পরিবহন ব্যয় আরও বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত দেশের রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ডিডিপি রপ্তানিকারকদের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ডেলিভারড ডিউটি পেইড (ডিডিপি) পদ্ধতিতে পণ্য রপ্তানিকারকরা। এ পদ্ধতিতে বিদেশি ক্রেতার গুদাম পর্যন্ত পণ্য পৌঁছানোর পুরো পরিবহন ব্যয় রপ্তানিকারককেই বহন করতে হয়।
অন্যদিকে ফ্রি অন বোর্ড (এফওবি) পদ্ধতিতে সমুদ্রপথের পরিবহন ব্যয় বহন করেন বিদেশি ক্রেতারা।
ডিডিপি পদ্ধতিতে রপ্তানি করা স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রগামী কনটেইনার বুকিং পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে বুকিং নিশ্চিত করতে হচ্ছে।
এতে সময়মতো পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ক্রয়াদেশ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।
কয়েক সপ্তাহেই দ্বিগুণের বেশি পরিবহন ব্যয়
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বায়িং হাউস লিয়াং ফ্যাশনের ঢাকা কার্যালয় দুই সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রগামী ১০টি কনটেইনারের বুকিং নিশ্চিত করার চেষ্টা করেও সফল হয়নি। পরে বাধ্য হয়ে অনেক বেশি ভাড়ায় বুকিং করতে হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা জানান, এক মাস আগেও নিউইয়র্কগামী একটি কনটেইনার পরিবহনে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার ডলার খরচ হলেও বর্তমানে একই কনটেইনারে প্রায় ১১ হাজার ৪০০ ডলার গুনতে হচ্ছে।
একই সঙ্গে পণ্য পৌঁছাতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ অতিরিক্ত সময় লাগছে।
অন্যদিকে কনভেয়ার লজিস্টিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কবির আহমেদ জানান, জার্মানির হামবুর্গগামী একটি কনটেইনারের ভাড়া এক মাসে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ডলার থেকে বেড়ে ৬ হাজার ডলারে পৌঁছেছে।
কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ
রপ্তানিকারক ও লজিস্টিকস খাতের কয়েকজন প্রতিনিধি অভিযোগ করেছেন, শিপিং কোম্পানিগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে বুকিং সীমিত করে ভাড়া বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে।
তাদের দাবি, বেশি লাভজনক হওয়ায় বর্তমানে চীন থেকে বেশি কনটেইনার পরিবহনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের জন্য বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তারা জানান, বাংলাদেশ থেকে সরাসরি বড় জাহাজে (মাদার ভেসেল) অধিকাংশ পণ্য পরিবহন করা হয় না। চট্টগ্রাম থেকে ছোট জাহাজে (ফিডার ভেসেল) কনটেইনার শ্রীলঙ্কার কলম্বো, মালয়েশিয়ার পোর্ট ক্লাং কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরে নেওয়া হয়। সেখান থেকে বড় জাহাজে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়।
এসব হাবে চীনের কনটেইনারের চাপ বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের জন্য জায়গা সংকুচিত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
অভিযোগ অস্বীকার শিপিং কোম্পানির
অভিযোগ অস্বীকার করে এমএলও প্রতিনিধিরা বলছেন, এটি কৃত্রিম সংকট নয়। এমএসসির এক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ থেকে বুকিং কিছুটা কমানো হলেও তা খুব বেশি নয়।
তার মতে, মধ্যপ্রাচ্য ও লোহিত সাগর অঞ্চলের সংঘাত এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাতের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশই একই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, চীন থেকে সরাসরি বড় জাহাজে পণ্য পরিবহন সম্ভব হওয়ায় সেখানে পরিচালন ব্যয় কম এবং বাণিজ্যিকভাবে বেশি লাভজনক। ফলে ওই রুটে তুলনামূলক বেশি সক্ষমতা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।
হ্যাপাগ-লয়েডের বাংলাদেশ কার্যালয়ের এক কর্মকর্তাও জানান, জাহাজে জায়গার সংকটের কারণেই বর্তমানে ফ্রেইট রেট বৃদ্ধি পেয়েছে।
সামনে আরও বাড়তে পারে চাপ
খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, আগামী কয়েক মাসে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
তাদের মতে, বর্তমানে ডিডিপি রপ্তানিকারকেরা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পরিবহন ব্যয় বাড়ার প্রভাব শেষ পর্যন্ত এফওবি ভিত্তিক রপ্তানিকারকদের ওপরও পড়বে।
তারা বলছেন, যদি এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং পরিবহন ব্যয় স্বাভাবিক পর্যায়ে না ফেরে, তাহলে বিদেশি ক্রেতারা বাড়তি খরচ ও দীর্ঘ সরবরাহ সময় এড়াতে বাংলাদেশ থেকে ক্রয়াদেশ কমিয়ে প্রতিযোগী দেশগুলোর দিকে ঝুঁকতে পারেন।
এতে দেশের রপ্তানি আয় ও বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
