বাংলাদেশে হঠাৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ কমাল ভারত


বাংলাদেশে হঠাৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ কমাল ভারত
হঠাৎ করে গত কয়েক দিন ধরে ভারত থেকে ৪২৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ কমানো হয়েছে। একই সঙ্গে আদানি গ্রুপের ১৬০০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট মেরামতের জন্য বন্ধ। অন্যদিকে অর্থাভাবে পর্যাপ্ত ফার্নেস অয়েল মজুত নেই। এ পরিস্থিতিতে ভারত থেকে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার প্রভাব পড়েছে সারা দেশে। শীতে সারা দেশে বৃহস্পতিবার সান্ধ্যকালীন পিক আওয়ারে লোডশেডিং হচ্ছে ২০০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াট। বিশেষ কারণে লোডশেডিং থেকে রাজধানী ঢাকাকে মুক্ত রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আদানি গ্রুপের ১৬০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্রের মধ্যে ৮০০ মেগাওয়াটের প্রথম ইউনিটটি রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য ১৬ জানুয়ারি থেকে বন্ধ আছে। এর মধ্যে গত ৪ দিন ধরে ভারত থেকে বেসরকারিভাবে আমদানিকৃত ৯০০ মেগাওয়াট থেকে কাটছাঁট করে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৪৭৩ মেগাওয়াট। এ কারণে হঠাৎ করেই বিদ্যুৎ সংকট বেড়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সদস্য (উৎপাদন) মো. জহিরুল ইসলাম বুধবার বলেন, যান্ত্রিক সমস্যা থাকলে ভারত বাংলাদেশে বিদ্যুতের রপ্তানি কমিয়ে দেয়। এখন সেই কারণে হয়তো বিদ্যুৎ সরবরাহ ভারত থেকে কমেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বুধবার বলেন, ভারত কেন বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে তা তার জানা নেই। খবর নিয়ে দেখছি। এখন মাঘ মাস চলছে। এখনই বিদ্যুৎ সরবরাহ দিতে হিমশিম খাচ্ছে পিডিবি। সান্ধ্যকালীন পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা আছে ১১ হাজার ৯০০ মেগাওয়াটের মতো। কিন্তু সর্বোচ্চ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে ১১ হাজার থেকে ১১ হাজার ৬০০ থেকে ১১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। এজন্য আসন্ন গরমকালে চাহিদা মাফিক বিদ্যুৎ সরবরাহ করা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। এবারের গরম মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা ১৭ থেকে ১৮ হাজার মেগাওয়াট হতে পারে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে সস্তার বিদ্যুৎ হচ্ছে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ। দেশের ৫০টি গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রে উৎপাদন করা যায় ১২ হাজার ৯২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। কিন্তু চাহিদার অর্ধেক গ্যাসও সরবরাহ দিতে পারে না পেট্রোবাংলা। তাই উৎপাদন হচ্ছে ৪ হাজার মেগাওয়াটের মতো। এর মধ্যে মঙ্গলবার চট্টগ্রামের মদুনাঘাট-করের হাট গ্রিড লাইন ট্রিপ করে। এতে করে বন্ধ হয়ে যায় এস আলম গ্রুপের কয়লাভিত্তিক ১৩২০ মেগাওয়াটের এসএস পাওয়ারের একটি ইউনিট। এসএস পাওয়ারের চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার মোহাম্মদ এমদাদ হোসেন বলেন, গ্রিড লাইন ট্রিপ করার কারণে ৬৬০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বুধবার রাতে ওই ইউনিটটি পুনরায় চালু হয়েছে এবং বৃহস্পতিবার থেকে এসএস পাওয়ার ১২০০ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। পিডিবি জানায়, এসএস পাওয়ারের ৬৬০ মেগাওয়াটের ইউনিটটি চালু হওয়ার পর বৃহস্পতিবার থেকে লোডশেডিং কমে এসেছে। সরকারি কর্মকর্তারা জানান, এই সময়ে সাধারণত সান্ধ্যকালীন পিক আওয়ারে ফার্নেস অয়েল বা তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মাত্র ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। কিন্তু সোমবার থেকে বুধবার পর্যন্ত তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি। তবে এসএস পাওয়ারের বন্ধ ইউনিট চালুর পর তেলভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন কমানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টা তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে ১ হাজার ৪৮৫ মেগাওয়াট। পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, তেলের মজুত কম। তাছাড়া তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য পড়ে ২২ থেকে ২৪ টাকা। কিন্তু পিডিবি বিক্রি করে প্রতি ইউনিট মাত্র ৬ টাকা ৬৫ পয়সা। যার কারণে তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ালে সরকারের লোকসানের পরিমাণ বেড়ে যায়। গত অর্থবছরে পিডিবি সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বিদ্যুৎ কিনে লোকসান দিয়েছে ৫৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে মাত্র ৩৮ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৭ হাজার কোটি টাকার লোকসান পিডিবির ঘাড়ে রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ সময়ে তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ালে গরমের মৌসুমে ব্যাপক লোডশেডিং হবে। কারণ তখন তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে ভর্তুকি বা টাকা বরাদ্দ সরকারের কাছ থেকে নাও পাওয়া যেতে পারে। এদিকে ভারতের একটি ট্রান্সফরমারে সমস্যার কারণে হঠাৎ করে ভারত থেকে গত ৩ দিন ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমানো হয়েছে। ভারতের সরকারি-বেসরকারি ৩টি প্রতিষ্ঠান ভেড়ামারা দিয়ে বিদ্যুৎ রপ্তানি করে ৯০০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে রোববার থেকে আসছে ৪৭৩ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টরা জানান, ভারতের এ ৯০০ মেগাওয়াটের মধ্যে সেমকন ৪২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে ভেড়ামারা দিয়ে। তাদের একটি কেন্দ্রের ট্রান্সফরমারে সমস্যা হয়েছে। সেটি ঠিক করে ২৬ জানুয়ারির পর সেমকন পুরোদমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে। ভারত এবং বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে জি টু জি চুক্তি এবং উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বেসরকারি কোম্পানির কাছ থেকে ওই ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ভেড়ামারা দিয়ে আমদানি করছে পিডিবি। সেই বিদ্যুতের গড়মূল্য প্রতি ইউনিট সাড়ে ৮ টাকার মতো। এই ৯০০ মেগাওয়াট ছাড়াও ত্রিপুরা দিয়ে আরও ১১৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করে পিডিবি। তবে সেই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা নিয়ে কোনো ঘাটতি এখন পর্যন্ত হচ্ছে না। এর বাইরে আদানি গ্রুপের ঝাড়খণ্ডের কেন্দ্র থেকে ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কিনছে পিডিবি। সব মিলিয়ে ভারত থেকে সরকার বিদ্যুৎ আমদানি করে প্রায় ২৮০০ মেগাওয়াট। জানা গেছে, পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী বাৎসরিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য গত ১৫ জানুয়ারি থেকে আদানির ৮০০ মেগাওয়াটের প্রথম ইউনিট বন্ধ আছে। এটি চালু হবে আগামী মাসের ৯ তারিখ। এটি সময়মতো চালু হলে এবং ঠিকঠাক সরবরাহ নিশ্চিত করলে সংকটের সুরাহা হতে পারে।