সরকারি সিদ্ধান্তে নিজের মতামতের গুরুত্ব নেই মনে করে ৭৩% মানুষ


সরকারি সিদ্ধান্তে নিজের মতামতের গুরুত্ব নেই মনে করে ৭৩% মানুষ
সংবিধানে বলা আছে—প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। এই ঘোষণাই বাংলাদেশের রাষ্ট্রদর্শনের ভিত্তি। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রক্রিয়ায় সেই ক্ষমতার কোনো দৃশ্যমান প্রতিফলন নেই। দেশের অধিকাংশ জনগণ মনে করে, রাষ্ট্র বা সরকার পরিচালনায় তাদের মতামত তেমন গুরুত্ব বহন করে না। একইভাবে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো সবসময় নিজেদের জনগণের প্রতিনিধি দাবি করলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশের অধিকাংশ মানুষের মতে, রাজনীতিতে তাদের কোনো প্রভাব নেই। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ বাস্তবতা শুধু রাজনৈতিক অনাগ্রহের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি গভীর সংকট। খোদ সরকারি এক জরিপে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভেতরে জমে ওঠা এই গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি উঠে এসেছে। ‘সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে’ বা নাগরিক অভিমত জরিপ প্রতিবেদনটি সম্প্রতি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। জরিপের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের মাত্র এক-চতুর্থাংশ মানুষ মনে করেন, তারা সরকারি সিদ্ধান্ত বা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব রাখতে পারেন। বিপরীতে, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের বিশ্বাস—রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে তাদের কোনো প্রভাব নেই বা তাদের কথা শোনা হয় না। জরিপের তথ্য বলছে, জাতীয় পর্যায়ে মাত্র ২৭ দশমিক ২৪ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন, তারা সরকারি কার্যক্রম সম্পর্কে অন্তত কিছুটা হলেও নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারেন। বিপরীতে প্রায় ৭৩ শতাংশ নাগরিক মনে করেন, সরকারি সিদ্ধান্তে তাদের কথা গুরুত্ব পায় না বা তাদের কথা আদৌ সরকারের কাছে পৌঁছায় না। অর্থাৎ দেশের অধিকাংশ জনগণের মতামত ছাড়াই রাষ্ট্র বা সরকারি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নে চিত্র আরও হতাশাজনক। মাত্র ২১ দশমিক ৯৯ শতাংশ মানুষ মনে করেন, তারা দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কোনো না কোনো প্রভাব রাখতে পারেন। বিপরীতে, ৫৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ নাগরিক স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন—রাজনীতিতে তাদের কোনো প্রভাবই নেই। মাত্র ৯ শতাংশের একটু বেশি জনগণ মনে করেন, তারা রাজনীতিতে ভালো প্রভাব রাখতে পারেন। অর্থাৎ দেশের অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, রাজনীতিতে তাদের কোনো প্রভাব নেই। বিশ্লেষকদের মতে, এটি বাহ্যিক রাজনৈতিক কার্যকারিতার ভয়াবহ সংকট—যেখানে জনগণ বিশ্বাসই করে না রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় বা তারা রাজনীতিতে প্রভাব রাখতে পারেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রের মালিক জনগণ শুধু ভোট দেওয়ার উপাদান হিসেবেই গণ্য হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হলেও বাস্তবে জনমত উপেক্ষার কারণে গণতন্ত্র গভীর সংকটে পড়েছে। জরিপের তথ্যানুযায়ী, দেশের বড় অংশের মানুষ মনে করেন, সরকার পরিচালনা ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাদের কোনো মতামত বা প্রভাব নেই, যা গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনাবিরোধী। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মোড়কে জনগণের সঙ্গে এক ধরনের ক্রমাগত ফাঁকি চলছে। এ ফাঁকি দেওয়ার কারণেই জনগণের অংশগ্রহণ ক্রমে কমে যাচ্ছে, গণতন্ত্র পড়ছে ধারাবাহিক সংকটে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যে উত্তরণের কথা বলা হয়, তা সবসময়ই অধরাই থেকে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো মুখে জনগণের শাসনের কথা বললেও বাস্তবে দলীয় ও ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। ড. তৌহিদুল হকের মতে, ভোটের আগে জনগণ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলেও ভোট শেষ হলে ভোটারের আর কোনো মূল্য থাকে না—এটাই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বাস্তবতা। জনগণকে শুধু ভোটের উপাদান হিসেবে দেখার এ প্রবণতা এক ধরনের ‘গণতান্ত্রিক প্রতারণা’। গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে রাজনৈতিক দল ও জনগণ—উভয়পক্ষের মধ্যেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও চর্চার ঘাটতি দূর করা জরুরি, নইলে গণতন্ত্রের নামে জনগণের সঙ্গে এ ফাঁকি চলতেই থাকবে। গ্রাম থেকে শহর—হতাশা সর্বত্রই: সরকারি কর্মকাণ্ডের প্রতি আস্থাহীনতা সারা দেশে সমানভাবে ছড়িয়ে থাকলেও কিছু অঞ্চলে এর তীব্রতা আরও বেশি। জরিপের আঞ্চলিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বরিশাল ও রংপুর বিভাগের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মনে করেন, তারা সরকারি সিদ্ধান্তে মতামত দিতে বা প্রভাব রাখতে পারেন। বিপরীতে, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগে এ হার সবচেয়ে কম, যেখানে পাঁচজনের একজনও নিজের প্রভাব নিয়ে নিশ্চিত নন। শহর ও গ্রামের মধ্যে পার্থক্য খুব বেশি না হলেও সামগ্রিকভাবে উভয় এলাকার মানুষই রাষ্ট্রের সাড়া পাওয়ার বিষয়ে প্রায় সমানভাবে হতাশ। সবচেয়ে প্রকট বৈষম্য দেখা যায় লিঙ্গভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে। যেখানে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পুরুষ মনে করেন তারা সরকারি কর্মকাণ্ডে মতামত দিতে বা রাজনীতিতে প্রভাব রাখতে পারেন, সেখানে নারীদের ক্ষেত্রে এ হার নেমে আসে প্রায় এক-চতুর্থাংশে। রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নে ব্যবধান আরও গভীর। পুরুষদের ২৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ নিজেদের প্রভাবশালী মনে করলেও নারীদের মধ্যে এ হার মাত্র ১৭ দশমিক ৮১ শতাংশ। এ পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে—নারীরা এখনো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও রাজনীতিতে নিজেদের ‘বাইরের মানুষ’ হিসেবেই দেখছেন। দীর্ঘদিন ধরে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে যে রাজনৈতিক বক্তব্য, পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, বাস্তবে তার প্রতিফলন কতটা ঘটেছে, তা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলেছে জরিপে এই তথ্য। জরিপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—রাজনৈতিক কার্যকারিতার সঙ্গে শিক্ষা ও আর্থিক অবস্থার সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া গেছে। যাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তাদের মধ্যে মাত্র ২৩ দশমিক ২২ শতাংশ মানুষ মনে করেন, তারা সরকারি কর্মকাণ্ডে মতামত দিতে পারেন। রাজনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্রে এ হার আরও কমে ১৮ শতাংশের কাছাকাছি। অন্যদিকে, উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে ৩৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ মনে করেন সরকারি কর্মকাণ্ডে তারা মতামত দিতে সক্ষম, যা রাজনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্রে ২৯ শতাংশের বেশি। আয়ের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। যেখানে দরিদ্রতম শ্রেণির মাত্র ২০-২১ শতাংশ মানুষ নিজেদের প্রভাবশালী মনে করেন, সেখানে ধনীতম শ্রেণিতে এ হার বেড়ে ২৭-৩০ শতাংশে পৌঁছায়। বিশ্লেষকদের মতে, এর অর্থ স্পষ্ট—বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্রমেই একটি শ্রেণিভিত্তিক সম্পদে পরিণত হচ্ছে, যেখানে দরিদ্র ও কম শিক্ষিত জনগোষ্ঠী কার্যত ক্ষমতাহীন। সংখ্যালঘু ও নৃগোষ্ঠীতে ব্যতিক্রমী চিত্র: জরিপে একটি ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা গেছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাব রাখার অনুভূতি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর চেয়ে উল্লেখযোগ্যহারে বেশি। জরিপের তথ্য বলছে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ৩৯ শতাংশের বেশি মানুষ মনে করেন তারা সরকারি সিদ্ধান্তে মতামত দিতে এবং রাজনীতিতে প্রভাব রাখতে পারেন, যেখানে জাতীয় পর্যায়ে এই হার মাত্র ২৪ শতাংশ। একইভাবে বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর মধ্যে এ হার ৩৮ শতাংশের বেশি। ড. তৌহিদুল হকের মতে, সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকার পেছনে দুটি কারণ কাজ করছে। একদিকে তাদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সংযোগ তুলনামূলকভাবে সরাসরি ও অংশগ্রহণমূলক হওয়ায় তারা সিদ্ধান্ত ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে বেশি সচেতন থাকে। অন্যদিকে, সংখ্যালঘু ও নৃগোষ্ঠীর বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে সংবেদনশীল হওয়ায় বৈশ্বিক চাপের মুখে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রতি বাড়তি গুরুত্ব দেয়। ফলে রাজনৈতিক কৌশল ও আন্তর্জাতিক বিবেচনাই তাদের মতামত গ্রহণের হার বাড়িয়েছে। বিবিএস জানিয়েছে, নাগরিক অভিমত জরিপের রাজনৈতিক কার্যকারিতা বিষয়ক অধ্যায়ে দেশের জনগণের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করার ধারণা এবং সরকারের নীতিনির্ধারণ ও পরিকল্পনায় তাদের অংশগ্রহণের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। জরিপের ফলে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ স্থান, আয় ও শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল। এসব বৈষম্য দূর করতে এবং গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তি জোরদারে লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ জরুরি।

সর্বশেষ :

ফেনীতে মাটিলুট ও চাঁদাবাজির জেরে যুবদল-ছাত্রদলের দুপক্ষের সংঘর্ষে নিহত ১   ফেনীতে মাটিলুট ও চাঁদাবাজির জেরে যুবদল-ছাত্রদলের দুপক্ষের সংঘর্ষে নিহত ১ মূল্যবান জিনিস থানায় জমা রেখে ঈদযাত্রার অভিনব পরামর্শ ডিএমপির   মূল্যবান জিনিস থানায় জমা রেখে ঈদযাত্রার অভিনব পরামর্শ ডিএমপির মিসাইল আতঙ্ক, কাছে গিয়েও হরমুজ পেরোতে পারেনি বাংলাদেশি জাহাজ   মিসাইল আতঙ্ক, কাছে গিয়েও হরমুজ পেরোতে পারেনি বাংলাদেশি জাহাজ একমাসের ব্যবধানে মাদকসহ আটকের পর এবার চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার ছাত্রদলের আহ্বায়ক   একমাসের ব্যবধানে মাদকসহ আটকের পর এবার চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার ছাত্রদলের আহ্বায়ক মডেল মেঘনার দাবি: মির্জা আব্বাসের অসুস্থতার পেছনে দায়ী ‘ডার্বি নাসির’   মডেল মেঘনার দাবি: মির্জা আব্বাসের অসুস্থতার পেছনে দায়ী ‘ডার্বি নাসির’ শেখ হাসিনার খাদ্য ব্যবস্থাপনা: ইউনূসের পর বিএনপি সরকারও চাহিদা মেটাচ্ছে সেই মজুদে   শেখ হাসিনার খাদ্য ব্যবস্থাপনা: ইউনূসের পর বিএনপি সরকারও চাহিদা মেটাচ্ছে সেই মজুদে ভারতের সরবরাহকৃত তেলে মজুদ পর্যাপ্ত, জ্বালানি তেলের রেশনিং প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত   ভারতের সরবরাহকৃত তেলে মজুদ পর্যাপ্ত, জ্বালানি তেলের রেশনিং প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ কেনায় ৪৮৬ কোটি টাকার আর্থিক অসঙ্গতি   অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ কেনায় ৪৮৬ কোটি টাকার আর্থিক অসঙ্গতি