নির্বাচন ঘিরে সংঘাত সহিংসতার আশঙ্কা


নির্বাচন ঘিরে সংঘাত সহিংসতার আশঙ্কা
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সারা দেশে বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচার। এ প্রচার কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের শঙ্কা-সামনের দিনগুলোতে ব্যাপক সংঘাত-সহিংসতা হতে পারে। এতে ব্যবহার করা হতে পারে ইতোপূর্বে লুণ্ঠিত হওয়া পুলিশের অস্ত্র। এছাড়া বাড়বে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচনকেন্দ্রিক যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে প্রস্তুত রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে দেড় লাখের বেশি পুলিশ সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। যোগাযোগ বাড়ানো হয়েছে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে। ইতোমধ্যেই ড্রোন ব্যবহার শুরু করেছে পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা। এদিকে নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মাঠ পুলিশকে কড়া বার্তা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ও আইজিপি বাহারুল আলম। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আনুষ্ঠানিক প্রচারণার প্রথম দিন বৃহস্পতিবার পৃথক অভিযানে অস্ত্র-গুলিসহ এক অস্ত্র ব্যবসায়ীসহ দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রাজধানীর শ্যামপুর থেকে দুটি অবৈধ পিস্তল, চারটি ম্যাগাজিন ও ২১ রাউন্ড গুলিসহ অস্ত্র ব্যবসায়ী আজগর আলী ভোলাকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এসব অস্ত্র ও গুলি রাজনৈতিক দলের এক নেতার কাছে বিক্রির জন্য বৃহস্পতিবার ঢাকার বাইরে থেকে আসে বলে ভোলা ডিবিকে জানিয়েছে। এদিন কুমিল্লা থেকে ১০ রাউন্ড গুলি, একটি পিস্তল এবং অন্যান্য সরঞ্জামাদিসহ কে আই এম মাসুদুল হক মাসুম নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মাসুম হলেন কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির একেএম এমদাদুল হক মামুনের আপন ছোট ভাই। নির্বাচনি নিরাপত্তার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, এবারের জাতীয় নির্বাচন হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অবাধ, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচন। এই নির্বাচনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের মধ্যে রয়েছে-প্রথমবারের মতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও বডি ওর্ন ক্যামেরার ব্যবহার, সিসিটিভি স্থাপন, ড্রোন ও ডগ স্কোয়াডের ব্যবহার। তিনি বলেন, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশজুড়ে দুই পর্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হবে। প্রথম পর্বে চলমান যারা মোতায়েন রয়েছেন, তারা বলবৎ থাকবেন। দ্বিতীয় পর্বে ভোটকেন্দ্রিক মোতায়েন, যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন। নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. নাঈম আশফাক চৌধুরী বলেন, নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণসংক্রান্ত আমাদের যে প্রত্যাশা ছিল, সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। এ কারণে তুচ্ছ ঘটনায় ঘটছে সংঘাত-সহিংসতা। তিনি বলেন, আমরা আনন্দ-উৎসবমুখর একটি নির্বাচন চেয়েছিলাম। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতি সে পর্যায়ে যায়নি। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের চাদরকে মুড়িয়ে ব্যক্তি এবং গোষ্ঠী স্বার্থে টার্গেট আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির চেষ্টা চলছে। নির্বাচনি নিরাপত্তার বিষয়ে আইজিপি ড. বাহারুল আলম জানিয়েছেন, নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রস্তুতিতে আমাদের কোনো ঘাটতি নেই। আমরা যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েছি। কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলেই গ্রেফতার করা হবে। পুলিশ সদস্যরা ইতোমধ্যেই বডি ওর্ন ক্যামেরা নিয়ে তাদের দায়িত্ব পালন শুরু করেছে। ঘটনাস্থলের সবকিছু ক্যামেরায় রেকর্ড হচ্ছে। কেউ মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে যেমন সুবিধা করতে পারবেন না, তেমনি ঘটনা ঘটিয়েও কেউ পার পাবেন না। তিনি বলেন, কেউ যেন অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়ে পুলিশ তৎপর আছে। অস্ত্র উদ্ধার অভিযান অধিকতর জোরদার করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট একজন ডিআইজি বলেন, বুধবার বিকালে সারা দেশের রেঞ্জ ডিআইজি, মেট্রোপলিটন কমিশনার এবং এসপিদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেছেন আইজিপি বাহারুল আলম। কনফারেন্সে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে আইজিপি বলেন, নির্বাচনি পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে কাউকে কোনো ছাড়া দেওয়া যাবে না। নিয়মের বাইরে কেউ কিছু করলেই তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। সবার সঙ্গেই সমান আচরণ করতে হবে। প্রার্থীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এখনো যেসব প্রার্থীর নিরাপত্তা ঘাটতি রয়েছে তাদের গানম্যান দেওয়াসহ পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলী বলেন, যে কোনো মূল্যে নির্বাচনি পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে সব অপরাধ বিভাগের ডিসি এবং সব থানার ওসিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছি। সবাইকে নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে বলেছি। কেউ নিরপেক্ষতা হারালে বা পেশাদারিত্বের বাইরে গেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে স্ট্যান্ডরিলিজসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনি নিরাপত্তার অংশ হিসাবে ১৩ ডিসেম্বর থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত ৯০ হাজার ৭৯টি চেকপোস্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এসব চেকপোস্টে ১৩ লাখ ২৭ হাজার ৩৩৬টি গাড়ি এবং ১১ লাখ ৯৭ হাজার ৬১৭টি মোটরসাইকেলে তল্লাশি চালানো হয়েছে। তল্লাশি কার্যক্রমের অংশ হিসাবে ১৮ হাজার ৯৯৫টি মোটরসাইকেল আটক করা হয়েছে। আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে ২১ হাজার ৩২৪টি মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে। এছাড়া গ্রেফতার করা হয়েছে ৫৭ হাজার ৬৭৪ জনকে। এর মধ্যে ডেভিল হান্ট ফেস-২ অপারেশনের আওতায় আছেন ২০ হাজার ৮৮০ জন। আর মামলা ও ওয়ারেন্টের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রেফতার করা হয়েছে ৩৬ হাজার ৭৯৩ জনকে। ২০২৪ সালের আগস্টে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিভিন্ন থানা এবং পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় পুলিশের পাঁচ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ছয় লাখ ৫২ হাজার আট রাউন্ড গোলা-বারুদ লুট হয়। এসবের মধ্যে এক হাজার ৩৩১টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। এছাড়া লুণ্ঠিত দুই লাখ ৫৭ হাজার ১৪৪ রাউন্ড গোলা-বারুদ উদ্ধার হয়নি এখনো। এ বিষয়ে পুলিশের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন বলেন, লুণ্ঠিত অস্ত্রগুলো আগামী নির্বাচনে ব্যবহার হতে পারে-এই আশঙ্কা মাথায় রেখেই আমরা কাজ করছি। এখন পর্যন্ত শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। নির্বাচনের যে কয়দিন বাকি আছে সেই সময়টাতে অস্ত্র উদ্ধার সংক্রান্ত আমাদের অভিযান আরও জোরদার করা হবে। কেবল পুলিশের কাছ থেকে লুট হওয়া অস্ত্রই নয়, দুষ্কৃতকারীদের হাতে থাকা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারেও অভিযান জোরদার করেছি।