মাঝপথে নির্বাচন পরিচালনা বিধি সংশোধন করল ইসি


মাঝপথে নির্বাচন পরিচালনা বিধি সংশোধন করল ইসি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাঝপথে অনেকটা হঠাৎ করে ‘নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা’য় সংশোধনী এনেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দেশের ভেতরের পোস্টাল ব্যালটে প্রতীক বরাদ্দের বিধান পরিবর্তন আনার জন্য এ সংশোধনী আনা হয়। এই পরিবর্তনের ফলে দেশের ভেতরের পোস্টাল ব্যালটে সব প্রতীক থাকবে না। শুধু প্রতিটি আসনের চূড়ান্ত প্রার্থী ও তাদের প্রতীক থাকবে। বৃহস্পতিবার পরিচালনা বিধিমালার ওই সংশোধনীতে এসআরও জারি করে আইন মন্ত্রণালয়। এদিন ব্যালট ছাপার কাজ শুরু করেছে সরকারের তিনটি ছাপাখানা। যদিও বৃহস্পতিার রাত ৮টা পর্যন্ত পরিচালনা বিধিমালা সংশোধনীর গেজেট বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়নি। এর আগেই ১৯ জানুয়ারি এ সংক্রান্ত একটি বিশেষ পরিপত্রও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পাঠায় ইসি। অবশ্য ইসির দাবি, নির্বাচনি কাজের সুবিধার্থে এসব সংশোধনী এনেছে। বিদেশে পাঠানো সব প্রতীকসহ পোস্টাল ব্যালট বহালই থাকছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সূত্র আরও জানায়, বিদেশে পাঠানো পোস্টাল ব্যালটে রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সব প্রতীক রেখেছে ইসি। পোস্টাল ব্যালটের উপরের দিকে জামায়াতে ইসলামীর ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক রয়েছে। আর পোস্টাল ব্যালটের মাঝ বরাবর বিএনপির দলীয় প্রতীক ধানের শীষ। ইসি জানিয়েছিল বর্ণমালার ক্রমানুসারে এই প্রক্রিয়ায় প্রতীক সাজানো হয়েছে। তবে এ নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়ে আসছে বিএনপি। বিষয়টি নিয়ে ইসির সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে দলটির প্রতিনিধিদল। এরপর এক জরুরি সভায় পোস্টাল ব্যালটে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নেয় ইসি। ওই সময় একজন নির্বাচন কমিশনার দাবি করেছিলেন, পোস্টাল ব্যালটে পরিবর্তন আনার জন্য আইন বা বিধিমালা সংশোধনের প্রয়োজন হবে না। শুধু পরিপত্র জারি করেই পরিবর্তন করা সম্ভব। কিন্তু আইনি জটিলতা থাকায় পরিচালনা বিধিমালার কয়েকটি ধারায় সংশোধনী আনল ইসি। এদিকে, এ প্রক্রিয়ায় বিধিমালা সংশোধন করায় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে বলে মনে করেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. মো. আব্দুল আলীম। তিনি বলেন, মানুষ মনে করবে, একটি দলের দাবির প্রেক্ষিতে ইসি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটা একটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। সামনে অন্য রাজনৈতিক দলগুলো তাদের বিভিন্ন দাবিতে নির্বাচন কমিশনে মব তৈরি করতে পারে, যা ইসির জন্য সুখকর নয়। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন যদি মনে করে তাদের পোস্টাল ব্যালটে সব প্রতীক দেওয়া ভুল ছিল, তাহলে মনোনয়নপত্র দাখিলের আগেই বিধিমালা সংশোধন করতে পারত। জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট প্রথমবার চালু হয়েছে। প্রথমবার হওয়ায় সবকিছু সুন্দরভাবে করতে পারছি বিষয়টি তেমন নয়। আমরা দেখেছি, বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোতে যে পদ্ধতিতে পোস্টাল ব্যালট ছিল, তা ভালো ছিল। এ কারণেই সংশোধনী আনা হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতোই পোস্টাল ব্যালট হবে। সেখানে শুধু চূড়ান্ত প্রার্থী ও তাদের প্রতীক থাকবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কাজের সুবিধার্থে এসব করা হয়েছে। ভোটাররা এ ব্যালটে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন। ইসি সূত্র জানায়, ‘নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা’র ১০, ১১ ও ১২ বিধিতে সংশোধনী এনেছে ইসি। এই তিন বিধিতে বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসী ভোটারদের পোস্টাল ব্যালটে রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রতীক রাখার বিদ্যমান নিয়ম বহাল রাখা হয়েছে। দেশের ভেতরের যারা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন, তাদের ব্যালটে সব প্রতীক থাকবে না। শুধু চূড়ান্ত প্রার্থী ও তাদের প্রতীক থাকবে। ভোটাররা প্রতীকের পাশে ফাঁকা স্থানে ‘টিক’ বা ‘ক্রস’ চিহ্ন দিয়ে ভোট দেবেন। জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইটিভিত্তিক পোস্টাল ব্যালট চালু করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশন। এতে দেশে-বিদেশে ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন ভোটার নিবন্ধন করেন। এর মধ্যে দেশের ভেতরে নিবন্ধন করেন ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৩৬ জন। তাদের মধ্যে ৫ লাখ ৭৫ হাজার ২০০ জন সরকারি চাকরিজীবী, ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৪২ জন নির্বাচনি দায়িত্বপ্রাপ্ত, ১০ হাজার ১০ জন আনসার ও ভিডিপি এবং কারাবন্দি ৬ হাজার ২৮৪ জন। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় গণভোট ও সংসদ নির্বাচনে এ ব্যালটে ভোট দেবেন তারা। প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালট ইতোমধ্যে পাঠিয়ে দিয়েছে ইসি। দেশের ভেতরে যে ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৩৬ জন নিবন্ধন করেছেন, তবে তাদের ব্যালট পাঠানো হয়নি। ওইসব ব্যালট ছাপার জন্য আর্মি প্রিন্টিং প্রেসকে অনুমোদন দিয়েছিল ইসি। কিন্তু হঠাৎ করে দেশের ভেতরের পোস্টাল ব্যালটে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ছাপাখানাও পরিবর্তন করা হয়। নতুন পোস্টাল ব্যালট বিজি প্রেস, প্রিন্টিং প্রেস ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসে ছাপার কাজ শুরু করেছে। ইসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, ইসির এ সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছেন কর্মকর্তারা। আগে একই ধরনের ব্যালট সব জায়গায় পাঠানো হয়েছে। এখন প্রতিটি আসনের জন্য পৃথক পৃথক ব্যালট পেপার ছাপতে হচ্ছে। এতে ব্যয় ও কষ্ট-দুইই বেড়েছে। পাশাপাশি ভোটের আগে যে সময় রয়েছে, ওই সময়ের মধ্যে ভোটারদের কাছে ওই ব্যালট পাঠানো ও ফেরত আনাও চ্যালেঞ্জিং কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসির বিশেষ পরিপত্র : পোস্টাল ব্যালটে পরিবর্তন আনার বিষয়গুলো যুক্ত করে ১৯ জানুয়ারি বিশেষ পরিপত্র রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পাঠিয়েছে ইসি। ওই পরিপত্রে ১২ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটের মধ্যে যেসব পোস্টাল ব্যালট রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তরে পৌঁছবে না, সেগুলো বাতিল করতে বলা হয়েছে। এছাড়া খামের ওপর থাকা কিউআর কোড স্ক্যান না করলে সেই ভোটও বাতিল হবে। একজনের ভোট যাতে অন্যজন না দিতে পারে, সেজন্য এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঘোষণাপত্রে সই না করলেও ওই ভোট বাতিল করতে বলা হয়েছে।