ঈদ ঘিরে চাঙ্গা অর্থনীতি


ঈদ ঘিরে চাঙ্গা অর্থনীতি
আসন্ন ঈদুল ফিতর ঘিরে জমে উঠেছে কেনাকাটা। শপিংমল থেকে শুরু করে বিপণিবিতানগুলো সরগরম হয়ে উঠেছে। শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গায় ঈদের কেনাকাটার ধুম লেগেছে। গ্রামীণ জনপদের বাজার থেকে রাজধানীর অভিজাত শপিংমলগুলোতেও ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে। অর্থনৈতিক এসব কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় অর্থনীতিতে গতি এসেছে। এ ছাড়া পরিবার-পরিজনের স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদ উৎসব পালন করতে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। এতে গ্রামীণ জনপদেও অর্থের প্রবাহ বাড়ছে। ফলে ঈদ ঘিরে চাঙ্গা হয়ে উঠছে অর্থনীতি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদে পায়জামা-পাঞ্জাবি, জুতা, ঘড়ি, টুপি, জায়নামাজ, আতর ও পোশাক বিক্রি বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় বেড়ে যায় বলে ব্যবসা বাড়ে। এ ছাড়া ঈদ ঘিরে পোশাকের পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের চাহিদাও বেড়ে যায়। বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহও বাড়তে থাকে। আর চাহিদা মেটাতে পোশাক, জুতা, তেল, মসলা ও খেজুরের মতো পণ্য আমদানি হয়। ফলে অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ে। এতে সামগ্রিক অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ঈদ ঘিরে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত সময়ে দেশে মোট ২ হাজার ৪৩৭ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ৯৮২ কোটি মার্কিন ডলার। এ হিসাবে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ২২ দশমিক ৯ শতাংশ। শুধু ২০২৬ সালের ১১ মার্চ একদিনে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১৮ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার। চলতি মাসের ১ থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত সময়ে দেশে মোট ১৯২ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। গত বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ১৩৩ কোটি মার্কিন ডলার। সে হিসাবে গত বছরের একই সময়ে ১১ মার্চ পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় ৪৪ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আগে প্রবাসীরা ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ২ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় প্রায় ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহ দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৮ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থনীতিতে ঈদের অবদান যতটা ধারণা করা হয়, এর চেয়ে অনেক বেশি। সারা বছর যে পরিমাণ খাবার ও অন্যান্য পণ্যের বেচাকেনা হয়, এর প্রায় ৪০ শতাংশ হয় ঈদের সময়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বার্ষিক আয়ের ৪০ শতাংশ আসে ঈদ উৎসবে। এ ছাড়া ঈদ ঘিরে যাকাত ও সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে সম্পদের পুনর্বণ্টন হয়। ফলে গ্রাম-গঞ্জ-শহরের বাজারগুলোয় ঈদের কেনাকাটার ধুম পড়ে। সব পেশার মানুষ উৎসবের কেনাকাটায় ব্যস্ত থাকেন। দোকানিরাও ক্রেতাদের কথা মাথায় রেখে নানা পণ্যের পসরা সাজান। ঈদে খণ্ডকালীন কাজের সুযোগও তৈরি হয়। ক্রেতা-গ্রাহকের ভিড় সামলাতে অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী নিয়োগ করে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘আসন্ন ঈদ নতুন সরকারের প্রথম ঈদ। তাই এ ঈদ ঘিরে গ্রামীণ অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ বাড়বে।’ কারণ হিসেবে এই গবেষক বলেন, নির্বাচিত সরকারের প্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকায় যাবেন, বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেবেন এবং সাধারণ মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করবেন। এ ছাড়া ঈদকেন্দ্রিক বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও হবে। তাই এবারের ঈদে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা থাকবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত প্রবাসী আয়েও তেমন প্রভাব ফেলবে না। তবে যারা ঈদকে কেন্দ্র করে দেশে আসছেন বা যারা প্রবাসে যাওয়ার ক্ষেত্রে আটকে আছেন, তাদের বিষয়টি সরকারকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমাধান করতে হবে বলেও জানান এই অর্থনীতিবিদ। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেসরকারি হিসাবে ঈদুল ফিতরে ফিতরা দেওয়া হয় প্রায় ৪৯৫ কোটি টাকা। প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য এই দান বাধ্যতামূলক। সাধারণত ঈদ উদযাপনে মানুষ যখন শহর থেকে গ্রামে আসেন, তখন তারা তুলনামূলক দরিদ্রদের ফিতরা দেন। এতে বড় অঙ্কের অর্থ গ্রামীণ জনপদের মানুষের মধ্যে বিতরণ হয়। ফলে গ্রামীণ জনপদেও ঈদের আমেজ বাড়ে এবং অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। দোকান মালিক সমিতির হিসাব বলছে, রোজার ঈদে দেশে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে গয়নার চাহিদা বেড়ে যায়। একটি দোকানের প্রতিদিনের গড় বিক্রি ৮০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৩ লাখ টাকা হয়। এ ছাড়া ঈদ কাপড়-চোপড় বিক্রেতাদের জন্য সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ হয়ে আসে। ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে পোশাক খাতে ব্যবসা হয় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। ঈদ যতই এগিয়ে আসে, কেনাকাটা ততই বাড়ে। ঢাকায় ঈদের কেনাকাটার জন্য বসুন্ধরা সিটি শপিং সেন্টার, যমুনা ফিউচার পার্ক, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি, খিলগাঁওয়ের তালতলা মার্কেটসহ অভিজাত শপিংমলগুলোয় মানুষের ঢল নামে। ঈদের কেনাবেচা নিয়ে জানতে চাইলে দেশীয় পোশাক ব্র্যান্ড লারিভের সিইও মুন্নুজান নার্গিস বলেন, ‘ঈদ আসলে আমাদের মতো পোশাক ব্র্যান্ডের জন্য বড় একটি উৎসব। এবার ঈদের কেনাকাটা প্রথম দিকে তেমন ছিল না, তবে শেষ সময়ে এসে জমে উঠেছে। ক্রেতারা মার্কেটে আসছেন এবং কেনাকাটা করছেন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার ঈদের কেনাকাটা অনেক ভালো।’ একই ধরনের বক্তব্য দেন আরেক দেশীয় পোশাক ব্র্যান্ড বিশ্বরঙের কর্ণধার বিশ্বজিৎ সাহা। তিনি বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবারের ঈদ মার্কেটে কেনাকাটা অনেক ভালো।’ ঈদের বাজারে পুরান ঢাকার ইসলামপুর পাইকারি বাজার ও পল্টনের পলওয়েল সুপার মার্কেটের মতো পাইকারি বাজারেও ভিড় দেখা যাচ্ছে। ইসলামপুরের ব্যবসায়ীরা জানান, তাদের পণ্য চোখের নিমিষেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এবারের ঈদে বুটিক পণ্যগুলো জনপ্রিয়। পার্টি ড্রেস, লেহেঙ্গা ও শাড়িসহ বিভিন্ন বুটিক পণ্য তারা বিক্রি করেন। ব্যবসায়ী ও অনলাইন বিক্রেতারা এসব পণ্য কেনেন। খুচরা বিক্রেতারা গত বছরের ঈদ বাণিজ্যের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা করছেন। ঈদে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশীয় পোশাক ব্র্যান্ড সেইলর, ইয়েলো, লারিভ, ইলিয়ন, ইনফিনিটি, ইজি ও সারার মতো প্রতিষ্ঠানের শোরুমে ক্রেতা সমাগম বাড়ছে। বাড়ছে কেনাকাটাও। যমুনা ফিউচার পার্কের ইয়েলোর শোরুমের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘এবারের বেচা-বিক্রি বেশ ভালো। আশা করছি, এবার বিক্রি লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।’ রমজানে আরও বেশি গ্রাহক টানতে অন্যান্য ব্র্যান্ডের মতো সেইলরও নতুন নতুন পণ্য এনেছে। শুধু কাপড়-চোপড় নয়, জুতার বাজারেও সরগরম বেচাকেনা চলছে। বাটা ও এপেক্সসহ বিভিন্ন শপিংমল এবং রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের জুতার দোকানগুলোতে ভিড় বাড়ছে। এতে কেনাকাটাও বাড়ছে। শুধু রাজধানী নয়, দেশের গ্রামীণ জনপদের বাজারগুলোতেও ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এফবিসিসিআইর সাবেক সহসভাপতি ও বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘দেশে একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার এসেছে। এতে জনমনে স্বস্তি এসেছে। স্বভাবতই গত বছরের তুলনায় এবারের ঈদের কেনাকাটা ভালো হবে। এ ছাড়া ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে অনেকেই দেশের বাইরে কেনাকাটা করতে পারেননি। এসব মানুষ এখন দেশেই কেনাকাটা করবেন। এতে কেনাকাটা গত বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি হবে। এ ছাড়া পাইকারি বাজারে কেনাকাটা গতবারের তুলনায় অনেক বেশি হয়েছে। তাই আশা করা যাচ্ছে, খুচরা পর্যায়েও এবার ভালো বেচাকেনা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আর কয়েক দিনের মধ্যে ঈদের বেতন-বোনাস দেওয়া হবে। তখন বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।’ ঈদ উৎসবের আরেকটি প্রধান উপাদান মিষ্টি ও অতিথি আপ্যায়ন। দোকান সমিতির তথ্য বলছে, ঈদে অতিথিদের আপ্যায়নে খরচ হয় প্রায় ২৫ থেকে ২৬ হাজার কোটি টাকা। রান্নার মসলা ও নিত্যপণ্যের চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়। মিরপুরের হকার আলমগীর কবির জানান, তিনি ইফতারে জিলাপি, ডিমের চপ, ছোলা, বেগুনি, আলুর চপ ও মুড়ি বিক্রি করে প্রতিদিন দেড় থেকে ২ হাজার টাকা আয় করেন। তিনি আরও জানান, শুক্র ও শনিবার তার আয় ২ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। ভ্রমণও ঈদের অংশ। অনেকে দেশ-বিদেশে ঘুরতে যান। ফলে ট্রাভেল এজেন্সিগুলো এয়ারলাইনস, হোটেল-রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁর খোঁজ দিয়ে ঈদের সময় ভালো ব্যবসা করে। কক্সবাজারের একাধিক হোটেল-মোটেল মালিক জানান, সারা বছরের ব্যবসার বড় অংশ হয় ঈদের সময়। ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়ে যায় বলেও জানান তারা।