নিম্নমানের পচা খাবারে অসুস্থ হচ্ছে শিশুরা
প্রধান সম্পাদক
কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করতে চালু করা স্কুল ফিডিং (মিডডে মিল) প্রকল্পেও দুর্নীতি ঢুকে পড়েছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের স্কুলগুলোতে নিম্নমানের ও পচা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। দুর্গন্ধযুক্ত অপুষ্টিকর খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অতি লোভের খেসারত দিচ্ছে শিশুরা। এসব খাবার খেয়ে শিশুদের অসুস্থ হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। ২২ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার শংকরবাটি ১ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিডডে মিলের খাবার খেয়ে অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। ওই দিন শিক্ষার্থীদের খাবারের আইটেম ছিল পাউরুটি, দুধ, কলা ও ডিম। খাবার গ্রহণের কিছুক্ষণের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে বমি, পেটব্যথা ও চোখে জ্বালাপোড়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শামসুন্নাহার অভিযোগ করেন, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরেই নিম্নমানের ও দুর্গন্ধযুক্ত খাবার সরবরাহ করে আসছিল। বিষয়টি একাধিকবার জানানো হলেও কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত ওই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেন। সাময়িকভাবে তাদের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়।
শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ নয়, একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে দেশের অনান্য জেলায়ও। ৯ এপ্রিল মাদারীপুর সদর উপজেলার কয়েকটি বিদ্যালয়ে নিম্নমানের খাবার খেয়ে অন্তত ১৫ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়। সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, নিম্নমানের খাবার সরবরাহের বিষয়ে আগেই আপত্তি জানানো হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি।
পিরোজপুরের নেছারাবাদ, ঝালকাঠির নলছিটি, বরগুনার তালতলী এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলাতেও একই ঘটনা ঘটেছে। কোথাও ছোট ও নিম্নমানের ডিম, কোথাও পচা বা আধাপাকা কলা, আবার কোথাও নির্ধারিত খাদ্যতালিকা অনুযায়ী খাবার দেওয়া হচ্ছে না। কিছু ক্ষেত্রে সরবরাহে অনিয়ম ছাড়াও আংশিক বিতরণেরও অভিযোগ আছে।
এসব খাদ্যে কোনো নির্দিষ্ট প্যাকেজিং বা চিহ্ন থাকে না। তাই অপব্যবহার বা সরিয়ে নেওয়ার সুযোগও তৈরি হচ্ছে। আবার শিক্ষার্থীদের খাবার না দিয়ে বাইরে বিক্রি করে দেওয়া মতো ঘটনাও ঘটছে।
শনিবার দেশব্যাপী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে স্কুল ফিডিং সরবরাহের পরিস্থিতির দেখার অংশ হিসাবে নরসিংদীতে বিদ্যালয় পরিদর্শনে যান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। এ সময় তিনি বাসাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিডডে মিলে সরবরাহকৃত বনরুটি, ডিম ও খাবারের মান দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে সরকারের দেওয়া মিডডে মিলের মাধ্যমে কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থ হওয়ার মতো এমন ত্রুটি-বিচ্যুতি যেন না হয় সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। এছাড়া যেসব খাবার খুব তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যেতে পারে সেগুলো বদলে দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, মিডডে মিল প্রকল্পে কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না। ইতোমধ্যে ১৫০টি উপজেলায় এ কার্যক্রম চালু হয়েছে। সারা দেশে তা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষক ও অভিভাবকদের অভিযোগ, পচনশীল খাবার ডিম, কলা ও দুধ সংরক্ষণ ও পরিবহণে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় এসব খাদ্য দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি এসব খাদ্য বিতরণ করা হচ্ছে। যা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বেশির ভাগ এলাকায় খাবারের মান যাচাই করার মতো উপকরণও নেই।
স্কুল ফিডিং প্রকল্পের পরিচালক ও যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ বলেন, স্কুল ফিডিং সরবরাহে যারা অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। সারা দেশে প্রায় ২৮ লাখ শিশুকে আমরা খাবার সরবরাহ করছি। এতে কিছু ভুলত্রুটির ঘটনা ঘটবে, এটাই স্বাভাবিক। প্রতিদিন শিশুদের একই ধরনের খাবার দিলে অনীহা সৃষ্টি হয়। তাই আমরা রোস্টার করে ভিন্ন ভিন্ন আইটেম দেওয়ার চেষ্টা করছি। স্কুল ফিডিং প্রকল্পের কারণে শিশুরা আগ্রহ নিয়ে স্কুল আসা শুরু করছে বলে জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অধিকাংশ এলাকায় আধুনিক খাদ্য পরীক্ষাগার না থাকায় এসব খাবারের মান নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ঢাকায় পরীক্ষা করাতে গেলেও ফলাফল পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। যা পচনশীল খাদ্যের ক্ষেত্রে অকার্যকর। বর্তমানে পচনশীল খাদ্য যুক্ত হওয়ায় সরবরাহব্যবস্থা জটিল হয়ে পড়েছে। তদারকির দুর্বলতা ও অনিয়মের সুযোগও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি সংবেদনশীল প্রকল্পে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও সক্ষমতা ছাড়া শুরু করা হয়েছে। যার ফল এখন শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই কর্মসূচি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরিণত হবে। এছাড়া নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে টেন্ডারের মাধ্যমে এসব কাজ দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। তাই এই অনিয়মের ঘটনা ঘটছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, প্রাথমিক স্তরের শিশু শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধ এবং তাদের পুষ্টিমান বৃদ্ধির জন্য ‘স্কুল ফিডিং’ প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। গত অর্থবছরের বাজেটে এজন্য ২ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। দেশের ৮টি বিভাগের ১৫০টি উপজেলার প্রায় ২৮ লাখ কোমলমতি শিক্ষার্থীকে তাদের নির্ধারিত ‘মিডডে মিল’ বা দুপুরে পুষ্টিকর খাবার দেওয়া হচ্ছে।
আনোয়ারায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচির খাবার সরবরাহে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘স্বদেশপল্লি’ নামে সংস্থার সমন্বয়ক শমসের নাহিদ বলেন, আগে পাঠানো স্কুলগুলোতে ভালো মানের কলা পেলেও শুধু কয়েকটি স্কুলে পাঠানো কলা নষ্ট ছিল। স্থানীয়ভাবে এসব কলা সংগ্রহ করায় এ সমস্যা হয়।
