ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পর আগের বছরের বৃত্তি পরীক্ষা: পুরোনো সিলেবাসে নতুন চাপ, বিপাকে ৫ লাখ শিক্ষার্থী


ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পর আগের বছরের বৃত্তি পরীক্ষা: পুরোনো সিলেবাসে নতুন চাপ, বিপাকে ৫ লাখ শিক্ষার্থী
পঞ্চম শ্রেণি পাস করে চার মাস আগে ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেছে শিক্ষার্থীরা। নতুন বই, নতুন পাঠ্যসূচি আর নতুন শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মধ্যেই তাদের সামনে হাজির হচ্ছে আরেক পরীক্ষা—পঞ্চম শ্রেণির প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা। আইনি জটিলতায় ২০২৫ সালে এ পরীক্ষা আয়োজন করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। সরকার পরিবর্তনের পর দেরিতে হলেও পরীক্ষাটি আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সব ঠিক থাকলে আগামী এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় অনুষ্ঠিত হবে পরীক্ষা। এতে অংশ নিতে পারে প্রায় পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী, যারা ইতিমধ্যে মাধ্যমিক স্তরে পড়ছে। শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নতুন শ্রেণিতে চার মাস পড়াশোনা করার পর আবার পঞ্চম শ্রেণির সিলেবাসে ফিরে গিয়ে পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য বাস্তবসম্মত নয়। এতে পড়ালেখার ধারাবাহিকতা ভেঙে যাওয়ার পাশাপাশি মানসিক চাপও বাড়ছে। পঞ্চম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর অধিকাংশ শিক্ষার্থী তাদের পুরোনো বই, নোট ও গাইড আর হাতে রাখেনি। নতুন শ্রেণির বই কেনার জন্য অনেকেই সেগুলো বিক্রি করে দিয়েছে। এখন হঠাৎ করে আবার পঞ্চম শ্রেণির পড়া ঝালাই করে পরীক্ষায় বসার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে বিপাকে পড়ছে তারা। রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে উৎসাহ দিয়েছিলেন শিক্ষকরা। তার বাবা আফজাল হোসেন পেশায় হোটেল শ্রমিক। তিনি বলেন, “ছেলের রোল ছিল এক। তাই বৃত্তি পরীক্ষার জন্য শিক্ষকরা বলছিলেন। অনেক কষ্ট করে গাইড কিনে দিয়েছিলাম। ফাইভ শেষ হওয়ার পর সেটা বিক্রি করে সিক্সের গাইড কিনেছে। এখন যদি আবার ফাইভের পরীক্ষা হয়, তাহলে ও কী লিখবে? ফাইভের পড়া তো অনেকটাই ভুলে গেছে।” শিক্ষকরা বলছেন, শহরের শিক্ষার্থীরা কিছুটা হলেও বই বা গাইড জোগাড় করতে পারছে। কিন্তু গ্রামীণ এলাকার অনেক শিক্ষার্থীর জন্য এটি প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ফলে শুরুতেই বৈষম্যের মুখে পড়ছে তারা। অন্তর্বর্তী সরকার প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা চালুর উদ্যোগ নেয়। এ জন্য নীতিমালা তৈরি, মানবণ্টন প্রকাশ এবং নমুনা প্রশ্নপত্রও প্রকাশ করা হয়। তবে নীতিমালায় বলা হয়, শুধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে ৪০ শতাংশ পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে। এ নিয়মে ক্ষুব্ধ হয়ে কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা হাইকোর্টে রিট করেন। গত বছরের ৩রা নভেম্বর হাইকোর্ট ওই নীতিমালা বাতিল করে ২০০৮ সালের নীতিমালার আলোকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যোগ্য শিক্ষার্থীদেরও পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে নির্দেশ দেন। পরে সরকারের করা লিভ টু আপিলও খারিজ হয়ে যায়। এরপর ‘বৃত্তি’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘মেধা যাচাই’ নামে পরীক্ষা নেওয়ার উদ্যোগ নিলে আবারও আদালতে রিট হয়। এর ফলে শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের বৃত্তি পরীক্ষা আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। সরকার পরিবর্তনের পর নতুন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন নীতিমালা সংশোধনের ঘোষণা দেন। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৮০ শতাংশ এবং কিন্ডারগার্টেন বা বেসরকারি বিদ্যালয়ের ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে। প্রায় সাড়ে ৮২ হাজার শিক্ষার্থীকে বৃত্তির জন্য নির্বাচিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সময় নির্ধারণ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কারণ, এপ্রিলের মাঝামাঝি বৃত্তি পরীক্ষা হওয়ার কথা রয়েছে। এর ঠিক এক মাস পর জুনে ষষ্ঠ শ্রেণির অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা। ফলে মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে দুটি ভিন্ন সিলেবাসের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের মতে, একই সময়ে দুটি শ্রেণির পড়াশোনার চাপ সামলাতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী মানসিকভাবে চাপে পড়ছে। মতিঝিল সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদিয়া খাতুন বলে, “পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি আর ষষ্ঠ শ্রেণির পরীক্ষার সিলেবাস পুরো আলাদা। দুইটার প্রস্তুতি একসঙ্গে নেওয়া খুব কঠিন। ভাবছি বৃত্তি পরীক্ষাটা না-ই দিই।” ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক আঞ্জুমান আরা শিউলি বলেন, “দুটি পরীক্ষার সময় এত কাছাকাছি হওয়ায় শিক্ষার্থীরা যেকোনো একটির জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারবে। অন্যটির জন্য ঘাটতি থেকে যাবে। এতে ফলাফলের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।” শিক্ষাবিদদের কেউ কেউ প্রাথমিক স্তরে বৃত্তি পরীক্ষা চালুর উদ্যোগকেই প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন। গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, বাছাই করা শিক্ষার্থীদের নিয়ে আলাদা পরীক্ষা নেওয়া শিশুদের মধ্যে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি করে। এতে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা আরও পিছিয়ে যায়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, প্রাথমিক স্তরে বৃত্তি পরীক্ষা চালু করার ধারণাটিই প্রশ্নবিদ্ধ। তার মতে, “একদিকে অপ্রয়োজনীয় একটি পরীক্ষা, অন্যদিকে তা আবার অসময়ে আয়োজন করা হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের ওপর অকারণ চাপ তৈরি হচ্ছে।” সমালোচনার মধ্যেও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে বৃত্তি পরীক্ষা আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, পরীক্ষাটি আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। তার মতে, শিক্ষার্থীরা একটু বাড়তি চেষ্টা করলে দুটি পরীক্ষাই সামলাতে পারবে। তবে শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের অনেকেই মনে করছেন, চার মাস আগে পেছনে ফেলে আসা একটি শ্রেণির সিলেবাসে ফিরে গিয়ে পরীক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত শিক্ষাব্যবস্থার অদূরদর্শিতারই আরেকটি উদাহরণ হয়ে উঠছে।

সর্বশেষ :

ফেনীতে মাটিলুট ও চাঁদাবাজির জেরে যুবদল-ছাত্রদলের দুপক্ষের সংঘর্ষে নিহত ১   ফেনীতে মাটিলুট ও চাঁদাবাজির জেরে যুবদল-ছাত্রদলের দুপক্ষের সংঘর্ষে নিহত ১ মূল্যবান জিনিস থানায় জমা রেখে ঈদযাত্রার অভিনব পরামর্শ ডিএমপির   মূল্যবান জিনিস থানায় জমা রেখে ঈদযাত্রার অভিনব পরামর্শ ডিএমপির মিসাইল আতঙ্ক, কাছে গিয়েও হরমুজ পেরোতে পারেনি বাংলাদেশি জাহাজ   মিসাইল আতঙ্ক, কাছে গিয়েও হরমুজ পেরোতে পারেনি বাংলাদেশি জাহাজ একমাসের ব্যবধানে মাদকসহ আটকের পর এবার চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার ছাত্রদলের আহ্বায়ক   একমাসের ব্যবধানে মাদকসহ আটকের পর এবার চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার ছাত্রদলের আহ্বায়ক মডেল মেঘনার দাবি: মির্জা আব্বাসের অসুস্থতার পেছনে দায়ী ‘ডার্বি নাসির’   মডেল মেঘনার দাবি: মির্জা আব্বাসের অসুস্থতার পেছনে দায়ী ‘ডার্বি নাসির’ শেখ হাসিনার খাদ্য ব্যবস্থাপনা: ইউনূসের পর বিএনপি সরকারও চাহিদা মেটাচ্ছে সেই মজুদে   শেখ হাসিনার খাদ্য ব্যবস্থাপনা: ইউনূসের পর বিএনপি সরকারও চাহিদা মেটাচ্ছে সেই মজুদে ভারতের সরবরাহকৃত তেলে মজুদ পর্যাপ্ত, জ্বালানি তেলের রেশনিং প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত   ভারতের সরবরাহকৃত তেলে মজুদ পর্যাপ্ত, জ্বালানি তেলের রেশনিং প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ কেনায় ৪৮৬ কোটি টাকার আর্থিক অসঙ্গতি   অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ কেনায় ৪৮৬ কোটি টাকার আর্থিক অসঙ্গতি