শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চালু হওয়া নিয়ে শঙ্কা


শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চালু হওয়া নিয়ে শঙ্কা
রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালটি চলতি বছর চালু হবে কি না তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান টার্মিনালটি চালুর ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশ দেন। এরপর মন্ত্রণালয় তোড়জোড় শুরু করে। তবে জাপানের সঙ্গে সরকারের দ্বিতীয় দফায় আলোচনায় এখনও অগ্রগতি হয়নি। নতুন প্রস্তাবের ওপর আবারও আলোচনা হবে। সবমিলিয়ে বর্তমান যা অবস্থা তাতে চলতি বছর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এ টার্মিনালটি চালু হবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এদিকে, শুক্রবার (৩ এপ্রিল) জাপানি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকের পর বিমানমন্ত্রী আফরোজা খানম বলেন, দেশের স্বার্থ রক্ষা করার জন্যই আমরা বারবার এক টেবিলে বসছি। আমরা চাচ্ছি যতদ্রুত সম্ভব টার্মিনাল চালু করতে। অপরদিকে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, চলতি বছর তৃতীয় টার্মিনাল চালু সম্ভব না। এটি চালু করতে কমপক্ষে আরো এক থেকে দেড় বছর সময় লাগবে। তারা বলেন, চালুর ব্যাপারে জাপানের সঙ্গে সবেমাত্র আলোচনা শুরু হয়েছে। এখনও আমরা সমঝোতায় পৌঁছাতে পারিনি। আবারও বসার ব্যাপারে দুইপক্ষই রাজি হয়েছে। যদি আমরা তৃতীয় সভাতে একটি ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারি তবে চালুর প্রক্রিয়া প্রাথমিকভাবে শুরু হলো বলা যেতে পারে। তারা আরও বলেন, জাপান ঢাকায় একটি অফিস নেবে। এরপর তাদের পক্ষ থেকে একটি কোম্পানি খুলতে হবে। এই কোম্পানিও খুলতে অনেকগুলো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেতে হবে। এরপর টার্মিনাল অপারেশনের জন্য মালামালের প্রয়োজন হবে। এটি প্রকিউরমেন্ট অনুসারে কিনতে গেলে প্রচুর সময় ব্যয় হবে। কিংবা জাপানের পক্ষ থেকে সেগুলো আনলে সেটি দ্রুত হবে। টার্মিনালে ইমিগ্রেশন, কাস্টমসসহ অন্যান্য সরকারি সংস্থার অফিসের স্থান নির্ধারণ করে তাদের অফিসের জন্য সময় দিতে হবে। বেবিচকের সদস্য ( অপারেশন ) মেহবুব খান বলেন, দ্বিতীয় দফার আলোচনায় আমাদের সমঝোতা হয়নি। জাপান আরেকটি প্রস্তাবনা আগামী সোমবার দিতে যাচ্ছে। তাদের সেই প্রস্তাবনা আমরা আবারও বসবো, আলোচনা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার তো চাই দ্রুত চালু করতে সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। সবকিছু যদি ভালোভাবে এগিয়ে যায় তবে বছরের শেষ নাগাদ চালু করা সম্ভব। তবে আলোচনা সফল হওয়ার ওপর সবকিছু নির্ভর করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে আলোচনায় মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজস্ব বণ্টন কাঠামো ও ঝুঁকি ভাগাভাগির শর্ত। শুক্রবার অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফার উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও এই দুই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতৈক্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। জাপানের পক্ষ থেকে সংশোধিত ও বিস্তারিত প্রস্তাব উপস্থাপন করা হলেও বাংলাদেশ সরকার তাৎক্ষণিকভাবে কোনও সম্মতি দেয়নি; বরং দেশের আর্থিক স্বার্থ, দীর্ঘমেয়াদি দায় এবং অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো আরও গভীরভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। বৈঠকে জাপানের সুমিতোমো করপোরেশন, হানেদা, নারিতা এয়ারপোর্ট অথরিটি (এনএএ) এবং নিপ্পন কোয়েইয়ের সমন্বয়ে গঠিত ওয়ার্কিং গ্রুপ (এসডব্লিউজি) তাদের প্রস্তাবে যাত্রী ও কার্গো খাতে নির্দিষ্ট রাজস্ব ভাগ, অগ্রিম পরিশোধিত মূল্য, এমবার্কেশন ফি, এবং একটি কাঠামোবদ্ধ ঝুঁকি-ভাগাভাগি মডেল উপস্থাপন করে। বৈঠকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এমবার্কেশন ফি, অগ্রিম পরিশোধিত ফি এবং রাজস্ব ভাগাভাগি কাঠামো। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম বলেন, দেশের স্বার্থরক্ষার জন্যই আমরা বারবার এক টেবিলে বসছি। আমরা চাই, যত দ্রুত সম্ভব টার্মিনাল চালু করতে। প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জাপানের প্রতিনিধিদের বাংলাদেশের প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে নতুন করে সংশোধিত প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের জাপানের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহের কথাও তুলে ধরেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ২২ ফেব্রুয়ারি থার্ড টার্মিনাল চালুর ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে তিনি থার্ড টার্মিনাল নির্মাণকাজে অংশ নেওয়া এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়ামের (এডিসি) সঙ্গে আলোচনায় বসার নির্দেশ দেন। যতদ্রুত সম্ভব চালুরও নির্দেশ তিনি। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর এই টার্মিনালের নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্পের কাজ ৯৯ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হওয়ার পর ২০২৩ সালের অক্টোবরে উদ্বোধন করা হয়। তারপর দু বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও শুধু জাপানের সঙ্গে আলোচনায় ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়ায় কার্যক্রম চালু করা যায়নি। মূলত টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, পরিচালন নিয়ন্ত্রণ এবং আয়ের অংশীদারিত্ব নিয়ে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের “একগুঁয়ে” মনোভাবের কারণে জাপান বিরক্ত হয়ে আলোচনা থেকে সরে দাঁড়ায়। এমন জটিল পরিস্থিতিতে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই থার্ড টার্মিনাল চালুর বিষয়ে জোর গুরুত্ব দিয়ে জাপানের সঙ্গে বসার নির্দেশ দেন। বহুল আলোচিত এই থার্ড টার্মিনালের আয়তন দুই লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার। বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দরের প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনাল দিয়ে বছরে প্রায় ৮০ লাখ যাত্রী বহনের ধারণক্ষমতা রয়েছে। পাঁচ লাখ ৪২ হাজার বর্গমিটারের তৃতীয় টার্মিনালটি যুক্ত হলে বছরে ২ কোটি পর্যন্ত যাত্রীকে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। টার্মিনালটিতে একসঙ্গে ৩৭টি উড়োজাহাজ পার্কিং করা যাবে। ১৬টি ব্যাগেজ বেল্টসহ অত্যাধুনিক সব সুবিধা রয়েছে নতুন এ টার্মিনালে। এ ভবনের ভেতরে থাকবে পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য ও অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তির ছোঁয়া। এতে থাকবে বেশ কয়েকটি স্ট্রেইট এক্সকেলেটর। যারা বিমানবন্দরের দীর্ঘপথ হাঁটতে পারবেন না, তাদের জন্য এ ব্যবস্থা। সিঙ্গাপুর, ব্যাংকসহ বিশ্বের অত্যাধুনিক ও বেশি যাত্রী প্রবাহের বিমানবন্দরগুলোতে এ ধরনের এক্সকেলেটর ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। নতুন এ টার্মিনালে যাত্রীদের ব্যাগের জন্য সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি ও ব্যাঙ্ককের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরের মতো অত্যাধুনিক তিনটি আলাদা স্টোরেজ এরিয়া করা হয়েছে। এগুলো হলো- রেগুলার ব্যাগেজ স্টোরেজ, লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড এবং ওড সাইজ (অতিরিক্ত ওজনের) ব্যাগেজ স্টোরেজ। যাত্রীদের স্বাভাবিক ওজনের ব্যাগেজের ১৬টি রেগুলার ব্যাগেজ বেল্ট থাকবে টার্মিনালটিতে। অতিরিক্ত ওজনের ব্যাগেজের জন্য স্থাপন করা হয়েছে আরও চারটি পৃথক বেল্ট। টার্মিনালের প্রতিটি ওয়াশরুমের সামনে থাকবে একটি করে দৃষ্টিনন্দন বেবি কেয়ার লাউঞ্জ। এ লাউঞ্জের ভেতর মায়েদের জন্য ব্রেস্ট ফিডিং বুথ, ডায়াপার পরিবর্তনের জায়গা এবং একটি বড় পরিসরে ফ্যামিলি বাথরুম করা হয়েছে। এছাড়া বাচ্চাদের স্লিপার-দোলনাসহ একটি চিলড্রেন প্লে এরিয়াও রাখা হয়েছে এখানে। ইতোমধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে হেলথ ইন্সপেকশন রুম, প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ফার্স্ট-এইড রুম, করোনাসহ নানা রোগের টেস্টিং সেন্টার ও আইসোলেশন এরিয়া। অত্যাধুনিক এ টার্মিনাল ভবনে থাকবে ১০টি সেলফ চেক-ইন কিওস্ক (মেশিন)। এগুলোতে পাসপোর্ট ও টিকিটের তথ্য প্রবেশ করালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে আসবে বোর্ডিং পাস ও সিট নম্বর। এরপর নির্ধারিত জায়গায় যাত্রী তার লাগেজ রাখবেন। স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাগেজগুলো উড়োজাহাজের নির্ধারিত স্থানে চলে যাবে। তবে নির্ধারিত ৩০ কেজির বেশি ওজনের ব্যাগেজ নিয়ে এখানে চেক-ইন করা যাবে না। যাত্রীদের জন্য আরও ১০০টি চেক-ইন কাউন্টার থাকবে এ টার্মিনালে।

সর্বশেষ :