ডিবির চাঞ্চল্যকর সেই ‘ডাকাতি বাণিজ্যের’ ঘটনায় পার পেয়ে যাচ্ছেন আসল হোতারা। জড়িত পদস্থ কর্মকর্তাদের রক্ষা করতে তদন্তের নামে হয়েছে প্রহসন। পদে পদে রাখা হয় ফাঁকফোকর। সেই ফাঁকফোকর গলিয়ে দায়মুক্তি পেয়ে যাচ্ছেন প্রভাবশালীরা। প্রাথমিক তদন্ত থেকে শুরু করে বিভাগীয় মামলা-সব ক্ষেত্রেই একই অবস্থা। ‘সবে ধন নীলমণি’ হিসাবে যাকে দায়ী করা হচ্ছে, পার পেয়ে যাবেন তিনিও। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তদন্তের ফলাফল নিয়ে আপিল হলে সবাই পার পেয়ে যাবেন। কারণ, যে কল রেকর্ড বা অডিওর ভিত্তিতে তদন্ত প্রতিবেদনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, ফরেনসিক পরীক্ষার আগে সে সংক্রান্ত মোবাইল ফোন বা ডিভাইস জব্দ করা হয়নি।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, হাতেনাতে ধরা পড়া প্রভাবশালী কর্মকর্তারা পার পেয়ে যাওয়ায় কেবল পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়নি; ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রবণতা আরও বাড়বে। এতে সৎ, দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তারা ভালো কাজ করার উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন।
যা ঘটেছিল : ২০২০ সালের ১৯ অক্টোবর রাজধানীর কাওলায় সৌদি প্রবাসী রোমান মিয়ার প্রায় ৫ কোটি টাকা ডাকাতির নেতৃত্ব দেন সিআইডির তৎকালীন এসআই আকসাদুদজামান। তার সঙ্গে ছিলেন পেশাদার ডাকাতচক্রের সদস্যরা। বিষয়টি ডিএমপির ডিবিকে জানানো হলে অসৎ উদ্দেশ্যে মামলা হয় ৪ লাখ ৭৮ হাজার টাকা ডাকাতির অভিযোগে। তদন্তে নেমে ডাকাতদের কাছ থেকে ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা আদায় করা হয়। পরে ওই টাকা ভাগ করে নেন ডিবির তৎকালীন দায়িত্বশীলরা। পদস্থ কর্মকর্তাদের নির্দেশে টাকা আদায়ের নেতৃত্ব দেন ডিবির তৎকালীন এডিসি কায়সার রিজভী কোরায়েশী। ২০২১ সালে এ সংক্রান্ত একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে কোরায়েশীর উদ্দেশে আকসাদুদজামানের স্ত্রী তাহমিনা ইয়াসমিনকে বলতে শোনা যায়, ‘১ কোটি ২৮ লাখ টাকা তো নিয়েছেন আপনারা সবাই। আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে ১৪ লাখ দিইনি?’
বিভাগীয় তদন্ত : ঘটনাটি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের তদন্ত শেষে বিভাগীয় মামলা হয়। এ মামলায় ১০ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা ও ডিএমপি মতিঝিল ট্রাফিক পুলিশের উপকমিশনার দেওয়ান জালাল উদ্দিন চৌধুরী। এই প্রতিবেদনে প্রাথমিক তদন্তের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়।
তদন্ত নিয়ে যত প্রশ্ন : চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে লিখিত ব্যাখ্যায় কোরায়েশী বলেন, একটি অডিও রেকর্ডের ভিত্তিতে আমাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। অডিও রেকর্ডিংকে নির্ভরযোগ্য হিসাবে গণ্য করতে হলে তার উৎস নিশ্চিত হওয়া অবশ্যই জরুরি। কিন্তু আলোচিত অডিওটির উৎস যাচাই করতে পারেনি তদন্ত কমিটি। অডিওর ‘চেইন অব কাস্টডি’ বা হেফাজতের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা হয়নি। এক্ষেত্রে টেম্পারিংয়ের যথেষ্ট আশঙ্কা আছে। মামলার সাক্ষীদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সাক্ষী হিসাবে থাকা মোশাররফ হোসেন, রিপন মোড়ল ও হাসান রাজার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক ডাকাতিসহ নানা অপরাধের মামলা রয়েছে। এছাড়া অডিওর অপর প্রান্তের ব্যক্তি তাহমিনা ইয়াসমিনও অভিযুক্ত আকসাদুদজামানের স্ত্রী।
কোরায়েশী বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদনে ৩৭ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩৩ জনই আমার পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন। আর চারজন আমার বিপক্ষে দিয়েছেন। অধিকাংশ সাক্ষীর মতামত গুরুত্ব না দিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা বিশেষ উদ্দেশ্যে ডাকাতদলের পক্ষে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন।’ তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদনে উপস্থাপিত উপসংহারসমূহ আমার দৃষ্টিতে নথিভুক্ত সাক্ষ্য, দালিলিক প্রমাণ এবং প্রাসঙ্গিক তথ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যে অডিওর ভিত্তিতে আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, তার উৎস, সংরক্ষণ প্রক্রিয়া, অখণ্ডতা এবং যাচাইযোগ্যতা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে; যা একটি ন্যায়সংগত মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিবেচ্য। এছাড়া প্রতিবেদনে একাধিক সাক্ষ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য, বক্তব্যের পরিবর্তন এবং স্বাধীন সমর্থনকারী প্রমাণের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। স্পষ্ট করে বলতে চাই, ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনো প্রকার অনৈতিক কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম না। আলোচ্য কার্যক্রমের প্রতিটি পদক্ষেপ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জ্ঞাতসারে ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই গৃহীত হয়েছে। তাই বিষয়টিকে ব্যক্তিগত অনিয়ম হিসাবে চিহ্নিত করা মোটেই ঠিক না।’
ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বলেন, একজন এডিসির একার পক্ষে এ ধরনের একটি সিরিজ অপকর্ম কোনোভাবেই সম্ভব না। এক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠাতিক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। বিভাগীয় তদন্তে কেবল এডিসি বা তার নিম্ন পদের লোকদের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশ করে মূলত প্রকৃত বিষয়টিকে আড়াল করা হয়েছে। এতে এডিসি কোরায়েশী নিজেও সুবিধা পাবেন। ইতোমধ্যে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আর অস্বীকার করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে তদন্তের পদ্ধতিগত ভুলের মাধ্যমেই। অডিও রেকর্ডের মাধ্যমে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করতে হলে অবশ্যই যথাযথ প্রক্রিয়ায় ফরেনসিক পরীক্ষা করতে হবে। এক্ষেত্রে তা করা হয়নি। উচিত ছিল রেকর্ডকৃত ফোন, বাদীর ফোন এবং কোরায়েশীর ফোন জব্দ করা। কিন্তু তাদের ফোন জব্দ করা ছাড়াই কেবল অডিও রেকর্ডের ফরেনসিক করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, কোরায়েশীর কণ্ঠের সঙ্গে ওই অডিও রেকর্ডের মিল পাওয়া গেছে। এআই-এর মাধ্যমেও হুবহু এ ধরনের কথোপকথন তৈরি করা যায়। এছাড়া ফরেনসিক পরীক্ষার আগে অবশ্যই আদালতের আদেশ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আদালতের আদেশও নেওয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন না করেই যেহেতু তদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে, সেহেতু এর বিরুদ্ধে আদালতে গেলে কোরায়েশী অবশ্যই সুবিধা পাবেন। পাশাপাশি বিপদে পড়বেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
পদে পদে ঘাপলা : সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৫ কোটি টাকার একটি ডাকাতির ঘটনা ঘটলেও অসৎ উদ্দেশ্যে মামলায় তা দেখানো হয়েছিল ৫ লাখেরও কম। শুধু তাই নয়, ডাকাতির ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা উদ্ধারের পর আদালতে দেখানো হয় মাত্র ৩ লাখ ৫ হাজার টাকা; বাকি অর্থ আত্মসাৎ করেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তারা। অথচ তদন্তে শুধু এক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও নিচের দিকের পাঁচ পুলিশ সদস্যকে দায়ী করা হয়েছে। ডিবির তৎকালীন যুগ্মকমিশনার মাহবুব আলমের তত্ত্বাবধানে পুরো ঘটনা ঘটলেও এবং ডিএমপি কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতনরা সব জানলেও তদন্ত প্রতিবেদনে রহস্যজনকভাবে তাদের দায় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) একেএম আওলাদ হোসেন বলেন, ‘এতকিছু হয়ে গেছে, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আপনি না বললে তো আমি জানতাম না। আমার কাছে যদি এ সংক্রান্ত কোনো প্রতিবেদন আসে, তাহলে যথাযথ ব্যবস্থা নেব।’
যেমন ছিল তখনকার ডিবি : বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অপকর্মের এক স্বর্গরাজ্য হিসাবে পরিচিত হয়ে উঠে ডিবি। অসামিদের ধরে এনে দিনের পর দিন আটকে রেখে রীতিমতো মুক্তিপণ আদায় করা হতো। ডিবি কার্যালয়ের ভেতর বহুতল ভবন নির্মাণের নামেও গ্রেফতার হওয়া অপরাধীদের কাছ থেকে আদায় করা হতো মোটা অঙ্কের টাকা। টাকা তোলার দায়িত্বে ছিলেন ডিবির তৎকালীন ডিসি, এডিসি (অতিরিক্ত উপকমিশনার) ও সহকারী কমিশনাররা। সহযোগীর ভূমিকায় ছিলেন নিম্নপর্যায়ের ডিবি সদস্যরা। আর মূল সমন্বয়কারী ছিলেন যুগ্মকমিশনার পদমর্যদার কর্মকর্তারা। ওই সময় গ্রেফতারের পর টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে অনেককে। আবার টাকা নেওয়ার পরও মামলায় জড়ানোর মতো অনেক ঘটনার অভিযোগ রয়েছে। এমনই একটি ঘটনার অভিযোগকারী ছিলেন ডাকাতি মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি ও সিআইডির সাবেক কর্মকর্তা আকসাদুদজামান।
প্রতিবেদন আলোচিত : ২০২৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ‘আসামি ছেড়ে দিতে অভিনব মুক্তিপণ/ডাকাতদের ৬ স্ত্রীর কাছ থেকে ডিবি টিমের ঘুসবাণিজ্য’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ডাকাতদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের ঘটনা জানাজানি হলে ডিবির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এরই অংশ হিসাবে মামলার বাদীর কাছ থেকে একটি স্ট্যাম্পে লিখিত নেন। যেখানে লেখা আছে, ‘আমার (বাদী) করা মামলায় এক কোটি ৪২ লাখ টাকা উদ্ধার করেছে ডিবি। আমি খুশি হয়ে পুরো টাকা ডিবিকে দান করলাম।’
স্বরাষ্ট্রের প্রতিবেদনে যা ছিল : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আকাসাদুদজামানসহ অপর আসামিরা ডিবি হেফাজতে থাকাকালে তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। এর মধ্যে আসামি মোশারফের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা, সেলিম মোল্লার কাছ থেকে সাড়ে ৩৭ লাখ টাকা, রিপন মোড়লের কাছ থেকে চার লাখ টাকা, রাজু মিয়ার থেকে সাত লাখ টাকা, আমির হোসেন থেকে সাড়ে ১৬ লাখ টাকা এবং আকাসাদুদজামানের কাছ থেকে ৩৩ লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে সবার টাকা একত্র করে একটি ব্যাগে ভরে আকসাদুদজামানের বাসায় পাঠানো হয়। এরপর আকসাদুদজামানের বাসায় অভিযান চালিয়ে সেই টাকা উদ্ধার করা হয়। আকসাদুদের বাসায় যাওয়া এবং সেখান থেকে ডিবি কার্যালয়ে পৌঁছা পর্যন্ত এডিসি কোয়ায়েশী বারবার ডিবির যুগ্ম-কমিশনার মাহবুবের সঙ্গে কথা বলেন। মাহবুবের নির্দেশনা অনুযায়ীই পুরো কাজ করেন কোরায়েশী। টাকা আদায়ের পর সবাইকে ছেড়ে দেওয়ার কথা থাকলেও ডিবি তা করেনি। মূলত এ কারণেই বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদন : ডিবি কর্মকর্তাদের টাকা আত্মসাতের ঘটনা নিয়ে তদন্ত করেছিলেন পুলিশ সদর দপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি ও বর্তমানে ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি আতাউল কিবরিয়া। তিনি তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ডাকাতি মামলার আসামি সেলিম মোল্লাহ, রিপন মোড়ল, গোলাম মাওলা ও আমির হোসেন তালুকদারদের গ্রেফতার করে আদালতে হাজির না করে অবৈধভাবে প্রায় ১০ দিন ডিবি অফিসে আটকে রাখা হয়েছিল।
তৎকালীন ডিসির বক্তব্য : ঘটনার সময় ডিবির সংশ্লিষ্ট বিভাগের ডিসি ছিলেন কাজী শফিকুল আলম। বর্তমানে তিনি ময়মনসিংহ রেঞ্জ ডিআইজি অফিসে সংযুক্ত। বিভাগীয় মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে সাক্ষীর বক্তব্যে কাজী শফিকুল আলম বলেন, ওই সময় কায়সার রিজভী কোরায়েশী যা করেছেন সবই তৎকালীন যুগ্ম-কমিশনার মাহবুব আলমের নির্দেশেই করেছেন। সবকিছুর সমন্বয়ক ছিলেন মাহবুব আলম। ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিএমপি কমিশনারও বিষয়টি জানতেন। মূলত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছাড়া বা ডিবির প্রচলিত বিধিবিধানের পরিপন্থি কোনো কাজ কোরায়েশী করেছে বলে আমার জানা নেই। ডাকাতিতে ব্যবহৃত সিআইডির ভাড়া করা মাইক্রোবাসটি আটকের পরও যুগ্ম-কমিশনারের নির্দেশে ছেড়ে দেওয়া হয়।
কাজী শফিকুল আলম বলেন, ‘আমি এখন যেখানে কর্মরত আছি সেখানকার ডিআইজি স্যার এক সময় পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত ছিলেন। তিনি তখন বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করেছেন। ওই সময় আমি আমার বক্তব্য দিয়েছি। যেটা সত্য সেটাই বলেছি। সম্প্রতি বিভাগীয় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আমাকে ডেকে আমার সামনে আগের বক্তব্যটি উপস্থাপন করেন। ওই বক্তব্য সমর্থন করে ফের বক্তব্য দিয়েছি। সেখানে যা বলেছি, তার বাইরে আমার কোনো বক্তব্য নেই।’
সেই যুগ্ম কমিশনারের স্ববিরোধী বক্তব্য : তদন্ত কর্মকর্তার কাছে সাক্ষ্যকালে ডিবির তৎকালীন যুগ্ম-কমিশনার মাহবুব আলম বলেন, অন্য কর্মকর্তাদের পরামর্শে আমি বিষয়টি তৎকালীন ডিএমপি কমিশনারকে অবহিত করি। ডিবি কর্তৃপক্ষের অজ্ঞাতে বিধিবিধানের বাইরে কোরায়েশী কোনো কাজ করেছেন, এমন কিছু আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি। তবে তিনি বলেন, ‘ঘটনা তো জেনুইন। ওটা তো আর মিথ্যা না। ওটা সত্য।’ ঘটনা যেহেতু সত্য তাহলে তদন্তকালে তা স্বীকার করলেন না কেন-জানতে চাইলে মাহবুব আলম বলেন, ‘যে ঘটনা ঘটেছে সেটি ঠিক আছে। কিন্তু পরবর্তী হ্যান্ডলিং ঠিক ছিল না। ওটা আমি বলেছি।’
বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের মতামত : তদন্ত প্রতিবেদনের মতামতে বিভাগীয় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দেওয়ান জালাল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। পারিপার্শ্বিক ঘটনা বিশ্লেষণ করে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। তবে সুস্পষ্ট প্রমাণের অভাবে এ বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া প্রায় অসম্ভব। যে কোনো ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ প্রামাণ্য দলিল হিসাবে স্বীকৃতি পেয়ে থাকে। কিন্তু ঘটনার ৬ বছর পর সিসিটিভি ফুটেজ কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। এ ধরনের বিভাগীয় মামলায় মোবাইল ফোন সিডিআর (কল ডিটেইল রেকর্ড) অভিযোগ প্রমাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বাংলাদেশের মোবাইল অপারেটরগুলো সাধারণত এক বছরের বেশি সময় সিডিআর সংরক্ষণ করে না। কাঙ্ক্ষিত নয়টি সিডিআরের মধ্যে মাত্র একটি সিডিআর পাওয়া গেছে। এছাড়া সাক্ষীরা পরস্পর সাংঘর্ষিক ও বিপরীতধর্মী বক্তব্য দিয়ে অভিযোগ প্রমাণের প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছেন।
যা বললেন তদন্ত কর্মকর্তা : বিভাগীয় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দেওয়ান জালাল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমি আমার প্রতিবেদনে কাউকেই শাস্তির আওতায় আনার সুপারিশ করিনি। আগের তদন্ত কর্মকর্তা যে প্রতিবেদন দিয়েছেন সেটি সঠিক ছিলা কিনা, কেবল তা যাচাই করেছি। সুপারিশগুলো আগের তদন্ত কর্মকর্তার। আমি কেবল ওই সুপারিশগুলো সঠিক বলে উল্লেখ করেছি।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই অনিয়মের সঙ্গে ডিবির তৎকালীন কনস্টেবল থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা জড়িত। তবে আমার তদন্তের বিষয় ছিল কেবল কোরায়েশী। তিনি অতিরিক্ত এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তা। ঊর্ধ্বতন যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তারা আমার চেয়ে অনেক সিনিয়র। আমি একজন এসপি হয়ে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারি না। কোরায়েশী যেহেতু আমার জুনিয়র সে কারণে আমি কেবল তার বিষয়টিই দেখেছি। বিধি অনুযায়ী নিচের পদের কর্মকর্তা উপরের পদের কর্মকর্তার তদন্ত করতে পারেন না।’
কোরায়েশীর অডিওর ফরেনসিক পরীক্ষা আদালতের নির্দেশে নেওয়া হয়েছে কিনা এবং ফরেনসিক পরীক্ষার আগে সংশ্লিষ্ট মোবাইল ফোন বা ডিভাইসগুলো জব্দ করা হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ফরেনসিক পরীক্ষাটি প্রাথমিক তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির মাধ্যমে করিয়েছেন। বিষয়টি এখনো আদালত পর্যন্ত গড়ায়নি?
