হারাম পণ্যে আরোপিত হালাল ট্যাক্স — উচ্চাভিলাষী বাজেটে রাজস্ব আদায়ে মরিয়া সরকার
অনলাইন নিউজ ডেক্স
দেশে উৎপাদিত অ্যালকোহলের প্রতি লিটারে ৫০০ টাকা হারে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপ করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। ইসলামি বিধানে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এই পণ্য থেকে রাজস্ব আদায়ের এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই ‘হারাম পণ্যে হালাল ট্যাক্স’ বলে কটাক্ষ করছেন। উচ্চাভিলাষী বাজেট ঘোষণার পর রাজস্ব ঘাটতি পূরণে সরকার কার্যত মরিয়া হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কেন এই সিদ্ধান্ত
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা এবং করের আওতা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে বিভিন্ন খাতে কর কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে। অ্যালকোহলে নতুন ভ্যাট আরোপও সেই উদ্যোগেরই অংশ। নতুন প্রজ্ঞাপন কার্যকর হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি লিটার উৎপাদিত অ্যালকোহলের বিপরীতে ৫০০ টাকা ভ্যাট পরিশোধ করতে হবে।
২০২১-২২ অর্থবছরে কেরু এন্ড কোং শুধু ডিস্টিলারি ইউনিট থেকে উৎপাদিত মদ বিক্রি থেকে আয় হয় ৩৬৭ কোটি টাকা। এতে লাভ হয় ১০০ কোটি টাকারও বেশি। আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১০ লাখ প্রুফ লিটার বেশি মদ বিক্রি হয়েছে। এটি কেরুর ইতিহাসে তখনকার রেকর্ড। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মদ বিক্রি থেকে আয় বেড়ে হয় প্রায় ৪৩৯ কোটি টাকা (প্রায় ৫৭.৭৩ লাখ প্রুফ লিটার বিক্রি)। ডিস্টিলারি ইউনিটের লাভ হয় ১৫২ কোটি টাকা। কোম্পানির নিট মুনাফা (সব ইউনিট মিলিয়ে) প্রায় ৮০ কোটি টাকা। সাম্প্রতিকতম সময়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছর ডিস্টিলারি ইউনিট চালিত মুনাফার কারণে কোম্পানি রেকর্ড লাভ করেছে যার পরিমাণ প্রায় ১২৮-১৯০ কোটি টাকা।
দিনকে দিন কেরু উৎপাদিত অ্যালকোহল এর চাহিদা বাড়ছে এবং পণ্যটি ব্যাপক মুনাফা অর্জনকারী শিল্পে পরিণত হয়েছে। গ্রাহক ও বিক্রয় বৃদ্ধির কারনে সরকার এই পণ্যটিকে রাজস্ব আয়ের সূবর্ণ সুযোগ হিসাবে দেখছে।
শিল্প খাতে উদ্বেগ
সংশ্লিষ্ট শিল্পখাতের প্রতিনিধিরা বলছেন, নতুন ভ্যাট আরোপে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে, যার প্রভাব সরাসরি পড়বে বাজারমূল্যে। কর বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, হঠাৎ এত বড় হারে ভ্যাট আরোপ অ্যালকোহলভিত্তিক শিল্পের উৎপাদন কাঠামোয় বড় ধরনের চাপ তৈরি করবে।
রাজস্ব ঘাটতির চাপ
চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে আছে। এই পরিস্থিতিতে ঘোষিত বাজেটের ব্যয় মেটাতে নতুন নতুন খাত থেকে কর আদায়ের পথ খুঁজছে সরকার। বিশ্লেষকদের মতে, অ্যালকোহলে ভ্যাট আরোপ সেই মরিয়া প্রচেষ্টারই একটি দৃষ্টান্ত।
তবে প্রশ্ন উঠেছে নৈতিক অবস্থান নিয়েও। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ একটি পণ্যকে রাজস্বের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে বিভিন্ন মহলে। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই এটিকে ‘হারাম আয়ের হালাল বৈধতা’ বলে প্রশ্ন তুলছেন।
সরকারের প্রত্যাশা, নতুন ভ্যাট কাঠামো কার্যকর হলে এই খাত থেকে রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। তবে নৈতিক বিতর্ক এবং শিল্পখাতের উদ্বেগ — দুটি চাপই সরকারকে মোকাবেলা করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
