সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা বেড়েছে ৪১ শতাংশ: পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ, বেড়েছে অর্থপাচার
অনলাইন নিউজ ডেক্স
সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ এক বছরের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের আমানত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪১ শতাংশ বেশি।
এর আগে ২০২৪ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ।
গতকাল ১৮ই জুন প্রকাশিত সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশে সুইস ফ্রাঁর প্রচলন তেমন নেই। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রতি সুইস ফ্রাঁর বিনিময় মূল্য ১৫২ থেকে ১৫৩ টাকা। প্রতি সুইস ফ্রাঁ ১৫২ টাকা ধরে হিসাব করলে, ২০২৫ সালের শেষে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের পর গত বছরই (২০২৫ সাল) সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে। গত ১০ বছরের মধ্যে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্থ জমার রেকর্ড।
সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে জমা হয়। বাংলাদেশের অনেক ব্যাংকও বৈধ পথে দেশটির ব্যাংকে অর্থ জমা রাখে। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিরাও সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখেন।
এ ছাড়া বিশ্বের নানা দেশে সুইস ব্যাংকের শাখাগুলোতে সেসব দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের জমা করা অর্থও সুইস ব্যাংকে জমা অর্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন দেশ থেকে আসা এসব অর্থ সংশ্লিষ্ট দেশের দায় হিসেবে তাদের আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে। এর অর্থ হলো, সুইস ব্যাংকে রাখা সব অর্থই পাচার করা অর্থ নয়।
এসএনবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ ও ২০২৩ সালে পরপর দুই বছর সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। ওই দুই বছরে যথাক্রমে সাড়ে ৫ কোটি সুইস ফ্রাঁ ও পৌনে ২ কোটি সুইস ফ্রাঁ জমা ছিল।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, “আশা করা হয়েছিল, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশ থেকে অর্থ পাচার কমবে। কিন্তু সুইস ব্যাংকের এই হিসাব প্রমাণ করে— অর্থ পাচার কমেনি। এটি অর্থনীতির জন্য মোটেও ভালো ফল বয়ে আনছে না। আমার মতে, সুইস ব্যাংক ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অর্থ পাচার হয়।”
মইনুল ইসলামের মতে, এখন দেখার বিষয় হলো— বর্তমান সরকার অর্থ পাচার বন্ধের পাশাপাশি পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনতে কী উদ্যোগ নেয়। তা না হলে অর্থ পাচার থামবে না।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একটা বিশেষ শ্রেণির হাতে বিপুল অর্থ কুক্ষিগত হয়। আওয়ামী লীগ সরকরের অনেক মন্ত্রী, সাংসদ, শীর্ষ নেতার ওপর মব চালিয়ে তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কারখানায় লুটপাট, কাউকে দেশ থেকে নিরাপদে বের করে দেওয়ার নাম করে ব্ল্যাকমেলিংয়ের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। মিথ্যা মামলার মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও প্রকাশ্যে এসেছে।
সমন্বয়ক, ছাত্র নেতারা ইউনূস সরকারের আমলে বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধার মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছে রাতারাতি। মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, লুটপাটের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে যে অরাজকতা চলেছে, তাতে জুলাই আন্দোলনন সম্পৃক্তদের একটা বৃহৎ অংশ আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব অর্থ দেশের বাইরে পাচার করা হয়ে থাকতে পারে। পাচার হওয়া অর্থও বিভিন্ন উপায়ে সুইস ব্যাংকে জমা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একসময় সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলো পাচার হওয়া অর্থ জমা রাখার জন্য অন্যতম পছন্দের গন্তব্য ছিল। কারণ, তখন দেশটির ব্যাংকগুলো এসব তথ্য অন্য কোনো দেশের সঙ্গে আদান-প্রদান করত না। অর্থ পাচার-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় ছিল না সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলো। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই দৃশ্যপট অনেকটাই পাল্টে গেছে।
আন্তর্জাতিক নানা চুক্তির কারণে এখন সুইজারল্যান্ড বিভিন্ন দেশের সরকারের চাহিদা অনুযায়ী তথ্য সরবরাহ করে। তাই এখন অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের আড়ালে বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচার করেন— এমন অভিযোগও রয়েছে।
