বাংলাদেশ থেকে বেলুচিস্তান – অভাব শুধু একজন মুজিবরের
– ড. মামুনুর রশীদ
পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ বেলুচিস্তান দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে গভীর অভিযোগ পোষণ করে আসছে। এই অভিযোগগুলো মূলত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রান্তিকীকরণের একটি সুসংহত কাঠামোয় আবদ্ধ। মজার বিষয় হলো, এই অভিযোগগুলোর প্রকৃতি বর্তমান বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান)
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা-পূর্ব অভিজ্ঞতার সাথে প্রায় অভিন্ন প্রতিধ্বনি তোলে। উভয় অঞ্চলই একটি কাঠামোগত ধাঁচের শিকার, যেখানে সম্পদ-সমৃদ্ধ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলকে জাতীয় সম্পদে অবদানের বিপরীতে বৈষম্যমূলক আচরণ, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য, এবং রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দমনের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
এই প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক উপাত্ত, সময় ধারাবাহিকতা এবং একটি বিস্তারিত তুলনামূলক সারণীর মাধ্যমে বেলুচিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি ও পূর্ব পাকিস্তানের ঐতিহাসিক বাস্তবতার মিলগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
আসুন কিছু ডাটা নিয়ে দেখি।
অর্থনৈতিক শোষণ
বেলুচিস্তান পাকিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল, কিন্তু দেশটির দরিদ্রতম প্রদেশও বটে।
প্রাকৃতিক গ্যাস: প্রদেশটি পাকিস্তানের মোট প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ১৮-২০% সরবরাহ করে (প্রধানত সুই গ্যাসক্ষেত্র থেকে), তবুও বেলুচিস্তান নিজেই গ্যাস সংকটে ভোগে।
অস্বচ্ছল রয়্যালটি: ২০২২ অর্থবছরে, বেলুচিস্তান গ্যাস রয়্যালটি বাবদ পেয়েছে মাত্র ২২ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি, যেখানে উত্তোলিত গ্যাসের হেডওয়েল মূল্য ছিল আনুমানিক ১৮০ বিলিয়ন রুপিরও বেশি। বরাদ্দকৃত রয়্যালটির হার (হেডওয়েল মূল্যের ১২.৫%) অপর্যাপ্ত বলে বিবেচিত হয় এবং অনেক সময় তা প্রদানেও বিলম্ব করা হয়। সময়ের সাথে রয়্যালটির পরিমাণ বাড়লেও (২০০৯ অর্থবছরের ৬.৩ বিলিয়ন থেকে ২০২২ অর্থবছরে ২২ বিলিয়ন), তা উত্তোলিত সম্পদের তুলনায় নগণ্য।
মাথাপিছু আয়ের ব্যবধান: বেলুচিস্তানের মাথাপিছু আয় জাতীয় গড়ের তুলনায় ধারাবাহিকভাবে কম এবং ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। ২০১০-১১ সালে এটি ছিল জাতীয় গড়ের ৫৯.৭%, যা ২০১৭-১৮ সালে কমে দাঁড়ায় ৫৫.৮% (৯১৭ ডলার বনাম জাতীয় ১,৬৪১ ডলার)। এটি প্রমাণ করে যে বৈষম্য সময়ের সাথে বাড়ছে।
উন্নয়ন ব্যয় ও মানব উন্নয়ন সূচক
প্রদেশটির বহুমাত্রিক দারিদ্র্য জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক বেশি এবং তা প্রায় স্থবির হয়ে আছে।
বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক (MPI):
২০০৪/০৫ সালে বেলুচিস্তানের এমপিআই ছিল ৭১.২%, যা ২০১৪/১৫ সালে কমে ৫৩.২% এবং ২০১৯-২০ সালে সামান্য কমে ৫৩.১%-এ দাঁড়ায়। একই সময়ে জাতীয় গড় ছিল ৩৮.৩% (২০১৯-২০)। অর্থাৎ, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বেলুচিস্তান জাতীয় গড় থেকে প্রায় ১৫ শতাংশ পয়েন্ট পিছিয়ে আছে, যা উন্নয়নের দীর্ঘসূত্রতার ইঙ্গিত দেয়।
ফেডারেল উন্নয়ন বাজেট (PSDP):
বেলুচিস্তানের জন্য বরাদ্দ ফেডারেল বাজেটের অংশ ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। ২০১০ অর্থবছরে যা ছিল প্রায় ১০%, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬.৮% (৬৫ বিলিয়ন রুপি)-তে। মোতায়েনের হারও কম—২০২১-২২ সালে বরাদ্দের মাত্র ৪৮% ব্যবহার করা হয়েছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য:
২০১৯-২০ সালে প্রদেশটির সাক্ষরতার হার ছিল ৫৪.৫% (জাতীয় গড় ৬২.৩%), যেখানে নারীদের সাক্ষরতার হার মাত্র ৪২%। একই বছরে শিশুমৃত্যুর হার (প্রতি ১,০০০ জীবিত জন্মে) ছিল ৭০, যা পাকিস্তানের সর্বোচ্চ।
বেলুচিস্তান এবং বাংলাদেশ মিল-অমিল:
সংযুক্তিগুলো থেকে পাওয়া প্রতিটি অভিযোগই ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সালের পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) অভিজ্ঞতার প্রায় অবিকল প্রতিফলন। বেলুচিস্তান যেমন গ্যাস সরবরাহ করে, পূর্ব পাকিস্তান তেমনি পাট রপ্তানি করে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ যোগান দিত। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই উপার্জিত অর্থ কেন্দ্রে চলে যেত, অঞ্চলটির ভাগ্যে জুটত দারিদ্র্য ও অবহেলা। একইভাবে, জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ক্ষমতা হরণ করা হয়েছিল, যা বর্তমানে বেলুচিস্তানের সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্বের প্রতিধ্বনি।
বেলুচিস্তানের বর্তমান সঙ্কট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি পাকিস্তানের কেন্দ্রীকরণ ও শোষণমূলক রাষ্ট্রকাঠামোরই একটি পুনরাবৃত্তি, যা একসময় পাকিস্তানের পতন ডেকে এনেছিল। সময় ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে যে, বেলুচিস্তানে আপেক্ষিক বঞ্চনা ও বৈষম্য সময়ের সাথে কমেনি, বরং বেড়েছে।
পাকিস্তান ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়নি। স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ।
বেলুচিস্তানও স্বাধীন হবে।
অভাব শুধু একজন মুজিবরের।
