কৃষিমন্ত্রীর ‘উদ্বৃত্ত মজুদ’ দাবি অথচ সারের বাজার সিন্ডিকেটের দখলে, বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত গুণতে হচ্ছে ৬০০ টাকা
অনলাইন নিউজ ডেক্স
সচিবালয়ে বসে কৃষিমন্ত্রী যখন দাবি করছেন দেশে সারের কোনো সংকট নেই এবং চাহিদার চেয়েও বেশি মজুদ রয়েছে, তখন মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র।
অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের কারসাজিতে সারের বাজারে তীব্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। সরকার নির্ধারিত মূল্যের তোয়াক্কা না করে প্রতি বস্তা সার কিনতে কৃষকদের বাধ্য করা হচ্ছে অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে।
এতে আমন চাষের ভরা মৌসুমে আবাদের উৎপাদন খরচ তোলা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তা ও ভোগান্তিতে পড়েছেন প্রান্তিক চাষিরা।
গত ১৮ই আগস্ট, মঙ্গলবার সচিবালয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অগ্রগতিকে ‘সন্তোষজনক’ উল্লেখ করে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, “গত বছরের তুলনায় এবার সারের মজুদ বেশি। সারের কৃত্রিম সংকটের কথা বলে যে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে, তা একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ।”
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ
অথচ সরকারের এই সুসংবাদের প্রভাবে কৃষকের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। জয়পুরহাট ও মেহেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দেদারসে চলছে সারের চড়া দাম আদায়।
জয়পুরহাটে রসিদ ছাড়া চড়া দামে বিক্রি, প্রতিবাদ করলেই মিলছে না সার
জয়পুরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ৭০ হাজার ৯৫ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে এবং ৯৭ শতাংশ জমিতে রোপণ শেষ হয়েছে। কিন্তু ক্ষেতের পরিচর্যার চরম মুহূর্তে সারের বাড়তি দাম কৃষকদের কোণঠাসা করে ফেলেছে।
সরকার নির্ধারিত ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া ও টিএসপি সারের দাম ১,৩৫০ টাকা হলেও বাজারে কৃষকদের তা কিনতে হচ্ছে ১,৯০০ থেকে ২,০০০ টাকায়। অর্থাৎ বস্তাপ্রতি সরাসরি ৫৫০ থেকে ৬৫০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।
একইভাবে ১,০৫০ টাকার ডিএপি সার ১,৫০০ থেকে ১,৬০০ টাকা এবং ১,৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এমওপি সার।
কৃষকদের অভিযোগ, দোকানে মূল্যতালিকা টাঙানো থাকলেও তা কেবল লোকদেখানো। বেশি দাম দিয়ে সার কেনার পর রসিদ চাইলে সার বিক্রি বন্ধের হুমকি দেয় অসাধু ব্যবসায়ীরা।
ক্ষেতলাল উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের কৃষক মোরশেদ আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দোকানে মূল্যতালিকা ঝুলানো থাকলেও দাম নেওয়া হচ্ছে অনেক বেশি। তালিকার কথা বলে মেমো চাইলে তারা সারই দিতে চায় না।”
চৌমুহনী বাজারের ব্যবসায়ী ইব্রাহিম সরদার স্বীকার করেছেন সারের কোনো বাস্তব ঘাটতি নেই, অথচ দাম বেশি নেওয়া হচ্ছে। তবে দায়িত্বশীলদের বাজার নজরদারির অভাবকেই তিনি এর জন্য দায়ী করেন।
যদিও জেলা সার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রওনকুল ইসলাম চৌধুরী বিসিআইসির ডিলারদের নির্দোষ দাবি করেছেন, তবে জয়পুরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক একেএম সাদিকুল ইসলাম জানান, প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ পেলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মেহেরপুরে তীব্র হাহাকার ও কালোবাজারি
মেহেরপুর জেলায় ২৬ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও কৃষকদের অভিযোগ, চাহিদার বিপরীতে সরকারি বরাদ্দ মিলছে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। বিশেষ করে টিএসপি সারের সংকট সেখানে প্রকট। সরকারি পয়েন্টে দীর্ঘ লাইন দিয়েও ৫ থেকে ১০ কেজির বেশি সার পাচ্ছেন না সাধারণ কৃষকরা।
মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ সনজীব মৃধা জানান, একই জমিতে বারবার ফসল চাষের কারণে সারের চাহিদা বেশি। আর জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায় দ্রুত সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।
তবে সরকারি দপ্তরগুলোর ধীরগতির আশ্বাসের মাঝেই চলছে অবাধ কালোবাজারি। সম্প্রতি মেহেরপুরের গাংনীতে চড়া দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে পাচারের সময় ২০ বস্তা সারসহ একটি অটোভ্যান আটক করে স্থানীয় জনতা।
পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দিয়ে সারগুলো সরকারি মূল্যে উন্মুক্তভাবে কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হয়।
সব মিলিয়ে, মন্ত্রীর ‘উদ্বৃত্ত সারের সরবরাহ’ সংক্রান্ত বক্তব্য কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী চাষিরা। মাঠপর্যায়ে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধে প্রশাসনিক তদারকি না বাড়লে চলতি আমন মৌসুমে কৃষকদের বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়তে হবে।
