জাতীয়ভাবে উপেক্ষিত জেলহত্যা দিবস, সিলেটে নিষেধাজ্ঞা, মব-গ্রেফতার হুমকির মাথায় নিয়েই আওয়ামী লীগের জাতীয় নেতাদের স্মরণ
অনলাইন নিউজ ডেক্স
দেশজুড়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও স্মরণানুষ্ঠানের অনুপস্থিতির মধ্যে কুমারপাড়ায় সভা করল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, স্মরণ করল মুক্তিযুদ্ধের চার জাতীয় নেতাকে
জাতীয়ভাবে কোথাও উল্লেখযোগ্য কোনো আয়োজন ছাড়াই পেরিয়ে গেল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম শোকাবহ দিন জেলহত্যা দিবস। অথচ সরকারের নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ সিলেটে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করে স্মরণ করেছে মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের চার জাতীয় নেতাকে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাতে সিলেট নগরের কুমারপাড়া এলাকায় এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সরকারের নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে এ সভার আয়োজন করে। গণমাধ্যমে পাঠানো একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সভার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নাজনিন হোসেন চৌধুরী। সঞ্চালনা করেন জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক জগলু চৌধুরী।
আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন জেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য বোরহান উদ্দিন আহমদ, মহানগর আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য তপন মিত্র, এমাদ উদ্দিন মানিক, অ্যাডভোকেট ইশতিয়াক আহমদ চৌধুরী, আব্দুল বারী, ডা. নাজরা চৌধুরী, শহিদুর রহমান শহিদসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
এতে জেলা যুবলীগ, মহানগর যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।
জাতীয় চার নেতাকে স্মরণ
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মাত্র ৭৯ দিনের মাথায় সংঘটিত ওই হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারান মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামান।
১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে এই চার নেতার নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়েছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো গঠনে তাঁদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছরের মাথায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে থাকা কারাগারে তাঁদের হত্যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দলীয় কর্মসূচি, নতুন করে আলোচনায় রাজনৈতিক বাস্তবতা
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে জাতীয় পর্যায়ে জেলহত্যা দিবস পালনের ধারাবাহিকতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে জাতীয় চার নেতার স্মরণে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক আয়োজনের অনুপস্থিতি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম সরকারের নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ থাকার পরও সিলেটে দলটির নেতাকর্মীদের এমন একটি আলোচনা সভার আয়োজন রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব হামলা, গ্রেপ্তার এবং হত্যাকাণ্ডের আশঙ্কার মধ্যে দলটির নেতাকর্মীদের এ ধরনের আয়োজন কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, সেটিও আলোচনার বিষয়।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাজনৈতিক পরিচয় ও বর্তমান রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় চার নেতার অবদান ও আত্মত্যাগকে স্মরণ করা। তাঁরা কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সম্পদ নন; তাঁরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হতে পারে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বিধিনিষেধ আসতে পারে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং জাতীয় চার নেতার আত্মত্যাগ কোনো রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিষয় হতে পারে না।
