জুলাই সহিংসতার চট্টগ্রাম ট্র্যাজেডি: ভুয়া আসামি, সাজানো এজাহার, বিদেশে থেকেও আসামি
অনলাইন নিউজ ডেক্স
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতার সময় চট্টগ্রামে সংঘটিত ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে দেখা দিয়েছে গুরুতর প্রশ্ন। এক চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—ঘটনার সময় দেশের বাইরে অবস্থান করা সত্ত্বেও একাধিক ব্যক্তি রাজপথে সরাসরি অস্ত্রহাতে হামলায় অংশ নিয়েছেন অভিযোগে আসামি হয়েছেন। অন্যদিকে, স্বনামে প্রকাশ্যে গুলি চালানোর ভিডিও প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেছেন একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা।
শুধু তা-ই নয়, নিহতের পরিবারের অজান্তে এজাহারে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ঢুকিয়ে দেওয়ার প্রমাণও এখন আদালতের নথিতে। এসব তথ্য প্রকাশের পর জুলাই সহিংসতার ঘটনাগুলোর বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে দেশজুড়ে নতুন বিতর্ক ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে আসা প্রধান ৫টি চাঞ্চল্যকর অসংগতি
১. ঘটনার সময়ে দেশে ছিলেন না, তবুও ‘অস্ত্র হাতে’ হামলার আসামি!
নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ১৬ ও ১৮ জুলাই বহদ্দারহাট ও পাঁচলাইশ এলাকায় সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চু এবং কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমনকে হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে। এজাহারে দাবি করা হয়, ১৮ জুলাই শৈবাল দাশ সুমন কিরিচ ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি চালান।
বাস্তব চিত্র: পাসপোর্ট ও ট্রাভেল ডকুমেন্ট অনুযায়ী, শৈবাল দাশ সুমন ৫ জুলাই থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে এবং মহিউদ্দিন বাচ্চু ১৩ জুলাই থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত কানাডায় অবস্থান করছিলেন। বিদেশের মাটিতে অবস্থান করে কীভাবে তারা চট্টগ্রামের রাজপথে সরাসরি অস্ত্র হাতে হামলায় অংশ নিলেন, তার কোনো সদুত্তর নেই তদন্ত প্রতিবেদনে।
২. “আমি চিনিই না, এজাহারে নাম দিল কে?”— বাদীদের বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি
ওমর ফারুক ও হৃদয় চন্দ্র তরুয়া হত্যা মামলার বাদী (নিহতের বাবা ও বন্ধু) আদালতে হলফনামা দিয়ে জানিয়েছেন, তারা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনকে চেনেনও না, তার নাম এজাহারে দেনওনি!
• হৃদয় হত্যা মামলার বাদী আজিজুল হক জানান, থানার বাইরে এক ব্যক্তি তাকে আগে থেকে টাইপ করা একটি কাগজ ধরিয়ে দিয়ে কেবল স্বাক্ষর করতে বলেন।
• একইভাবে ৮ থেকে ১০টি মামলার বাদী আদালতে হলফনামা দিয়ে সাবেক মেয়র আ জ ম নাছিরকে নির্দোষ দাবি করে মামলা থেকে অব্যাহতির আবেদন জানিয়েছেন।
৩. গায়েব হলেন প্রকাশ্যে গুলি চালানো পুলিশ কর্মকর্তারা!
ফয়সাল আহমেদ শান্ত হত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে ৭৭ জন আসামির তালিকা জমা দেওয়া হয়েছিল। এতে তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন এবং উপ-পুলিশ পরিদর্শক দীপন দেওয়ানসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার নাম ছিল, যাদের বিরুদ্ধে ১৬ ও ১৮ জুলাই সংঘাতের মধ্যে সরাসরি গুলি করার অভিযোগ ও ভিডিও ফুটেজ ছিল।
কিন্তু চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত চার্জশিটে আসামির সংখ্যা ৭৭ থেকে কমিয়ে ২২ জনে আনা হলেও, তালিকায় থাকা সব পুলিশ কর্মকর্তার নাম রহস্যজনকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে!
৪. নিহতের স্বজন নয়, মামলার বাদী রাজনৈতিক নেতা
ফয়সাল আহমেদ শান্ত হত্যাকাণ্ডে নিহতের মা-বাবা কিংবা নিকটাত্মীয়কে বাদ দিয়ে পাঁচলাইশ থানা জামায়াতের আমীর মোহাম্মদ মাহবুবুল হাছান বাদী হয়ে মামলা (মামলা নং ৯/১২/২৪) করেছেন। কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা সরাসরি বাদী হওয়ার বিষয়টি সংঘাতের সুষ্ঠু বিচারপ্রক্রিয়াকে ছাপিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের প্রয়াস কি না, তা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
৫. ঢালাও আসামি থেকে পুলিশের ‘চূড়ান্ত অব্যাহতি’
সহিংসতার পরদিন ১৭ জুলাই পাঁচলাইশ থানায় ৬ থেকে সাড়ে ৬ হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করলেও, দীর্ঘ তদন্তে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণের তথ্য না পাওয়ায় দুই শতাধিক গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে অব্যাহতির সুপারিশ করে সম্প্রতি চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা এমএ সুফিয়ান কুতুবী।
আইনজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের প্রশ্ন
জুলাই সহিংসতার মতো ঘটনায় নিহতদের পরিবারের বিচারপ্রক্রিয়া যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যক্তিগত শত্রুতা, ভুয়া তথ্য কিংবা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তবে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
যাদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ প্রমাণ ও ছবি রয়েছে, তাদের বাদ দেওয়া এবং যারা ঘটনার দিন দেশেই ছিলেন না, তাদের ‘অস্ত্রধারী’ হিসেবে অভিযুক্ত করার এই দ্বিমুখী নীতি শেষ পর্যন্ত বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রহসনে পরিণত করবে কি না—এখন সেটাই বড় প্রশ্ন।
