জ্বালানির ভর্তুকি কমানো—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চাপ দিচ্ছে আইএমএফ
অনলাইন নিউজ ডেক্স
সর্বজনীন জ্বালানি ভর্তুকি ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য সময়সীমাবদ্ধ আর্থিক সহায়তা এবং রাজস্ব পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
সংস্থাটির মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানির উচ্চমূল্য দীর্ঘস্থায়ী হলে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে দুর্বল পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত রিজিওনাল ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনের ওপর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানায় আইএমএফ।
সংস্থাটির এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন বলেন, ২০২৬ সালে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আগের পূর্বাভাসের চেয়ে ভালো হলেও দেশভেদে এর চিত্রে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানির উচ্চমূল্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বিস্তার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের পুনর্গঠন এ অঞ্চলের অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা কমে ৪ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। তবে এ হার সংস্থাটির গত এপ্রিলে দেওয়া ৪ দশমিক ৪ শতাংশের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি।
কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন বলেন, প্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণ থেকে সুবিধা পাওয়া অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, আসিয়ানভুক্ত কয়েকটি দেশ, চীন, ভারত ও জাপান।
অন্যদিকে, প্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণ থেকে তুলনামূলক কম সুবিধা পাওয়া এবং মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা নিম্ন আয়ের দেশ ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানো হয়েছে।
সর্বজনীন ভর্তুকির পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা
জ্বালানির উচ্চমূল্যের প্রভাব মোকাবিলায় নীতিগত সহায়তার ধরন নিয়ে সতর্ক করেছে আইএমএফ।
সংস্থাটির মতে, সর্বজনীন জ্বালানি ভর্তুকি কিংবা প্রশাসনিকভাবে মূল্য নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে সময়সীমাবদ্ধ আর্থিক সহায়তা ও রাজস্ব পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এতে আর্থিক চাপ সীমিত রেখে সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে।
সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বড় অর্থনীতিগুলো মজুত জ্বালানির ব্যবহার, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং বিকল্প জ্বালানিতে রূপান্তরের মাধ্যমে তেলের বাজারে অস্থিরতার প্রভাব মোকাবিলা করছে।
এর বিপরীতে নিম্ন আয়ের দেশ, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলো তুলনামূলক বেশি চাপে রয়েছে। এসব দেশে জ্বালানি, পরিবহন, বিদ্যুৎ ও সারের বাড়তি ব্যয় জীবনযাত্রার খরচ বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি অর্থায়নের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
জ্বালানির উচ্চমূল্যে বাড়ছে ঝুঁকি
কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানির দামও দীর্ঘ সময় উঁচু থাকতে পারে। পাশাপাশি এআই খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়া কিংবা সংশ্লিষ্ট সম্পদের মূল্যায়নে বড় ধরনের সংশোধন ঘটলে এশিয়ার অর্থনীতিতে অসমানুপাতিক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ, বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলে এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক সার্বভৌম বন্ডের সুদহার বাড়লে তার প্রভাব আঞ্চলিক বন্ড বাজারেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে আর্থিক খাতের বিদ্যমান দুর্বলতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া তীব্র এল নিনো পরিস্থিতি দেখা দিলে কৃষি, মৎস্য ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।
তবে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক সংযোগ গভীর হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে বলে মনে করে সংস্থাটি।
মূল্য স্থিতিশীলতায় মুদ্রানীতির ওপর গুরুত্ব
মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় মুদ্রানীতিকে মূল্য স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ।
সংস্থাটির মতে, মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে রাজস্বনীতিতে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে দুর্বল পরিবারগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
আর্থিক খাতের তদারকির ক্ষেত্রেও বাজার ও প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে সংস্থাটি।
মধ্যমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে শ্রমবাজার সংস্কার, সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করা, সেবা খাতে বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল অবকাঠামো ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ।
একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করার মাধ্যমে অর্থনীতিকে ভবিষ্যতের ধাক্কা মোকাবিলায় আরও সক্ষম করে তোলার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
গত সোমবার (১২ অক্টোবর) শুরু হওয়া আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলবিষয়ক সম্মেলন আগামী ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে।
বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে কৃষ্ণা শ্রীনিবাসনের পাশাপাশি সংস্থাটির এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের উপপরিচালক সোনালি জেইন চান্দ্রা এবং যোগাযোগ কর্মকর্তা পাভিস দেবাস্বাদি উপস্থিত ছিলেন।
