দৌলতদিয়ায় দুর্ঘটনায় নিহত বেড়ে ১৮ জনের মরদেহ উদ্ধার, নিখোঁজ ৩০


দৌলতদিয়ায় দুর্ঘটনায় নিহত বেড়ে ১৮ জনের মরদেহ উদ্ধার, নিখোঁজ ৩০
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাটে বাস দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৮ জনে দাঁড়িয়েছে। বুধবার বিকেল সোয়া ৫টার দিকে পন্টুনে ওঠার সময় ৫৬ যাত্রী নিয়ে একটি বাস পদ্মায় তলিয়ে যায়। এ ঘটনায় আরও ৩০ জন যাত্রী নিখোঁজ রয়েছেন। চালক, দুই সহকারীসহ নিখোঁজ অন্তত ৩২ জন। মৃতদের মধ্যে দুজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন– রেহেনা আক্তার (৬০) ও মর্জিনা বেগম (৫৫)। আটজনকে উদ্ধার করে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। উদ্ধারকারীদের ছয় ঘণ্টার চেষ্টায় বাসটি দৃশ্যমান হয়। পরে উদ্ধারকারী জাহাজ হামজার সাহায্যে বাসটি টেনে তোলেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। ঘাট সূত্রে জানা যায়, কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসা সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসটি বিকেল সোয়া ৫টার দিকে দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরি ঘাটের পন্টুনে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মায় পড়ে যায়। বাসটি যেখানে পড়েছে, সে স্থান অনেক গভীর। দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের কাছে থাকা উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা ঘটনাস্থলে গিয়ে বাসটি উদ্ধার করে। উদ্ধারকাজে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর দলও অংশ নেয়। ঝোড়ো হাওয়া ও বৃষ্টির কারণে উদ্ধার সাময়িক ব্যাহত হয়। পরিবহন-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদের মৌসুম হওয়ায় বাসের ৫৬ আসনের সব কটি পূর্ণ ছিল। ছিলেন চালক ও তার দুই সহযোগীও। বাসটি পন্টুনে ওঠার পর তিন যাত্রী নেমে গিয়েছিলেন। তবে গোয়ালন্দ থানার ওসি মমিনুল ইসলাম বলছেন, বাসে যাত্রী ছিলেন ৪২ জন। সূত্রে জানায়, দুপুর ২টা ১০ মিনিটে কুমারখালী থেকে বাসটি ছেড়ে আসে। যাত্রীদের বেশির ভাগই ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরছিলেন। বাস থেকে বেঁচে ফেরা এক যাত্রী জানান, তার ছেলে, স্ত্রী ও শাশুড়ি ছিলেন বাসটিতে। ফেরি ঘাটে ভেড়ানোর সময় হালকা ঝাঁকি লাগে। তিনি মনে করেছিলেন স্টার্ট দিয়েছে। গাড়িটা আগাবে। কিন্তু গাড়ি আস্তে আস্তে নদীতে তলিয়ে যায়। তিনি গাড়ি থেকে কীভাবে বের হয়েছেন, তা একমাত্র আল্লাহ জানেন। আরেকজন যাত্রী জানান, তিনি ফেরি দেখার জন্য বাস থেকে নেমেছিলেন। ওই সময় বাসটি নদীতে তলিয়ে যায়। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, বাসটিতে তার শিশুকন্যা ছিল। এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, প্রথমে বাসটি জোরে টান দেয় ফেরিতে ওঠার জন্য। ওই সময় বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারায়। ড্রাইভার অনেক চেষ্টা করেছিলেন বাঁচানোর জন্য। কিন্তু বাসটি উল্টে নদীতে পড়ে যায়। সৌহার্দ্য পরিবহনের রাজবাড়ীর কাউন্টার ম্যানেজার সিরাজ আহমেদ জানান, বাসটি কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসে। পাংশা, গান্ধীমারা, সোনাপুর মোড়সহ বিভিন্ন স্টপেজ থেকে যাত্রী উঠেছেন। রাজবাড়ী থেকে ১৪ জন যাত্রী উঠেছেন। তখন বাসে যাত্রী, চালক, হেলপারসহ ৪৩ জন ছিলেন। বাসটি নদীতে পড়ে যাওয়ার পর বাসের চালক, হেলপারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন। ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার জানান, তিনি যতটুকু জেনেছেন বাসের তিন যাত্রী বাইরে ছিলেন। গাড়িটি যখন ফেরিতে ওঠে, তখন অনেক বেশি গতি ছিল। এ কারণে ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। বাসটি নদীতে পড়ার পর সাতজনের মতো যাত্রী উঠতে পেরেছেন। ৩০ থেকে ৩৫ জনের মতো যাত্রী এখনও নিখোঁজ বলে ধারণা তার। ডুবুরি দল উদ্ধারকাজে ইতোমধ্যে নদীতে নেমেছে। ঢাকা থেকে আরও ডুবুরি দল আসছে। উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, বাসটি যেখানে পড়েছে, সেখানে অন্তত ৪৫ ফুট গভীর। দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবহনের ঘাট তত্ত্বাবধায়ক মো. মনির হোসেন বলেন, ‘চোখের সামনে বাসটি পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে গেল, অথচ আমরা কিছুই করতে পারছিলাম না। কয়েকজন যাত্রী ওপরে উঠতে পারলেও অধিকাংশ যাত্রী বাসের ভেতর আটকা পড়েছেন।’ কুমারখালী (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি জানান, সৌহার্দ্য পরিবহনের ওই বাস কুষ্টিয়ার কুমারখালী পৌর বাস টার্মিনাল থেকে শিশুসহ আট যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যায়। তারা হলেন– গিয়াস উদ্দিন রিপন (৪৫), তার স্ত্রী লিটা খাতুন (৩৭) এবং তাদের সন্তান আবুল কাসেম সাফি (১৭) ও আয়েশা (১৩)। গিয়াস খোকসা উপজেলার শোমসপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি কুমারখালী পৌর ভবন এলাকার শ্বশুরবাড়িতে ঈদের ছুটি কাটিয়ে পরিবার নিয়ে নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঢাকার তাকওয়া ফুড প্রোডাক্টের কারখানায় ফিরছিলেন। অন্যরা হলেন– মো. নুরুজ্জামান (৩২), তার স্ত্রী আয়েশা আক্তার (৩০) এবং তাদের সন্তান নওয়ারা আক্তার (৪) ও আরশান (৭ মাস)। তারা ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার কচুয়া ইউনিয়নের খোন্দকবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা। নুরুজ্জামান ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। এ দুই পরিবারের মধ্যে আয়েশা, আরশান ও আয়েশা নিখোঁজ রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। জানতে চাইলে ফোনে নুরুজ্জামান বলেন, কুমারখালী বাসস্ট্যান্ডে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসে উঠি। ফেরিতে ওঠার সময় গাড়ির সিরিয়াল ছিল। আমি আর বড় মেয়ে নাওয়ারা বাস থেকে নেমে যাই। স্ত্রী আয়েশা ও ছোট মেয়ে আরশান বাসেই ছিল। তখন বাসটি নদীতে পড়ে যায়। স্ত্রী আর মেয়ের সন্ধান পাইনি।