প্রকাশিতঃ অক্টোবর ১৯, ২০২৬

নারীর আর্থিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে বিকাশ


নারীর আর্থিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে বিকাশ
ঢাকার উত্তরার একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক সানিয়া আরজু বছর শেষে বেড়াতে যাওয়ার জন্য টাকা জমাতে বিকাশ অ্যাপ থেকে ডিপিএস খুলেছেন। দেড় বছর ধরে ২ হাজার টাকা করে প্রতি মাসে বিকাশ অ্যাপ থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমা হয়ে যায়। ফলে চাকরি, সংসার অন্যসব কাজ সামলে বাড়তি কোনো ঝামেলা ছাড়াই টাকা জমানোর সুযোগ তার জন্য সুবিধাজনক হয়েছে। কেবল নিজের জন্যই নয়, তার গৃহসহকারীর বিকাশ অ্যাপেও একটি ডিপিএস খুলে দিয়েছেন। ২০২১ সালে বিকাশ অ্যাপে ডিপিএস খোলার সুবিধা চালু হওয়ার পর ৭০ লাখের বেশি ডিপিএস খোলা হয়েছে। যার ৩০ শতাংশ নারী গ্রাহকের। কেবল ডিপিএস নয়, বিকাশের মতো মোবাইল আর্থিক সেবা দেশের সব শ্রেণি-পেশার নারীর সব ধরনের আর্থিক লেনদেনকে করেছে সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময়। নিজের মতো করে নিজের সুবিধা অনুসারে সেবা নেওয়ার সুবিধার কারণে নারীদের বিকাশের ওপর আস্থার অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যায়। আর অল্প দামের সাধারণ মোবাইল ফোন আর একটি নম্বর দিয়ে মূল ধারার অর্থনীতির সঙ্গে প্রান্তিক নারীদের সংযুক্ত করার এই সুযোগ নারীর, তার পরিবারের এমনকি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় নারী ও পুরুষ গ্রাহকের সংখ্যা এখন প্রায় কাছাকাছি, যা নারীর ক্ষমতায়নের নতুন দিগন্ত বলে মনে করা হচ্ছে। নারীর এই ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে বিকাশের মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস)। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে দেশে মোট এমএফএস হিসাব ছিল ২৫ কোটির বেশি, যার ১০ কোটির বেশি হিসাব নারী গ্রাহকের। এ ক্ষেত্রে গ্রামীণ নারীরা এমএফএস হিসাব খোলার দিক থেকে শহুরে নারীর চেয়ে এগিয়ে আছে। এমএফএসে লেনদেনের মাধ্যমে নারীরা তাদের অর্থের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। যার ফলে পারিবারিক বিভিন্ন প্রয়োজন মিটিয়ে যে অর্থ বেঁচে যায়, তা নারীরা বিনিয়োগ করতে পারছেন ছোট ছোট উদ্যোগে। তেমনই এক উদ্যোক্তা আফসানা পারভীন। পড়াশোনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। লেখাপড়া শেষ হওয়ার পর শুরু করেন অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা। অল্প কয়েকজন কর্মী নিয়ে চলে তার ফেসবুক পেজভিত্তিক অনলাইন স্টোর। আফসানা পারভীন বলেন, মফস্বল শহরে থেকে ব্যবসা করেও সারা দেশের গ্রাহকের কাছে আমি পণ্য বিক্রি করতে পারি। এই বিষয়টা সহজ করে দিয়েছে বিকাশের মতো মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম। আমার পরিবারকে সময় দেওয়ার পাশাপাশি উদ্যোক্তা হিসেবে আমার যে আয় তা আমাকে আলাদা আত্মতৃপ্তি দেয়। আমার স্বাবলম্বীর ক্ষেত্রে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আর অনলাইন লেনদেনর ভূমিকা অনেক বেশি। সুযোগ থাকলে যে কোনো অবস্থা থেকেই আমার মতো অনেকেই ঘুরে দাঁড়াতে পারেন; এমন উদহারণ আমাদের চারপাশে অসংখ্য। কর্মজীবী নারীদের পাশাপাশি সব শ্রেণির নারীরাই এমএফএসের দ্বারা উপকৃত হচ্ছেন। নাজনীন জামান নামে ঢাকার এক গৃহিণী বলেন, বিকাশ ব্যবহারের কারণে তার ক্যাশ টাকা নিয়ে টেনশন করতে হয় না। কেনাকাটা, বিল দেওয়া, মোবাইল রিচার্জ, সন্তানদের টাকা দেওয়া—সব ক্ষেত্রেই তার আস্থা বিকাশ অ্যাপে। টাকা জমানোর পাশপাশি বিকাশ অ্যাপ থেকে পাওয়া ডিজিটাল লোন প্রয়োজনে তার বড় বন্ধু। অন্যান্য আর্থিক খাতের তুলনায় এমএফএসে গ্রামীণ নারীসহ সার্বিকভাবে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির পেছনের কারণগুলো হলো—ই-কেওয়াইসির মাধ্যমে ঘরে বসেই অ্যাকাউন্ট খুলতে পারা, এমএফএস অ্যাকাউন্ট থেকে সরাসরি মোবাইল রিচার্জ করা, দেশের ভেতর কিংবা বাইরে থেকে প্রিয়জনের পাঠানো রেমিটেন্স মুহূর্তেই বিকাশ অ্যাকাউন্টে পেয়ে যাওয়া, বিভিন্ন সরকারি ভাতা ও পোশাক কারখানার বেতন মোবাইল ওয়ালেটে পাওয়া ইত্যাদি। এ ছাড়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট দিয়ে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ইত্যাদি পরিষেবার বিল পরিশোধ করতে পারা, সন্তানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফি পরিশোধ, এফ-কমার্সসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার লেনদেন, ব্যাংকের শাখায় গিয়ে খরচ ও সময় ব্যয় না করে ঘরে বসেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা কার্ড থেকে এমএফএস অ্যাকাউন্টে টাকা আনার মতো সুবিধাগুলো কর্মজীবী ও স্বাবলম্বী নারীদের আর্থিক লেনদেনের ক্ষমতায়নে বিশেষ ভূমিকা রেখে আসছে। বিআইডিএসের ‘ইমপ্যাক্ট অব মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস ইন বাংলাদেশ-দ্য কেস অব বিকাশ’ শিরোনামের গবেষণায় এমএফএস সেবার সঙ্গে নারীর ক্ষমতায়নের ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এ গবেষণায় কয়েকটি সূচকের ভিত্তিতে নারীর ক্ষমতায়ন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে নারীর চলাচলের স্বাধীনতা, পরিবারে এবং আর্থিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা, আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, শ্রমবাজার থেকে উপার্জন এবং গহনা ও পরিবারের সঞ্চিত অর্থের ওপর নারীর মালিকানা। এর মধ্যে প্রায় সব সূচকেই বিকাশের প্রভাব উল্লেখযোগ্য। দেখা গেছে, আর্থিক সম্পদের ওপর মালিকানার ক্ষেত্রে বিকাশ ব্যবহারকারী নারীরা বিকাশ ব্যবহার করেন না এমন নারীদের তুলনায় ২০ শতাংশ এগিয়ে আছেন। গবেষণাটির ফলাফল বলছে, নারীর ক্ষমতায়নের অন্যান্য সূচকেও বিকাশ ব্যবহারকারী নারীরা এগিয়ে। চলাচলের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বিকাশ ব্যবহার করেন এমন নারীরা অন্যদের চেয়ে এগিয়ে আছেন। পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা পাওয়া গেছে। এসব ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকার মূল কারণ হলো, আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক বেশি। বিআইডিএস গবেষণায় দেখা গেছে, আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে ৯ শতাংশীয় পয়েন্ট। সার্বিকভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে বড় অবদান রাখছে এমএফএস। এমএফএসের সম্প্রসারণ নারীর ক্ষমতায়নে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ক্লোজিং দ্য জেন্ডার গ্যাপ: অপরচুনিটিজ ফর দ্য উইমেন’স মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল মার্কেট ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামের যৌথ এক গবেষণায় নারীর ক্ষমতায়নে এমএফএসের ইতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। গবেষণায় নারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে এমএমএস সেবায় নারী এজেন্ট বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, এমএফএসের মাধ্যমে নারীদের জন্য আমানত রাখার সুবিধা এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে তা নারীর ক্ষমতায়ন আরও জোরদার করবে।