পিপিআরসির গবেষণা: ঘুষ না দিলে সরকারি কাজ হয় না, বলছেন ৭৪.৬ শতাংশ সেবাপ্রার্থী
অনলাইন নিউজ ডেক্স
সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ ও হয়রানির মুখে পড়তে হয় সেবাপ্রার্থীদের। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের ৭৪.৬ শতাংশের অভিজ্ঞতা—ঘুষ না দিলে কোনো কাজ এগোয় না।
পিপিআরসির মতে, সরকারি সেবা পাওয়ার পথে ভোগান্তি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নিয়মিত অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দারিদ্র্য, ঋণ ও মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা মানুষের জন্য এই হয়রানি আরও একটি বোঝা।
গবেষণার প্রতিবেদনটি আজ শনিবার ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। এ গবেষণার জন্য ২০২৫ সালের ৮ থেকে ৩১ মে দেশের আট বিভাগের ৮ হাজার ৬৭টি পরিবারের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল।
‘বাংলাদেশের প্রকৃত অর্থনীতির অবস্থা: দারিদ্র্যের পুনরাবির্ভাব ও টিকে থাকার সক্ষমতার গতিশীলতা’ শীর্ষক প্রতিবেদনটির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান এবং সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী নামিরা শামীম।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেবাপ্রার্থীদের ৭৪.৬ শতাংশ মনে করেন, ঘুষ না দিলে সরকারি কাজ হয় না। গবেষণায় হয়রানির সংজ্ঞা শুধু ঘুষ বা অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ে সীমিত রাখা হয়নি।
সেবা পেতে বাধা, নিয়মকানুন নিয়ে বিভ্রান্তি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দৈনন্দিন লেনদেনে ভোগান্তিও এতে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরও হয়রানির কাঠামোয় পরিবর্তন আসেনি; তা আগের মতোই রয়ে গেছে।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, হয়রানি এত ব্যাপক হয়েছে যে একে রাষ্ট্রীয় ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। তার ভাষায়, অন্য দেশের মানুষ দুর্নীতি বোঝে, কিন্তু হয়রানির ধারণাটি বোঝে না।
পরিবারগুলোর আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান যখন প্রায় মুছে যাওয়ার পথে, তখনই হয়রানির এই চিত্র সামনে এসেছে। গবেষণায় একটি পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩২ হাজার ৬৮৫ টাকা এবং ব্যয় ৩২ হাজার ৬১৫ টাকা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, মাস শেষে গড়ে হাতে থাকে মাত্র ৭০ টাকা।
পরিবারের মোট খরচের ৫৪.৯ শতাংশ ব্যয় হয় খাবারের পেছনে। গ্রামীণ পরিবারে খাবারের পেছনে খরচের হার আরও বেশি—৫৭.৩৫ শতাংশ। অন্যদিকে, আয়ের দিক থেকে নিচের ১০ শতাংশ পরিবারের গড় মাসিক আয় ৮ হাজার ৪৭৭ টাকা, অথচ ব্যয় ১২ হাজার ২৯৪ টাকা।
এই আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যে সেবা পেতে ঘুষ দিতে হলে পরিবারের ওপর চাপ আরও বাড়ে। গবেষণায় হয়রানিকে সেবা পাওয়ার জন্য দিতে হওয়া একধরনের ‘অনানুষ্ঠানিক কর’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে মানুষের ব্যয় বাড়ে, পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থাও কমে যায়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, দুর্দশা শুধু দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারগুলোর সমস্যা নয়। সীমার ওপরে থাকা অনেক পরিবারও অসুস্থতা, ঋণ, পর্যাপ্ত কাজের অভাব, মূল্যস্ফীতি এবং হয়রানির কারণে অনিশ্চয়তায় রয়েছে। এসব চাপ একসঙ্গে জমলে সংকট সামলানোর সামর্থ্য দুর্বল হয়ে পড়ে।
আলোচনায় নির্ধারিত বক্তা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, হয়রানির কারণে অনেক রপ্তানিকারক রপ্তানি করাই বন্ধ করে দেন।
আলোচনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোকেও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
জুলাইয়ে যে বৈষম্য দূর করার দাবিতে আন্দোলন হয়েছিল, নীতিনির্ধারকেরা সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে পারছেন না বলে মন্তব্য করেন তিনি। নির্বাচনী ইশতেহারে অনেক প্রতিশ্রুতি থাকলেও এনবিআরের সংস্কার কেন হচ্ছে না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
একশনএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, দুর্নীতি ও হয়রানিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিলে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা নিয়ে তার সন্দেহ রয়েছে। বাজারে বসলে আরেক পক্ষ এসে উঠিয়ে দিয়ে টাকা দাবি করে—এ অভিজ্ঞতার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
