প্রকাশিতঃ অক্টোবর ৯, ২০২৬

বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনীতিতে ডিপি ওয়ার্ল্ড-এনসিটি চুক্তির অর্থ কী?


বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনীতিতে ডিপি ওয়ার্ল্ড-এনসিটি চুক্তির অর্থ কী?
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড। তারা বিশ্বজুড়ে ৬০টির বেশি বন্দর ও টার্মিনালের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনের একটি যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে তাদের স্বাক্ষরিত চুক্তিকে বলা হচ্ছে ‘কনসেশন চুক্তি’। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে কনসেশন চুক্তির একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় সরকার বা মালিকানা সংস্থা তাদের কোনো অবকাঠামো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বেসরকারি বা বিদেশি কোম্পানিকে দেয়। বাংলাদেশের সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চুক্তিটির মেয়াদ ১৫ বছর। বলা হচ্ছে, চুক্তির আওতায় এনসিটির মালিকানা বাংলাদেশ সরকারের হাতেই থাকবে। এই চুক্তির জন্য কোনো উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। এছাড়া, সামরিক কৌশলগত এলাকার নিরাপত্তা ও একচেটিয়া প্রভাব নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সরকার ও বিনিয়োগ সুবিধাভোগীরা এটিকে বন্দরের আধুনিকায়ন ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের বড় সুযোগ বলছেন। অন্যদিকে সার্বভৌমত্ব ও দেশীয় সক্ষমতার পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছেন সমালোচকরা। তাদের আশঙ্কা, ভূরাজনৈতিকভাবেও বাংলাদেশ জটিলতার সম্মুখীন হতে পারে। প্রশ্ন হলো, ভূরাজনীতিতে এই চুক্তির অর্থ আসলে কী? বাংলাদেশের কী লাভ এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডকে নিয়ে এত সমালোচনা কেন? এনসিটি কেন ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ? চট্টগ্রাম বন্দরে চারটি প্রধান টার্মিনাল আছে। এর মধ্যে এনসিটি সবচেয়ে বড় ও আধুনিক। টার্মিনালটি নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি সংগ্রহের মাধ্যমে আধুনিক করতে ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এখানে ১৪টি গ্যান্ট্রি ক্রেন (সেতু আকৃতির ক্রেন) আছে; যা অন্য কোনো টার্মিনালে নেই। এক হাজার মিটার দীর্ঘ এই টার্মিনালে একসঙ্গে বেশি জাহাজ নোঙর করা যায়। চট্টগ্রাম বন্দর প্রতিবছর ২০ ফুট এককের ৩৩ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডেল করে। এর প্রায় ৪৪ শতাংশ এককভাবে হ্যান্ডেল করে এনসিটি। টার্মিনালের পাশের এলাকাতে অবস্থিত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সর্ববৃহৎ ঘাঁটি ‘ঈশা খাঁ’। বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের অধিকাংশ পরিচালিত হয়। তাই এনসিটিকে অনেকে বন্দরটির ‘হৃৎপিণ্ড’ বলেন। ভূরাজনীতিতে এই চুক্তির অর্থ কী? চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার ও কার্গো পণ্য ওঠানামার কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি অন্য দেশ থেকে আমদানি করে বাংলাদেশ। ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫টি দেশ থেকে এসব যন্ত্রপাতি আমদানি হলেও ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ আসে চীন থেকে। এর মধ্যে আছে ‘কি গ্যান্ট্রি ক্রেন, রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন, স্ট্রাডল ক্যারিয়ারের’ মতো ভারী যন্ত্রপাতি। অন্য যেসব দেশ থেকে ছোট যন্ত্রপাতি আমদানি হয়, সেগুলোর মধ্যে আছে- জার্মানি, পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, ইতালি, বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সুইডেন, ফ্রান্স ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। বৃহস্পতিবার স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী, নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন, প্রযুক্তি সংযোজন ও পরিচালন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে এনসিটিকে আধুনিক করতে প্রথম ১০ বছরে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। চুক্তিতে ‘প্রযুক্তি সংযোজন’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে তা এখনো স্পষ্ট নয়। গত বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে শুল্ক ও বাণিজ্য নিয়ে বৈঠকের সময় ‘লগইংক’ নামে একটি সফটওয়্যার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্র। চীনা এই লজিস্টিকস সফটওয়্যারটি সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের তথ্য ব্যবস্থাপনা ও জাহাজ ট্র্যাকিংয়ে ব্যবহৃত হয়। বৈঠক সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র চায়- বাংলাদেশের কোনো বন্দর, টার্মিনাল, পরিবহন ব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক জাহাজে যেন সফটওয়্যারটি ব্যবহার না হয়। তবে গত বছরের ১৮ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দরের মুখপাত্র ওমর ফারুক জানিয়েছেন, বন্দর পরিচালনার জন্য এখনো এই নামের কোনো সফটওয়্যার কেনা হয়নি। বৃহস্পতিবার ডিপি ওয়ার্ল্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান এসা কাজিম বলেছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে এনসিটিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক বন্দর, লজিস্টিকস অবকাঠামো ও সরবরাহ ব্যবস্থার সেবা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। ফলে বিশ্ববাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সংযোগ আরও সহজ ও নিরবচ্ছিন্ন হবে। এদিকে বঙ্গোপসাগর, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর নিয়ে ভারতেরও কৌশলগত সংবেদনশীলতা আছে। বন্দর দুটি দিয়ে তারা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহন করে। গত বছর মোংলা বন্দরের মেগা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বি চীনের সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ। যেটিকে দিল্লির ‘উদ্বেগের কারণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল ভারতের একাধিক গণমাধ্যম। বর্তমানে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে যাওয়াটা ভারতের জন্য কৌশলগত স্বস্তির কারণ হতে পারে। কারণ, ডিপির সঙ্গে দিল্লি সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বৃহস্পতিবার দেশটির গণমাধ্যম বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ভারতে ডিপি ওয়ার্ল্ড আমদানি-রপ্তানি কনটেইনার পরিবহনের এক-চতুর্থাংশ পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটি ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের আকাঙ্ক্ষা পূরণে দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্যের প্রবাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বঙ্গোপসাগরের পরিবহন পথ বা ট্রানজিট রুটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন পরাশক্তিদের অন্যতম অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারসাম্য রক্ষার পথে হেঁটেছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। বৃহস্পতিবার চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান শেষে সংবাদ সম্মেলনে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, সরকারের লক্ষ্য বিভিন্ন টার্মিনালে একাধিক আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত করে সেবার মান ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনা। তবে সমালোচকদের কেউ কেউ চুক্তিটিকে ‘উন্নয়নের নামে নব্য উপনিবেশায়ন’ বলে মন্তব্য করেছেন। সমালোচকরা চুক্তিকে যেভাবে দেখছেন এই চুক্তি নিয়ে আলোচনার শুরু থেকেই সমালোচনা চলছে। গত ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেছিলেন, এনসিটি টার্মিনালের পাশেই নৌবাহিনীর সবচেয়ে বড় ঈশা খাঁ ঘাঁটি। ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি দিলে দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে। বৃহস্পতিবার গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, বন্দরের যেসব সমস্যার যুক্তি টানা হয়েছে, সেগুলোর কারণ সমুদ্র গভীরতা, কাস্টমস ও আমলাতন্ত্র। এগুলোর সমাধান সরকারের হাতে; বিদেশি কোম্পানির হাতে নয়। সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিদেশি কোম্পানি লাগবে, মাশুল বাড়াতে হবে- এ যুক্তি মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছু নয়। আনু মোহাম্মদ বলেন, এনসিটির মালিকানা থাকবে বাংলাদেশের- এ যুক্তি প্রতারণামূলক। কাগজে থাকলেই মালিকানা বাস্তবে থাকে না। নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালন ক্ষমতাই প্রকৃত মালিকানা। বিশ্বের কোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্র নিজেদের প্রধান বন্দরকে এভাবে বিদেশিদের হাতে তুলে দেয় না। এটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। তবে এসব সমালোচনাকে গুরুত্ব দিতে রাজি নন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। শুক্রবার সিলেটে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য এ চুক্তি করা হয়েছে। মেয়াদ শেষে বাংলাদেশ চাইলে চুক্তি নবায়ন কিংবা অবসান ঘটাতে পারবে। এটিকে ‘দেশ বিক্রির চুক্তি’ বলাটা অমূলক। বাংলাদেশের কী লাভ? সরকারি বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা ইনভেস্ট বাংলাদেশ জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ টার্মিনালের আয় বা রয়্যালটির একটি অংশ পাবে। গড় টার্মিনাল আয়ের ওপর নির্ভর করে প্রতি কনটেইনারের জন্য এই অংশ ৪০ শতাংশ থেকে ৬৭ শতাংশের মধ্যে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি টাকা নির্দিষ্ট ফি দেবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশের ভার বহন করে চট্টগ্রাম বন্দর। এর আধুনিকায়ন ও প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে অর্থনীতিতে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি টাকা বা বছরে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়। কনটেইনার অবস্থানকাল মাত্র একদিন কমানো গেলে দেশের রপ্তানি প্রায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্য দেশে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে নিয়ে যত বিতর্ক চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন বিচার বিভাগ কয়েক লাখ নথি প্রকাশ করে। সেগুলো ছিল কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন সংক্রান্ত। এসব নথির বরাত দিয়ে তখন যুক্তরাজ্যে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে দ্য টেলিগ্রাফ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে টেমস নদীর তীরে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ে একটি বন্দর নির্মাণে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে সহযোগিতা করেছিলেন এপস্টেইন। এ জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ বাণিজ্য সচিব পিটার ম্যান্ডেলসনকে প্রভাবিত করতেও তিনি কাজ করেছিলেন। জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বাব এল-মান্দেব প্রণালির তীরবর্তী দেশ জিবুতিও ২০০৪ সালে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার চুক্তি করেছিল। কিন্তু সেটিতে একচেটিয়া শর্ত চাপিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তির শর্তে ছিল- একই এলাকায় অন্য কোনো বন্দর ইজারা দেওয়া যাবে না। কিন্তু জিবুতি অন্য একটি বন্দর নিয়ে চীনের সঙ্গে চুক্তি করলে মামলা করে ডিপি ওয়ার্ল্ড। পরে জিবুতিকে ৩৮৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণের আদেশ দেন আদালত। জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রও ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল। বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ দেশীয় অপারেটর দিয়ে এনসিটি পরিচালনার সময় সিন্ডিকেটের অভিযোগ ছিল। বিদেশি অপারেটরের ক্ষেত্রেও কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরির আশঙ্কা করা হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী, কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর (কেপিআই), নিয়মিত প্রতিবেদন এবং লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থা থাকবে। অর্থাৎ, বিদেশি কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা না রেখে নিয়মিত নিরীক্ষা, কাস্টমস সংস্কার এবং কঠোর কেপিআই তদারকির মাধ্যমে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ঠেকানোই বন্দর কর্তৃপক্ষের আসল পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।